প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

❑ সাম্য রাইয়ান 

বাঙলা ছোটোগল্পের অন্দরভুবনে একবিংশ শতাব্দীতে যে রূপগত পরিবর্তন এসেছে, তার ভেতরে কবীর রানার নামটি আলাদা গুরুত্ব নিয়ে উচ্চারিত হবার মতো। তাঁর গল্প প্রথমদৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়—রাজনীতি, ভাষা, ইতিহাস, স্মৃতি, পৌরাণিক ভাবনা, নগরজট, অন্তর্গত অন্ধকার, অদৃশ্য ক্ষমতা এবং মানুষের একাকিত্ব—এসব মিলেমিশে তাঁর গদ্যের অন্তরালে তৈরি হয় এক তীব্র এবং ধোঁয়াটে রূপকবিশ্ব। ছোটোগল্পের এই গঠনে দৃশ্যমান ঘটনা অপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ‘ঘটনার ভাষা’, এবং ঘটনার ভিতরে জমে থাকা ‘অবচেতনের বিস্তার’। এই বিস্তারই তাঁর গল্পকে সহজপাঠ্য থেকে বহুস্তরীয় বয়নকৌশলে রূপান্তরিত করে।

কবীর রানার গল্পে যে চিত্রলহরি, তা একদিকে গভীরভাবে দেশজ, অন্যদিকে গভীরভাবে উত্তর-আধুনিক বোধের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর গল্পে দেখা যায় মানুষ অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে লড়াই করে, কখনো সেই শক্তি রাষ্ট্র, কখনো সমাজ, কখনো প্রযুক্তি, কখনো স্মৃতি; অথচ সেই শক্তিকে স্পষ্ট নাম দেওয়া হয় না। ফলে গল্পগুলো একধরনের সংকেতভিত্তিক মানচিত্র হয়ে ওঠে, যার ভেতরে পাঠককে নিজস্ব চাবিকাঠি দিয়ে প্রবেশ করতে হয়।

বাঙলা ছোটোগল্পের জগতে আভাস-নির্মিত গদ্যশৈলী খুব বেশি দেখা যায় না, ঠিক এই বিন্দুতেই কবীর রানা প্রবল ব্যতিক্রম। তিনি কখনো হঠাৎ গল্পের কেন্দ্রে রেখেছেন একটি হারিয়ে যাওয়া দরজা; আবার কখনো তুলে ধরেছেন এমন একটি শহর যেখানে বিজ্ঞাপনগুলো রহস্যময়ভাবে বাতাশে মিলিয়ে যায়; কখনো দেখিয়েছেন এমন পরীক্ষা-হল যেখানে একজন শিক্ষার্থী হঠাৎ তার শরীরে এক স্পর্শ অনুভব করে—যার ব্যাখ্যা কেউ দেয় না, কিন্তু সেই অভিঘাত সমাজটিকে ভেতর থেকে উন্মুক্ত করে দেয়।

এভাবে, কবীর রানা তার গল্পে বাস্তবতাকে ঠাঁই দিলেও একথা বলতে হয়—বাস্তবতাই তার গল্পের শেষ সত্য নয়। বাস্তবতাকে গল্পে এনে তিনি তার ওপর নির্মাণ করেন রূপকের একটি নতুন, কুয়াশামাখা ভূগোল—যার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পাঠক নিজেকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করেন।

নতুন শতকের বাঙলা ছোটোগল্প ক্রমশ যখন সারল্য, স্মৃতিনির্ভর রোমান্থন কিংবা দৈনন্দিন বাস্তবতার সরাসরি প্রতিবেদনধর্মী বয়ানের দিকে ঝুঁকছিল, তখন কবীর রানা সেই প্রবাহের পাশে দাঁড়িয়ে তৈরি করছিলেন আরেকটি পথ—যেখানে গল্পের মূল শক্তি ঘটনাপুঞ্জে নয়, ঘটনার মধ্যবর্তী অংশে, ভাষার ভিতরের গোপন চলনে। এই কারণে তাঁর গল্প পাঠের মধ্য দিয়ে তাকে ঘিরে থাকা বায়ুমণ্ডল—অর্থাৎ অনুভূতির ধূসরতা, অজানা আতঙ্ক, চিহ্নহীন সংকেত, এবং বাস্তবের ভেতর লুকোনো পরাবাস্তব গাঁথুনি—এসবও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রানা গল্পকে ব্যবহার করেন একপ্রকার ক্ষেত্র-পরীক্ষা হিসেবে, যেখানে সামাজিক সজ্জা, ক্ষমতার বলয়, নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক দোলাচল কিংবা স্মৃতি-অচেতন—এসবকে একেকটি বিমূর্ত শক্তি হিসেবে হাজির করা হয়। ফলে তাঁর গল্পে দৃশ্যমান ‘কী ঘটল’—এর চেয়ে অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ‘কেন ঘটল’, কিংবা তারও গভীরে—‘ঘটনার শূন্যে পাঠক কী শুনতে পেলেন’।

এই বোধটি বুঝতে হলে পাঠককে গল্পের প্রচলিত কাঠামো থেকে একটু সরে আসতে হয়। রানা আমাদের সামনে এমন চরিত্র হাজির করেন, যারা কখনো শহরের ভিতরে উড়ে যাওয়া বিজ্ঞাপনের সঙ্গে লড়াই করছে, কখনো নিজের ঘর থেকে হারিয়ে যাওয়া দরজার অনুসন্ধানে পথ হারাচ্ছে, কখনো আবার রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দমবন্ধ করা নির্দেশের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। এই চরিত্ররা সাধারণ মানুষের প্রতিরূপ হলেও, তাদের অভিজ্ঞতা সাধারণ থাকে না; বরং ধীরে ধীরে রূপ নেয় প্রতীকে। গল্পের কার্যকারিতা এখানেই—চরিত্র যেন তার সংকটের ভাষা হয়ে ওঠে, গল্প যেন তার সময়ের সমগ্র অভিঘাত বহন করে।

এইসব কারণেই কবীর রানার গল্প একক অভিজ্ঞতার সীমা পেরিয়ে এক যুগের সামষ্টিক পাঠ হয়ে ওঠে। তাঁর অভিনব চিত্রকল্প—যেমন বনের ভেতর গভীর রাতে দাঁড়িয়ে থাকা দরজাবিহীন বৃদ্ধ, কিংবা এমন তরুণেরা যারা নিজেদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইন্টারনেটে আপলোড করে অমরত্ব খোঁজে—এসবই আমাদের যুগের গভীর মানসিক সংকটকে প্রতীকী কাঠামোয় ধরে ফেলে। এমনকি যখন তিনি একটি ক্ষুদ্র গ্রাম বা একটি অবহেলিত জনপদের কথা বলেন, তখনও স্থানীয়তার সংকীর্ণ গণ্ডিতে সেই আখ্যান ভেঙে পড়ে না; বরং ছড়িয়ে পড়ে সামগ্রিক মানবজিজ্ঞাসায়। এতে বোঝা যায়, তাঁর গল্পে স্থান-কালিতার ভৌগোলিক সীমানা গুরুত্ব পেলেও সেটি গল্পের চূড়ান্ত আগ্রহ নয়; আগ্রহ হলো মানুষের অস্তিত্বের ধারাবাহিকতা, এবং সেই ধারাবাহিকতার ভেতরে জন্ম নেওয়া অনিশ্চয়তা।

এমন স্বাতন্ত্র্যই পাঠকের সামনে এক ধরনের প্রস্তুতির দাবি তোলে। পাঠককে প্রস্তুত থাকতে হয় গল্পের ভেতরে হঠাৎ খোলা অগণিত দরজা কিংবা সিঁড়ির জন্য, প্রস্তুত থাকতে হয় ভাষার ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা ভাষার গোপন নকশা অনুধাবন করার জন্য। ঠিক এই জায়গাতেই তাঁর গল্পগুলো হয়ে ওঠে একেকটি অভিজ্ঞতা, যার ভেতরে পাঠকের নিজস্ব বোধও ধীরে ধীরে আকার বদলায়।

এই প্রেক্ষাপটে এবার তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প—‘হাত’, ‘রাজহাঁসগুলো আমাদেরকে ধর্ষণ করেছিলো’, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’, ‘বিজ্ঞাপন চুরি হয়ে যাচ্ছে’, ‘দরজা’, ‘পদ্মপুকুর’, ‘কেউ চুম্বন করেনি’, ‘জমির দলিল বিক্রি করা হবে’—প্রতিটির উপর বিশদ প্রতিক্রিয়া তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়। কারণ প্রতিটি গল্পই কবীর রানার নির্মিত ওই রূপকবিশ্বের আলাদা আলাদা জানালা, এবং প্রতিটি জানালার দৃশ্যপট ভিন্ন, অথচ পরস্পরকে ছায়ার মতো স্পর্শ করে যায়। এখন সেই গল্পগুলোর দিকে আলাদাভাবে এগোনোর আগে এটি মনে রাখা জরুরি—এই গল্পগুলো পড়তে গেলে আমাদের পূর্বানুমান, অভ্যাসগত পাঠপ্রণালী ও অর্থ-অন্বেষণের সহজ সূত্রগুলো সাময়িক বিরতি নেয়; ফলে পাঠক ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন এমন এক ভূগোলে, যেখানে অর্থ আসে বিক্ষিপ্ত ছায়া থেকে, অসমাপ্ত দৃশ্য থেকে, এবং চরিত্রের অভ্যন্তরের অনিশ্চয়তাপূর্ণ দোদুল্যমানতা থেকে।

এই সেতুবিন্দুটি মাথায় রেখে তার গল্প পাঠের দিকে এগোনোই যুক্তিযুক্ত হবে বলে মনে করি।

কবীর রানার অন্যতম শক্তিশালী গল্প ‘হাত’। গল্পটি পড়লে মনে হয় যেন পরিচিত একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কোনো সাধারণ ঘটনা ঘটছে—এক শিক্ষার্থীর শরীরে পরীক্ষার সময় একটি হাত এসে পড়েছে। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা যায়, এই ঘটনার ভেতর লুকিয়ে আছে ক্ষমতার কাঠামো, জ্ঞানের রাজনীতি, এবং শরীরকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া আধিপত্যের মানচিত্র। রিয়া যখন বলে “বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আসলে শরীরচর্চার ক্ষেত্র”, তখন সে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ভাষাহীন দুর্নীতি তুলে ধরে না, বরং দেখিয়ে দেয় একটি সমাজ কীভাবে জ্ঞানের আড়ালে শরীরকে অঙ্কিত ও সংজ্ঞায়িত করে।

গল্পটির শক্তি এই যে, ‘হাত’ এখানে একটি ঘটনা নয়; এটি একটি প্রতীক, এমন প্রতীক যার ভেতরে লুকিয়ে আছে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার অসঙ্গতি, লিঙ্গ-রাজনীতির অদৃশ্য চাপ, এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরের ক্ষমতার বলয়। রিয়া যখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানায়, তখন গল্পে দেখা যায় “হাত” নিয়ে সমাজের যুক্তিকাঠামো কেমন জট পাকিয়ে যায়। আলোচনা, তর্ক, নৈতিকতা—সবকিছু মিলে একধরনের বিকৃত নাট্যমঞ্চ তৈরি করে। গল্পটির আড়ালে তাই শুধু নারী-শরীরের নিয়ন্ত্রণ নয়—এখানে উঠে আসে জ্ঞানকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি বৃহত্তর যন্ত্রের ছবি।

অন্যদিকে, ‘দরজা’ গল্পে আমরা দেখি এক বয়স্ক কাঠমিস্ত্রি আফসারকে—যার জীবনের সারাংশ জন্ম থেকেই দরজা তৈরি করা, কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে এসে সে নিজের ঘরের দরজাগুলো খুঁজে পাচ্ছে না। সন্তানরা কোথায় যেন সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে। দরজা না থাকায় সে একটি অদ্ভুত যাত্রায় বেরিয়ে পড়ে—অরণ্যে যায়, গাছগুলোর সামনে দাঁড়ায়, এবং উপলব্ধি করে গাছই আসলে দরজার আদিস্বজন। এই ‘আবিষ্কার’ তার ভিতরের দীর্ঘদিনের অপরাধবোধকে স্পর্শ করে—সে বুঝতে পারে, যেসব গাছকে কেটে সে সারাজীবন বসবাসের জন্য দরজা তৈরি করেছে, সেই গাছই ছিল তার অস্তিত্বের ছায়া।

এই গল্প মূলত মানুষের শ্রমজীবনকে অন্য আলোয় দেখায়। আফসার দরজা বানিয়ে সারাজীবন কাটিয়েছে, কিন্তু সে কখনো তার নিজের জীবনের ‘খোলা-বন্ধ’ হওয়ার জায়গাকে বুঝতে পারেনি। গল্পটি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক প্রশ্ন ছুঁয়ে যায়—আমাদের জীবনে যে দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়, সেগুলোর প্রকৃত আকার কোথায়? আমরা কি সত্যিই জানি— কোন দরজায় আমরা দাঁড়িয়ে আছি?

‘বিজ্ঞাপন চুরি হয়ে যাচ্ছে’ গল্পটি এক অদ্ভুত শহরকেন্দ্রিক রূপকে ভরপুর। যেখানে প্রতিদিনের খবরে দেখা যায়—বাড়িভাড়া, চাকরির নিয়োগ, মানুষের আপাত প্রয়োজনের বিজ্ঞাপনগুলো হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। এই বিজ্ঞাপন হারিয়ে যাওয়াকে তিনি শুধু শহরের অস্থিরতা হিসেবে দেখান না, বরং একটি অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যবহার করেন।

নগরে মানুষের জরুরি প্রয়োজনের তথ্য—যা সাধারণত প্রকাশিত হয় বিজ্ঞাপনে—সেগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে শহরের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক গোপন কাঠামো ব্যাহত হওয়া। আর গল্পের আড়ালে স্পষ্ট যে আধুনিক শহর এমনভাবে নির্মিত— সেখানে মানুষের ব্যক্তিগত প্রয়োজনও ধীরে ধীরে একটি অশরীরী ব্যবস্থার হাতে চলে যায়। বিজ্ঞাপন হারিয়ে যাওয়ার এই পরাবাস্তব ঘটনাটি বাস্তবের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে, এবং পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে—কীভাবে শহর আমাদের জীবনের নিত্য প্রয়োজনের তথ্যকে নিয়ন্ত্রণ করে।

‘জমির দলিল বিক্রি করা হবে’ গল্পে সাতমাথা শহরের এক ‘মেথরপট্টি’-র কথা উঠে আসে—যেখানে রাস্তা পরিষ্কার করা শ্রমজীবী মানুষরা বহু বছর ধরে থাকে, অথচ কোনো দলিল নেই, কোনো মালিকানা নেই। এই গল্পে কবীর রানা দৃশ্যত বাস্তবতার ভিতর দিয়ে আঘাত করেন—কেন এই লোকগুলো শহরকে পরিষ্কার রাখলেও শহর তাদের ঠিকানা স্বীকৃতি দেয় না? কীভাবে মালিকানার রাজনীতি গড়ে ওঠে, এবং সেই রাজনীতির আড়ালে কীভাবে মানুষকে অদৃশ্য করে রাখা হয়?

এই গল্পের মূল শক্তি তার সংযমী ভাষায়। রানা কখনো আবেগী হন না, বরং ঘটনাগুলোই এখানে কাজ করে প্রধান শক্তি হিসেবে। জমির দলিল, একটি কাগজ—যার মূল্য শূন্যও হতে পারে, আবার জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্তও দিতে পারে—এই কাগজকেন্দ্রিক গল্পটি আসলে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্ববহ দার্শনিক প্রতীক চিহ্নিত করে।

‘রাজহাঁসগুলো আমাদেরকে ধর্ষণ করেছিলো’ গল্পটি রানা-গদ্যের এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ—রাজনীতি, দেহ, ইন্টারনেট-বাস্তবতা এবং সমষ্টিগত উন্মাদনা। গল্পের শুরুতে দেখা যায় নির্বাচনের সময় নাগরিকদের বলা হচ্ছে—“নগরের বাক্সে জমা আছে আমাদের হাত।” হাতকে শুধু ভোটের প্রতীক নয়, ব্যক্তিসত্তার সনদ হিসেবে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ভোটের সময় হাত তোলা, হাতের তালিকা, হাতের নথি—সব মিলিয়ে একটি বিকট প্রশাসনিক রূপকে তৈরি করে।

গল্পের পরবর্তী অংশ আরও ভয়াবহভাবে চিত্রিত হয়—মানুষজনকে বলা হয়, পরিচয়পত্র হারালে মানুষ হাত-পা-গৃহ সব হারাবে। গল্পে তরুণেরা নিজেদের অনুভূতি বাঁচাতে হাত-পা ইন্টারনেটে আপলোড করে বলে, “ইন্টারনেট আমাদের অমর করে তুলেছে।”

এখানে কবীর রানা যে আধুনিকতা-বিশ্লেষণ করেছেন তা অসাধারণ—ইন্টারনেটে আপলোড মানেই অমরতা—এমন ধারণা আজকের তরুণ প্রজন্মের গভীর ভয় ও অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। এ যেন এক ডিজিটাল যুগের পুরাণ, যেখানে মানুষ নিজের শরীরকে মেঘে ভাসিয়ে ‘অমরত্ব’ খোঁজে।

‘পদ্মপুকুর’ গল্পকে শহরের আর্কিটেকচার-দর্শন হিসেবে পড়া যেতে পারে। গল্পে সেউজগাড়ি নামে একটি শহরের কথা বলা হয়েছে, যেখানে মরুভূমি থেকে ছায়া এনে উঁচু দালান নির্মাণ করা হয়। শহরেচিহ্নগুলো এত বিশাল যে মানুষ আকাশ দেখতে পারে না। পরে বোঝা যায়—শুধু ইট-সিমেন্ট দিয়ে শহর নির্মাণ করলে চলে না; মানুষের দৃষ্টি কোথায়, মানুষের অস্তিত্ব কোথায়—সেটিও বিবেচ্য।

এ গল্পটি অত্যন্ত সমকালীন—দালান দিয়ে আকাশ ঢেকে ফেলা মানে মানুষের মনকেও ঢেকে ফেলা। ফলে গল্পটি শুধু স্থাপত্য নয়, মানুষের জীবনপ্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তোলে।

সবশেষে, ‘মেয়াদোত্তীর্ণ নিরাপত্তাসমূহ’—যা কবীর রানার অন্যতম জটিল গল্প। গল্পটি বিভিন্ন খণ্ডচিত্রে গঠিত, এবং প্রতিটি খণ্ড একটি নিরাপত্তা-ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে: পরিবার, রাষ্ট্র, পরিচয়, ঘর, ভাষা—এইসব স্বতঃসিদ্ধ নিরাপত্তা-ব্যবস্থা গল্পে অদ্ভুতভাবে ভেঙে পড়ে।

গল্পটি খুবই কাব্যময় বলে একাধিক পাঠক একে ‘চিত্রকল্পের বিস্ফোরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই গল্পে রানা ঠিক ‘ঘটনা’ লেখেননি; বরং লিখেছেন নিরাপত্তাহীনতার এক দীর্ঘ কাব্যগদ্য, যেখানে পাঠককেই নিজস্বভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়। খণ্ডচিত্রগুলো একেকটি অস্থির মানসিক অবস্থা ফাঁস করে দেয়।

এই সব গল্প একত্রে পড়লে বোঝা যায়—কবীর রানা ছোটোগল্পকে কেবল গল্প বলার মাধ্যম হিসেবে দেখেন না। তাঁর কাছে গল্প মানে প্রশ্নের বহুবিশ্ব—যেখানে মানুষের জীবন একটি ভৌগোলিক মানচিত্র, আবার একইসঙ্গে মানসিক অরণ্য। কখনো অদৃশ্য হাত, কখনো অদৃশ্য দরজা, কখনো অদৃশ্য বিজ্ঞাপন, কখনো অদৃশ্য পরিচয়—এসব মিলিয়ে একটি অচেনা কিন্তু ভয়ানকভাবে পরিচিত পৃথিবী।

এই পৃথিবী পাঠককে শুধু ভাবায় না; তাকে নিজের ভেতর তাকাতেও বাধ্য করে। আজকের ডিজিটাল যুগে মানুষের বিচ্ছিন্নতা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, মালিকানার রাজনীতি, নগরের অজস্র দিক এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ—এসবের মাঝখানে কবীর রানার গল্পগুলি এক ধরনের সতর্কতার ঘন্টা বাজায়।

বাঙলা ছোটোগল্পে যেখানে আগে গল্প বলতে বলতে চরিত্রের জীবন তুলে ধরা হতো, সেখানে কবীর রানা চরিত্রের জীবন নয়—জীবনের প্রতীকী দোকানঘর, রাস্তা, দরজা, ছায়া, শরীর, দলিল—এসব ব্যবহার করে গড়ে তোলেন মানুষের মনস্তত্ত্বের অদৃশ্য কাঠামো।

তার গল্পে পাঠক আপাতভাবে অস্বস্তি অনুভব করতে পারে, আর তাতেই গল্পের সার্থকতা। যে গল্প পাঠকের মধ্যে জিজ্ঞাসা তৈরি করতে পারে, সে-ই তো টিকে থাকে নাকি?


❑ সাম্য রাইয়ান 

রাজনৈতিক কবিতা বলতে আমরা সাধারণত সেই কবিতাকেই বুঝি, যেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, শ্রেণিবিন্যাস, শোষণ, বিপ্লব ও মানবমুক্তি নিয়ে ভাবনা কাব্যের ভাষায় প্রকাশ পায়। কিন্তু প্রকৃত রাজনৈতিক কবিতা কখনোই দলীয় প্রচারণা নয়; বরং তা মানুষের অস্তিত্ব, ন্যায়বোধ, ও স্বপ্নের কাব্যিক অনুবাদ। কবিতা তখনই রাজনৈতিক হয়ে ওঠে, যখন তা ক্ষমতার কেন্দ্রে আঘাত করে, ব্যক্তি ও সমাজের অদৃশ্য বৈষম্যের রেখা উন্মোচিত করে, এবং মানুষকে তার নিজস্ব মর্যাদা ও শক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বাঙলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম থেকে রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ পর্যন্ত এই রাজনৈতিক কবিতার ধারা গড়ে উঠেছে—যেখানে প্রেমও রাজনৈতিক, শরীরও রাজনৈতিক, আর দ্রোহও গভীর মানবিকতার ভাষা। রুদ্রের ইশতেহার এই ধারার এক অনবদ্য ও সমকালীন প্রতিধ্বনি—যা ইতিহাসের ছায়া ও ভবিষ্যতের আলো একসঙ্গে ধারণ করে, এবং মানুষের আত্মমুক্তির ভাষায় রচিত হয় এক বিস্তৃত মানবিক ম্যানিফেস্টো হিসেবে।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ইশতেহারকে বলা যেতে পারে আদিম সাম্যবাদী স্মৃতির প্রতি আহ্বান এবং ভবিষ্যৎ সমতার কাব্যিক মানচিত্র। এটি সেই দীর্ঘশ্বাস, যা ইতিহাসের স্তরে স্তরে জমে থাকা মানুষের নিস্পৃহতা, প্রতারণা, প্রেম, সংগ্রাম, ও মৃত্যুর সমবেত প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসে। এখানে কবি নিজেকে একজন একক কণ্ঠ নয়, বরং এক সমষ্টিগত আত্মার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত করেন।

রুদ্রের এই কবিতা বিশ্বকবিতার সেই দীর্ঘ ধারার অংশ, যেখানে কবিরা ভাষাকে রাজনৈতিক চেতনার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন পাবলো নেরুদার Canto General লাতিন আমেরিকার আদিবাসী ও শ্রমজীবীদের কণ্ঠ হয়ে ওঠে, তেমনি রুদ্রের ইশতেহার বাঙলাদেশের কৃষক, শ্রমিক ও নিপীড়িত মানুষের স্বপ্নের প্রতিধ্বনি। নেরুদা যেমন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শ্রম ও ভালোবাসাকে পুনর্দখল করতে চান, রুদ্রও ঘোষণা করেন—“আমাদের পুরুষেরা সুলতানের ছবির পুরুষের মতো স্বাস্থ্যবান, কর্মঠ আর প্রচণ্ড পৌরুষদীপ্ত হবে।” উভয় কবিই বিশ্বাস করেন, মানবমুক্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে শ্রম, শরীর ও শিল্পের সম্মিলনে।

কবিতাটি শুরু হয় আদিম মানবসমাজের এক নিস্পাপ সমতার কল্পচিত্র দিয়ে—যেখানে মানুষ প্রকৃতির সন্তান, ভূমির কোনো মালিকানা নেই। এই কৌমজীবনে শরীর ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক। “আমরা তখন সোমরস, নৃত্য আর শরীরের পবিত্র উৎসব শিখেছি”—এই পংক্তি শরীরের ভোগবাদী বন্দনা নয়; বরং মানুষের অস্তিত্বে শরীরের স্বাভাবিকতা ও পবিত্রতাকে পুনরুদ্ধারের ঘোষণা। কিন্তু পরমুহূর্তেই কবি ঘোষণা করেন: “তারপর—কৌমজীবন ভেঙে আমরা গড়লাম সামন্ত সমাজ।” এখানেই শুরু হয় মানবসভ্যতার ট্র্যাজেডি। আত্মরক্ষার অস্ত্র পরিণত হয় দমনযন্ত্রে, কৃষি ও যন্ত্র সভ্যতা হয়ে ওঠে শৃঙ্খলের প্রতীক। “আমাদের নির্মিত যন্ত্র শৃঙ্খলিত করলো আমাদের”—এই পংক্তিতে কবির ইতিহাসচেতনা এক দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়।

মানুষ বারবার খাঁচা তৈরি করে, আবার ভাঙে, আবার বন্দি হয়—এই চক্রই রুদ্রের ইতিহাসবোধের কেন্দ্র। “আমরা আবার খাঁচা বানিয়েছি, আবার বন্দি হয়েছি, আবার একা হয়ে গেছি”—এই স্বীকারোক্তি কেবল এক ব্যক্তির নয়, সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বগত একাকিত্বের প্রতীক।

এখানেই জন্ম নেয় কবিতার কেন্দ্রীয় ‘আমি’। এই ‘আমি’ কেবল রুদ্র নন—তিনি মুক্তিযুদ্ধের তরুণ, শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধি, এক বঞ্চিত নাগরিক, এবং এক চিরদ্রোহী মানবপ্রাণ। “সে আমি”—এই পংক্তিটি যেন সমগ্র কবিতার হৃদস্পন্দন। এখানে ব্যক্তিগত জীবন ও ইতিহাস পরস্পরে মিশে যায়; আত্মজৈবনিক যন্ত্রণা পরিণত হয় সম্মিলিত মানবস্মৃতিতে।

রুদ্রের ‘আমি একা’ উচ্চারণটি এক অর্থে ওয়াল্ট হুইটম্যানের Song of Myself-এর প্রতিধ্বনি হলেও প্রকৃত অর্থে এটি তার প্রতিবাদ। হুইটম্যানের ‘আমি’ আত্মবিশ্বাসী ও বিশ্বজনীন; রুদ্রের ‘আমি’ ক্ষতবিক্ষত, দমিত, এবং সামাজিক কাঠামোর বন্দি। তবু উভয়ের মধ্যেই মানুষের প্রতি অগাধ আস্থা বিদ্যমান। রুদ্রের একাকিত্ব কোনো হতাশা নয়—এটি সেই প্রস্তুতি, যেখান থেকে নতুন সমাজের স্বপ্নের সূচনা হয়।

এই একাকিত্ব থেকে সমতার দিকে যাত্রাই রুদ্রের ইশতেহার-এর মর্ম। “আমার জীভ কাটা / তবু এক নতুন পৃথিবীর স্বপ্ন আমাকে কাতর করে”—এই স্বীকারোক্তি প্রমাণ করে, কবির ভাষা ক্ষতবিক্ষত হলেও তাঁর আশা অক্ষয়। কবি জানেন, পৃথিবীর চিকিৎসা বিজ্ঞানে নয়, বরং মানবিকতায়। “আমাদের চিকিৎসাবিজ্ঞান নিরোগ করবে পৃথিবীকে”—এই স্বপ্ন কোনো ইউটোপিয়া নয়; বরং বিজ্ঞান ও মানবতার মেলবন্ধনে বিশ্বাসী এক সমাজচিন্তার প্রতিধ্বনি। তাঁর পৃথিবীতে নারী শ্রমবতী ও লাবণ্যময়ী, পুরুষ কর্মঠ, শিশু সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ। এখানে শরীর, শ্রম ও স্বপ্ন পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একদল ‘সামান্য কিছু মানুষ’—যারা সবচেয়ে কম শ্রম দেয়, অথচ সবচেয়ে বেশি সম্পদ ভোগ করে। তারা সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের নামে তৈরি করেছে এক ভয়ংকর কারাগার। তাদের পুরুষেরা কদাকার, নারীরা কৃত্রিম, তারা মানবতাবিরোধী। রুদ্র তাদের বলেন “অতিকায় কদাকার বন্যমানুষ।” কবিতার অন্তিম পর্বে তিনি আহ্বান জানান—এই কারাগার ভেঙে, এই মানুষগুলিকে অতিক্রম করে, আবারও একটি উৎসবমুখর সমতার পৃথিবী গড়ার।

রুদ্রের ভাষা এখানে ঘোষণা, অভিশাপ, প্রার্থনা ও স্বপ্নের এক মিশ্র ধ্বনি। “আমরা উৎসব করবো শস্যের / আমরা উৎসব করবো পূর্ণিমার”—এই পংক্তিগুলো এক শোষণহীন ভবিষ্যতের প্রতীক। এই কবিতা তাই একাধারে ইতিহাসের রূপক ও ভবিষ্যতের ম্যানিফেস্টো।

এখানে তুলনা টানা যায় আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের Howl-এর সঙ্গে। Howl যেমন এক ক্ষতবিক্ষত প্রজন্মের আর্তনাদ—“I saw the best minds of my generation destroyed by madness”—তেমনি রুদ্রের ইশতেহারও এক ভাঙন ও বিশ্বাসহীন সময়ের আত্মপ্রত্যয়। গিন্সবার্গ যেমন মার্কিন ভোগবাদী সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান, রুদ্র তেমনি উপনিবেশোত্তর দুর্নীতিপূর্ণ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। ভাষা দুই কবির হাতেই পরিণত হয় অস্ত্রে; ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা রূপ নেয় সামাজিক ঘোষণাপত্রে।

একইভাবে বার্টোল্ট ব্রেখটের To Those Born Later কবিতার সাথেও ইশতেহার-এর আত্মিক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ব্রেখট লিখেছিলেন “in the dark times”–এ জন্মানো এক হতাশ প্রজন্মের কথা; রুদ্রও লিখেছেন এমন এক সময়কে কেন্দ্র করে, যখন মানুষ বারবার খাঁচায় বন্দি হয়েও মুক্তির স্বপ্ন দেখে। এই দুই কবিতাই মানবিক চেতনার ঘোষণাপত্র—একদিকে ইউরোপের ফ্যাসিবাদবিরোধী প্রতিবাদ, অন্যদিকে বাঙলাদেশের পরাজিত স্বাধীনতার অন্তর্গত শোক ও সম্ভাবনা।

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ইশতেহার আধুনিক বাঙলা কবিতার এক ব্যতিক্রমী মাইলফলক। এর ভেতরে আছে গদ্য ও কাব্যের সীমা অতিক্রমের সাহস, ইতিহাস ও দর্শনের সংলাপ, ব্যক্তি ও সমাজের দ্বন্দ্ব, এবং প্রেম ও বিপ্লবের এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই কবিতা একাধারে মানবিক আর্তি ও দার্শনিক ঘোষণা। এর মধ্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি ক্রমশ উন্মোচিত হয়, তা কেবল সমাজ-রাজনৈতিক নয়, নন্দনতাত্ত্বিকও বটে। তিনি বিশ্বাস করেন, কাব্যিক সৌন্দর্য ও রাজনৈতিক চেতনা পরস্পরবিরোধী নয়; বরং তারা একই মানবিক অন্তঃসত্তার দুটি রূপ। রুদ্র এখানে এক নতুন ভাষার জন্ম দেন—যেখানে বিপ্লব কোনো রোমান্টিক কল্পনা নয়, বরং উৎপাদন-সম্পর্কের সম্প্রসারিত রূপ। তাঁর ‘আমরা উৎসব করবো পূর্ণিমার’ উচ্চারণে যেমন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা ফিরে আসে, তেমনি ‘আমার জীভ কাটা’–র যন্ত্রণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সত্য ভাষার মূল্য আজও রক্তে পরিশোধ করতে হয়। এই দ্বৈত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই রুদ্র এক নতুন কাব্যতত্ত্ব নির্মাণ করেন—যা দুঃখের মধ্যেও আশার, হতাশার মধ্যেও মানবমুক্তির, আর ব্যক্তিগত ক্ষতের ভেতর দিয়েও সামাজিক স্বপ্নের কবিতা হয়ে ওঠে।

আজও এই কবিতা অনিবার্য, কারণ পৃথিবী এখনো বিশ্বাসহীন, সমাজ উৎসবহীন, রাষ্ট্র বন্দি। তাই ইশতেহার কেবল কাব্যিক স্বপ্ন নয়, এটি এক সতর্ক উচ্চারণ—যা না শুনলে ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হবে। এই কবিতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের মুক্তি কোনো রাষ্ট্রনির্ভর পরিকল্পনায় নয়; বরং যৌথ স্বপ্নে, সম্মিলিত ন্যায়বোধে, আত্মিক বিপ্লবে।

শেষমেশ, ইশতেহার এমনই প্রতিবিম্ব—যেখানে আমরা দেখি নিজেদের মুখ, আমাদের সময়ের মুখ, শাসকের মুখোশ। এবং কবি ঘোষণা করেন—এই মুখোশ একদিন খুলে ফেলতেই হবে। এই প্রত্যয়ের কবিতা ইশতেহার। এটি কেবল রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর নয়—এটি আমাদের সকলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ‘আমি’-র কবিতা, যে এখনো একা, কিন্তু বিদ্রোহে নিবেদিত। এর প্রতিটি পংক্তি মানুষের প্রতি কবির দায়বদ্ধতার সাক্ষ্য, আর প্রতিটি স্বপ্ন নৈতিক প্রতিরোধের প্রতীক। আজকের বিশ্ব যখন নতুন রূপে শোষণ, যুদ্ধ, ও বিভাজনের মধ্যে নিমজ্জিত, তখন ইশতেহার আমাদের জানান দেয়—কবিতা কেবলই সৌন্দর্যের চর্চা নয়, সত্য উচ্চারণের সাহস। রুদ্র তাঁর কণ্ঠে সেই সাহসেরই ধারাবাহিকতা নির্মাণ করেছেন; তাই তাঁর ইশতেহার আজও সমকালীন, আজও বিপ্লবী। এটি এমন এক কবিতা, যা আমাদের পুনরায় আহ্বান করে মানুষের প্রতি বিশ্বাস রাখতে, একাকিত্বের ভিতর থেকেও সমতার পথ চিনতে, এবং বারবার পতনের পরও উঠে দাঁড়াতে—ভালোবাসার, শ্রমের, আর মুক্তির ইশতেহার হয়ে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

দেবারতি মিত্র, বাঙলা কবিতার নীরবতম অথচ সবচেয়ে দীপ্ত কণ্ঠগুলোর একটি। যে সময়ে কবিতা ছিল জনতার উত্তেজনা, আন্দোলনের ভাষা, রাজনৈতিক বা নগর-অস্তিত্বের শব্দ, সেই সময়ে দেবারতি নিজের জন্য বেছে নিয়েছিলেন নিঃশব্দতা। তাঁর কবিতায় কেউ হাঁক ছাড়ে না, কেউ পতাকা উড়ায় না, কেউ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি স্লোগান তোলে না—কিন্তু প্রতিটি কবিতার ভেতরেই আছে অদৃশ্য প্রতিরোধের ধ্বনি, যা সময়কে অস্বীকারের ভাষায় অনুরণিত হয়। তিনি বলেছিলেন, “কবিতা নিয়ে আমি কিছু করতে পারি না, করতে চাই না, শুধু পৌঁছতে চাই সেই সমুদ্রের কিনারায় যার একদিকে জীবন ও শিল্প অন্য দিকে শূন্যতা যেখানে কল্পনা মুহুর্মুহু অবিরাম নিজেকে সৃষ্টি করে চলে। ঘটনাচক্রে আমার জীবনে কবিতার বিকল্প আর কিছু নেই, ওই একটিমাত্রই আমার পথ ও পাথেয়।” (ভূমিকা, কবিতা সমগ্র)

এই ‘কিছু করতে চাই না’—এই বাক্যটিই তাঁকে আলাদা করে। কারণ বাঙলা কবিতায় অধিকাংশই কিছু করতে চায়—উদ্ধার করতে, পরিবর্তন ঘটাতে, প্রতিরোধ জানাতে। দেবারতির আকাঙ্ক্ষা ছিল বিপরীতমুখী—তিনি কোনো লক্ষ্য স্থির করেননি, তিনি শুধু পৌঁছতে চেয়েছেন। 

তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধ স্কুলে ঘণ্টা বাজে’। নামেই নিস্তব্ধতার আওয়াজ আছে। অন্ধদের জন্য বাজে ঘণ্টা—এ কীসের সংকেত? হয়তো আলোহীন জগতে প্রতিধ্বনিই একমাত্র পথপ্রদর্শক। দেবারতির কবিতা সেই প্রতিধ্বনির পথে জন্ম নেয়—শব্দ, যা দেখতে পায় না, কিন্তু অনুভব করে। তাই তাঁর কবিতা পাঠে চোখ নয়, অন্তঃকর্ণ জরুরী হয়ে পড়ে।

দেবারতির জীবনের সবচেয়ে পরিচিত তথ্য—তিনি মণীন্দ্র গুপ্তের সহধর্মিণী। কিন্তু এই পরিচয়টিকে তিনি কখনোই তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের সঙ্গে মেলাননি। বরং এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “ওঁর কবিতা, আমার কবিতা—দু’জনেরই ঘর আলাদা, ছাদের নীচে থাকলেও।” এই বিভাজন, এই আত্মপরিচয়ের স্থিরতা—তাঁর কবিতার মধ্যেও গভীরভাবে উপস্থিত। তিনি নিজের স্বরকে মিশতে দেননি কারও সঙ্গে, এমনকি ভালোবাসার মানুষের সঙ্গেও নয়।

তাঁর কবিতায় প্রেম, মৃত্যু, নিঃসঙ্গতা—সবই আছে, কিন্তু কোনওটিরই স্পষ্ট আবেগ নেই। আবেগ যেন ছায়া হয়ে হাঁটে তাঁর কবিতার পাশে, কিন্তু তাকে কখনো ছুঁয়ে ফেলে না। যেমন তিনি লিখেছেন— “সমস্ত জীবন যদি জ্যোৎস্নায় একা থাকা যায় / যেখানে কেবল সুর, কোনও আলো নেই– / সোনার চুলের গোছা যেন খুলে গেল হু হু করে / বিরল জানালা দৃষ্টি ঢেকে অন্ধকার / রাশি রাশি সুরেলা যন্ত্রের সরু তার / তেমন জ্যোৎস্না নয় আমার শরীরে।‌” (তোমার জ্যোৎস্না সুর)

এই “সুর” এবং “আলো”-এর বিরোধেই দেবারতি দাঁড়িয়ে। আলো তাঁর কাছে প্রকাশ, সুর হলো অভ্যন্তর। তিনি প্রকাশের চেয়ে অনুভবকে বেশি মূল্য দিয়েছেন। তাঁর কবিতা অন্ধকারে ফোটা ফুল, যার ঘ্রাণ পাই, কিন্তু রঙ দেখতে পাই না।

দেবারতি মিত্রের কবিতা প্রথাগত নারীবাদের ঘোষণায় বিশ্বাসী নয়। কিন্তু তাঁর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে নারীর অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে। তাঁর উচ্চারণে কোনো স্লোগান নেই, কিন্তু এক আনকোরা-অনিবার্য সত্য আছে। নারী সেখানে সৃষ্টির সহযাত্রী নয়, সৃষ্টির একমাত্র অবলম্বন। ফলে তা পুরুষতান্ত্রিক বর্ণনার এক গোপন ভাঙন ঘটায়—নরমভাবে, কোমল কণ্ঠে, কিন্তু সম্পূর্ণ অনিবার্যভাবে।

তাঁর কবিতায় একটি বিষয় বারবার ফিরে আসে—একাকিত্ব। প্রেমেও তিনি একা, মৃত্যুতেও একা। তিনি কখনোই ‘দুজন’কে বিশ্বাস করেননি; হয়তো তাঁর কবিতার প্রেমিক-প্রেমিকাও একই শরীরে দুটি সত্তা। ‘রাত্রি জেগেছিলাম’ কবিতায় তিনি লিখেছেন— “ফুলদানি ঐ তোমার শরীর / কাল কে অত ফুল সাজিয়েছিল / আমার বুকে পাপড়ি ঝরেছিল / বুকের মধ্যে পাপড়ি উড়েছিল /…/ ঘুরে ঘুরে পাগল স্রোতের মতন অবিরাম / কালকে তোমার সঙ্গে যখন রাত্রি জেগেছিলাম।”

এই কবিতায় প্রেমের মাধুর্য নেই, আছে ঘূর্ণির তীব্রতা। দেবারতির প্রেম হলো প্রবাহ—নদীর মতো, যা একবার শুরু হলে আর থামে না। এখানে যৌনতা একটি গভীর সত্তার উন্মোচন—কিন্তু তা শরীর নয়, আত্মার। প্রেম এখানে মৃত্যুর সমার্থক—অন্তিমে এক নিঃশেষিত রাত্রি।

তাঁর অনেক কবিতায় প্রকৃতি আসে, কিন্তু তা কোনো অলঙ্কার হিসেবে নয়। বৃষ্টি, ফুল, ছায়া, আলো, নদী—সবই তাঁর কবিতায় আত্মীয় সত্তা। তিনি নিজেকে প্রকৃতির ভেতর বিলিয়ে দিতে চান। ‘বৃষ্টিতে আমি ও তুমি’ কবিতায় লিখেছেন— “গভীর বৃষ্টিপাতের পরে এখন জেগে উঠেছি, / অঝোর পাগল বৃষ্টিপাত, / ছাদ ভাসিয়ে জল জমেছে, / ঝুঁকে আসা কচি ত্রিচূড় শাখার মতো তুমি / আদর নিচ্ছ বৃষ্টিপাতের।”

এই চিত্রটি নিছক বৃষ্টির নয়—এ এক জেগে ওঠা আত্মার দৃশ্য। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি মানে আত্মপরিচয়ের রূপান্তর। মানুষ এখানে কোনো কেন্দ্র নয়; বরং মানুষ প্রকৃতির এক ক্ষুদ্র অথচ দীপ্ত অংশ।

দেবারতি মিত্রের কবিতা একরকম “বিচ্ছিন্ন আলো”—এতে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নেই, কিন্তু তবু এতে সময়ের বিরুদ্ধে থাকা এক প্রতিস্বর আছে। এক নির্দিষ্ট সময়ের সমাজে, যেখানে কবিতা হয়ে উঠছিল প্রতিবাদের ভাষা, তিনি নিঃশব্দতার পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁর এই অবস্থান অনেকের কাছে এক ধরনের ‘অপসরণ’ মনে হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে এটি ছিল নিভৃত, সংযমী এক অন্যরকম প্রতিবাদ। হয়ত তিনি ভেবেছেন, ভাষা যত বেশি উচ্চারণে ব্যস্ত হয়, ততই তার আত্মাকে হারায়।

এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল—‘আপনি কেন এত কম লেখেন?’ তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমি তো লিখি না, কবিতাই আমাকে লিখে নেয়।” এই বাক্যটি শুনলে মনে হয়, দেবারতি কবিতাকে ‘কাজ’ হিসেবে দেখতেন না, দেখতেন এক অন্তঃপ্রবাহ হিসেবে। তিনি লিখতেন তখনই, যখন ভাষা নিজে এসে তাঁর ভেতরে স্থান চাইত। এ কারণেই তাঁর কবিতার সংখ্যা কম, কিন্তু প্রতিটি কবিতা যেন নিজস্ব জীবন্ত সত্তা।

দেবারতির কবিতায় মৃত্যুর কোনো ভয় নেই, কারণ মৃত্যুকেও তিনি শ্বেতপদ্মের মতো পুনর্জন্মের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর কবিতার এই অন্তঃপ্রবাহ তাঁকে অন্যান্য সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা করে। যেখানে অনেকে জীবনের ভাঙনকে কাব্যের উপাদান করেছেন, দেবারতি সেখানে ভাঙনের মধ্যেই এক অনবচ্ছিন্ন শান্তি খুঁজেছেন। বলতে চেয়েছেন—চুপ থেকেও বাঁচা যায়, বিভক্ত পৃথিবীতেও অখণ্ড থাকা যায়, আর অসুখকেও ভালোবাসা যায়। মৃত্যু ছিল তাঁর কাছে স্থিতির নাম। মৃত্যুকে তিনি ব্যক্তিগত করে তোলেননি। মৃত্যু তাঁর কাছে সমগ্র সত্তার এক অনিবার্য গতি। এক সময়ের পরে সবাই জানালা খুলে দেবে, সবাই পর্দা উড়িয়ে দেবে—এটাই জীবন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে লিখেছিল রবিবার পত্রিকা: “তিনি ছিলেন আধুনিকতার অন্তরালে এক পরম নিভৃত কণ্ঠ।” এই বাক্যটিই হয়তো তাঁর সবচেয়ে সত্য বর্ণনা।

দেবারতি মিত্রর কবিতায় আছে নিঃশব্দ-সংলাপ—যেখানে কথা বলে বিরতি, আর উচ্চারণের চেয়ে গভীর হয়ে ওঠে স্থিতি। যেমন তাঁর ‘অসুখ করেনি’ কবিতা শুরু হয়—“আমাদের অসুখ করেইনি, সারবে কী?” এই প্রথম পংক্তিটিই যেন দেবারতির অন্তর্গত দ্বিধার রূপক। অসুখ, যেটি আমরা সারাতে চাই, তিনি সেটিকেই জীবনের অঙ্গ হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। অসুখই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার প্রাণরস। তাঁর “সঙ্গী” তখন বলে, “ওই যে কালকে শালিখ পাখিটাকে দেখলে / সুকুমারদের ছাতে স্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে, / এখন সে জলাভূমিতে শ্বেতপদ্ম হয়ে ফুটে রয়েছে।” এই চিত্রকল্পে বাস্তবের মৃত্যু আর পুনর্জন্মের অলৌকিকতা এক হয়ে যায়—যেন দেবারতির কবিতা প্রকৃতির পুনর্জাগরণের ভাষা। শালিখ পাখি স্তব্ধ হয়, কিন্তু তারই মৃতদেহ থেকে ফুটে ওঠে শ্বেতপদ্ম। জীবন, মৃত্যু, প্রেম—সবই এক অখণ্ড প্রতিক্রিয়া।
এরপর তিনি বলেন, “দুঃখ-কষ্ট-দারিদ্র-বেদনা-অশান্তি তো / প্রথম থেকে আছে, থাকবেই।” এই পংক্তি কোনো আক্ষেপ নয়, বরং এক চূড়ান্ত মেনে নেওয়া। দেবারতির কবিতার শক্তি এখানেই—তিনি দুঃখকে প্রতিরোধ করেন না, বরং তার সহাবস্থানে এক ধরণের শান্তি খুঁজে নেন। “তবুও তুমি আমি কিন্তু দুজনে চিরদিন / একসঙ্গে আছি, একসঙ্গে থাকব”—এই ঘোষণা শুধুমাত্র প্রেমের নয়, অস্তিত্বের। আমাদের অদৃষ্ট কেউ খণ্ডাতে পারেনি, পারবেও না—এই বিশ্বাস নিঃশব্দ প্রতিবাদের মতো। অসুখ সারবে না, কিন্তু সেটাই ভালো। দেবারতি বুঝেছেন, অসুখই জীবন, সারিয়ে তোলার চেষ্টা এক প্রকার মৃত্যুই। তাই তাঁর ভাষা নিভৃত অথচ দীপ্ত।

‘সবই অখণ্ড’ কবিতায় তিনি বলেন, “টুকরো টুকরো করে কিছু দেখো না, / সবই অখণ্ড।” এই ‘অখণ্ডতা’ই বোধ করি তাঁর কবিতার মূল তত্ত্ব। আধুনিক মানুষের দৃষ্টি যত খণ্ডিত, দেবারতির দৃষ্টি তত পূর্ণ। পৃথিবীকে আমরা যেভাবে ভাগ করি—রাজনীতি, প্রেম, দেশ, দেহ—সবখানেই তিনি সেই ভাগের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। “ভাগ-বিয়োগে কী লাভ? যোগ আর গুণ অঙ্কেরই বা কী দরকার?”—এই পংক্তিগুলো আধুনিক জীবনের গাণিতিক বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে এক অন্তর্মুখী ঘোষণা। তিনি সম্পর্কের গাণিতিক পরিমাপ মানতে চান না, সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতার অঙ্কে নিজেকে বাঁধতে চান না। তাঁর কবিতায় অঙ্কের পরিবর্তে কাজ করে অনুভবের নন্দনশাস্ত্র।

তাঁর কবিতার একান্ত আশ্রয় সেই অনুভবেই—“এইভাবে এসো, স্বপ্নকেও মুছে ফেলে / আমরা দুজনে মিলে একা একা থাকি। / অস্তিত্বে জাগরণ ও তন্দ্রা অহরহ / অনুভব করি। / কেউ আমাদের বোঝে না, বুঝবেও না।” (দুজনে মিলে একা একা) এই অংশে তাঁর চিরচেনা আত্মনিবিড় সুর আরও গাঢ় হয়ে ওঠে। স্বপ্নকেও মুছে ফেলা মানে কল্পনার পরিসর ছাড়িয়ে এক সত্যের দিকে এগোনো, যেখানে একাকিত্বই পরম সম্পর্ক। “আমরা দুজনে মিলে একা একা থাকি”—এই চূড়ান্ত বৈপরীত্যই দেবারতির ভাবগাম্ভীর্য। একা থেকেও যুগল, যুগলেও নিঃসঙ্গ। বোঝার আকাঙ্ক্ষা নেই, বোঝা যাবে না বলেই মুক্তি। এই মুক্তিই তাঁর কবিতার আত্মা।

তাঁর কবিতাসমগ্র পড়তে পড়তে মনে হয়, দেবারতি যেন এক আধুনিক উপনিষদ লিখেছেন—যেখানে প্রেমের মধ্যে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার স্নিগ্ধতা, নিঃসঙ্গতার মধ্যে রয়েছে সম্পূর্ণতার বিশ্বাস। তাঁর ভাষা স্নিগ্ধ, কিন্তু তা কখনোই কোমলতাবিলাসী নয়। বরং, সেখানে থাকে কঠোর প্রশান্তি—যেমন বৃষ্টির পরে মাটি গরম থাকে, কিন্তু পৃষ্ঠে নেমে আসে শীতলতা। দেবারতির কবিতা সেই রকমই: নীরব কিন্তু অগ্নিময়।

এই নিস্তব্ধতার উৎস খুঁজলে আমরা তাঁর সাক্ষাৎকারগুলিতে এর প্রতিধ্বনি পাই। একবার তিনি বলেছিলেন—“আমার কবিতা আমি কারও দিকে তাকিয়ে লিখি না। আমি শুধু ভিতরটা শুনি।” (সাক্ষাৎকার: আনন্দবাজার পত্রিকা, “দেবারতি মিত্র: আমি ভিতরটা শুনি”, ২০১৪) এই “ভিতরটা শুনি” কথাটাই আসলে তাঁর কাব্যদর্শন। তাঁর কবিতায় কোনো বাহ্যিক অলঙ্কার নেই, কোনো নাটকীয়তা নেই। বরং, অভ্যন্তরীণ সুরের ধীরতা, আত্মবিশ্বাস, এবং এক প্রকার অনাসক্তি আছে। আধুনিক বাঙলা কবিতায় যেখানে অনেকেই ছন্দের ভাঙনে আত্মপরিচয় খুঁজেছেন, দেবারতি সেখানে নীরবতার ভেতর দিয়ে পরিচয় গড়েছেন।

দেবারতির কবিতায় প্রেম কেবল রোমান্টিক সংলগ্নতা নয়; অস্তিত্বের সহযাত্রা। তাঁর পংক্তি—“আমাদের অদৃষ্ট কেউ খণ্ডাতে পারেনি, কেউ পারবেও না”—এই অদৃষ্টের মধ্যেই তিনি মানবজীবনের পরম আশ্রয় দেখেছেন। সম্পর্ক এখানে দেহগত নয়, এটি এক আত্মিক বন্ধন। “অসুখ করেইনি তো সারবে কী”—এই পংক্তি যতটা বিষাদময় শোনায়, ততটাই তা এক অন্তরঙ্গ স্বীকারোক্তি। জীবনকে তিনি চিকিৎসার বিষয় মনে করেননি, বরং তার রোগকেই জীবনের আরেক রূপ ভেবেছেন। এই অসুখই তাঁকে অনুভব করিয়েছে জীবনের সঞ্চার, ভালোবাসার স্থায়িত্ব।

দেবারতি মিত্র বাঙলা কবিতাকে রাজনীতির বাইরে এনে পুনরায় অন্তর্লোকের পথে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কাব্যস্বর কোনো ঘোষণায় বিশ্বাসী নয়, কোনো রণভূমিতে অবস্থান নেয় না। তিনি দেখিয়েছেন, কবিতা আসলে উচ্চারণ নয়, শ্বাস। শব্দ নয়, বিরতি।

আজকের কোলাহলময় সাহিত্যজগতে দেবারতির কবিতা প্রতিচিহ্ন বিশেষ। তিনি লিখেন— “সব শব্দ শেষ হলো / ঘণ্টা বাজে দূরে৷” সেই শব্দ আজও থেকে গেছে—নির্জন, কিন্তু দীপ্ত ভাবে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতায় করুণার সুক্ষ্ম আবরণ নিয়েও আবুল হাসান এক তীব্র আত্মবিদ্রোহী কণ্ঠস্বর। অনেকেই তাঁকে ‘আধুনিকতা’র বিষণ্ণ বংশধর বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা একটানা নির্জন নয়, বরং সেখানে পিছুটান, পরাজয়, প্রেম, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও রূপক-সংকেতের মধ্য দিয়ে গঠিত হয় এক ধরনের অন্তর্গত মহাকাব্য। এ মহাকাব্যে আবুল হাসান নিজের আত্মাকে খণ্ডিত ও প্রশ্নবিদ্ধ করে রাখেন—নগ্ন, ঋজু, অথচ অতল স্পর্শে নরম।

‘আবুল হাসান’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে। যা তাঁর কাব্যিক আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি—
“এটা কি পাথর নাকি কোনো নদী? উপগ্রহ? কোনো রাজা?
পৃথিবীর তিনভাগ জলের সমান কারো কান্নাভেজা চোখ?”
(আবুল হাসান)

এই প্রশ্নাবলী শুধু নাম বা সত্তা নয়, বরং একপ্রকার আত্ম-অনুসন্ধানের অন্তর্গত সংগীত। এখানে কবি নিজেই নিজের অস্তিত্বকে নিরীক্ষণ করছেন বহুবিধ রূপকে: পাথর, নদী, কান্নাভেজা চোখ, ছয়টি তারা। একজন কবির ‘নাম’ কখনো কেবল উচ্চারণ নয়—তা হয়ে ওঠে তার চেতনাসত্তা, তার কাব্যিক ঐতিহ্য ও আত্ম-সংগ্রামের প্রতীক।

এই আত্মসন্ধানের দুঃখ-গাঁথা এক অনন্য উদাহরণ তাঁর কবিতা “পাখি হয়ে যায় প্রাণ”, যেখানে স্মৃতি শুধু নয়, বরং একটি পুরাকালের জনপদের বিলুপ্তির সাক্ষী হয়ে ওঠে কণ্ঠস্বর:
“দূরে বসে প্রবাহের অন্তর্গত আমি, তাই নিজেরই অচেনা নিজে
কেবল দিব্যতাদুষ্ট শোনিতের ভারা ভারা স্বপ্ন বোঝাই মাঠে দেখি”
(পাখি হয়ে যায় প্রাণ)

আবুল হাসান আত্মজৈবনিক দৃষ্টিভঙ্গিকে কাব্যিক প্রহেলিকায় পরিণত করেন। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত স্মৃতি হয়ে ওঠে এক জাতির স্মৃতি, এক প্রজন্মের দুঃখবোধ, যার কোনো নিদান নেই, কেবল চিহ্ন থাকে। “উচ্চারণগুলি শোকের” কবিতায় দেখি, তিনি প্রশ্ন করেন:
“তবে কি আমার ভাই আজ ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?”
(উচ্চারণগুলি শোকের)

পতাকা কিংবা উৎসব হয়ে ওঠে অবিশ্বাস্য এক পরাবাস্তব। এই হারিয়ে যাওয়া একান্ত ব্যক্তিগত নয়— রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের চিরন্তন অদৃশ্য গহ্বর।

আবুল হাসানের কবিতায় প্রতীক ব্যবহারে অনন্যতা লক্ষ্য করা যায় “স্রোতে রাজহাঁস আসছে” কবিতায়, যেখানে রাজহাঁস কেবল একটি পাখি নয়, বরং প্রতীকী হয়ে ওঠে প্রেম, স্মৃতি ও রাষ্ট্রচর্চার। তিনি বলেন—
“আমাদের নৌকার জলে ভাসতে ভাসতে যেন প্রতীকের হাঁস
ঐ রাজহাঁস
জল থেকে আরো জলে,
ঢেউ থেকে আরো ঢেউয়ে ছড়াতে ছড়াতে
পৌঁছে যাব আগে।”
(স্রোতে রাজহাঁস আসছে)

এই যাত্রা আক্ষরিক নয়— অভ্যন্তরীণ অভিযাত্রা। আবুল হাসানের ভাষা আমাদের টেনে নিয়ে যায় আত্মপরিচয়ের গভীরে, যেখানে আমরা উপলব্ধি করি, সময় ও সমাজের ছায়ায় একজন কবি কীভাবে নৌকা, ঢেউ, রাজহাঁসের মতো ছায়াপ্রতিম উপমায় নিজেকে ধারণ করেন।

কিন্তু শুধু নিঃসঙ্গতা বা ব্যক্তিপরিচয়ের সংকট নয়—আবুল হাসান বাঙলা কবিতায় প্রবেশ ঘটিয়েছেন চাষাবাদের অন্যতর চেতনা, এক মহাকাব্যিক শ্রম ও প্রত্যয়ের রূপ। “কালো কৃষকের গান” কবিতায় তিনি লেখেন—
“দুঃখের এক ইঞ্চি জমিও আমি অনাবাদি রাখব না আর আমার ভেতর!”
(কালো কৃষকের গান)

দুঃখও এক কৃষিজমি, যেখানে কবি ধানের বদলে চাষ করেন অনুভবের শস্য, প্রজন্মের প্রতীকী যন্ত্রণা। তিনি কৃষকের চোখে কবিতার ভূমিকে দেখেন, যেখানে
“ও জল, ও বৃক্ষ, ও রক্তপাত, রাজনীতি ও নিভৃতি, হরিৎ নিভৃতি
পুনর্বার আমাকে হোমার করো”
(কালো কৃষকের গান)

এই হোমার-উল্লেখ কেবলমাত্র ধ্রুপদী রেফারেন্স নয়—এটি একান্তভাবে রাজনৈতিক। একাধারে গ্রিসের নারীর কামুকতা, অন্যদিকে বাঙলাদেশের দুঃখ, সবই এই কাব্যে একসঙ্গে মিশে যায়—যেমন প্রকৃতি ও শহর, স্মৃতি ও তমোহর।

তাঁর কবিতায় নারীচরিত্র ও কামনাবোধও একধরনের আবেগবিকর্ষের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। “পরাজিত পদাবলি” কবিতায় প্রেম ও রতির দহন ঘনিয়ে আসে বিচ্ছেদের রূপকে:
“তোমার কাছে গিয়েছিলাম রাতে নদীর ঢেউ
তোমায় আমি পরিয়েছিলাম অঙ্গুরীয় মেয়ে”
(পরাজিত পদাবলি)

এই ধরনের প্রেম—যেখানে কামনা ও করুণা একাকার, যেখানে রাজনীতি ও প্রেম মিলেমিশে তীব্র নরকবোধ তৈরি করে—এটাই আবুল হাসানের কবিতার প্রকৃত সুর। এমনকি “নিঃসঙ্গতা” কবিতায়, যেখানে একটি মেয়েশিশুর সহজ আকাঙ্ক্ষা হারিয়ে যায় চাঞ্চল্যের ভিড়ে, সেখানে আবুল হাসান লিখে যান—
“একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল
একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!”
(নিঃসঙ্গতা)

এখানে পুরুষ বলার মধ্যে আছে এক অভ্যন্তরীণ ভাষা ও গ্রহণযোগ্যতা খোঁজার আকুতি, যা এই কবির পুরো সাহিত্যকর্মের এক অপরিহার্য স্বর।

তবে আবুল হাসান কেবল শোকবহ কবি নন—তিনি আত্মিক প্রেমের পরিপ্রেক্ষিতে এক বৈচিত্র্য রচনা করেন “তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না” কবিতায়, যেখানে স্পিরিচুয়াল সংকেত এক আশ্চর্য মোহনায় মিলিত হয়। তিনি বলেন—
“আমি কাছে যাব আমি তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না!”
(তোমার চিবুক ছোঁব, কালিমা ছোঁব না)

এখানে ‘কালিমা’ তার অভিজ্ঞান হারায় না, কিন্তু তার ব্যঞ্জনা নতুন অর্থে উচ্চারিত হয়। শরীর ও আত্মার সম্পর্ক এক গভীর রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষিতে দাঁড় করিয়ে দেন কবি।

তাঁর “নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট” কবিতাটি নারীর ভোগ্য-অবস্থানকে কাঁপিয়ে তোলে।
“তুমি তো নও আম্রপালী, বর্তমানের নারী
তোমার লাগে লিনোলিয়াম সিফনঘেরা শাড়ি
তোমার লাগে সাত প্রেমিকের সুলভ করতালি,
বাগান তুমি, যুবারা যেন তোমার কেনা মালি।”
(নর্তকী ও মুদ্রাসঙ্কট)

এখানে রাষ্ট্র ও পুরুষতন্ত্রের চোখে নারী যেভাবে রূপান্তরিত হয়, আবুল হাসান সেভাবে তাদের মুখোশ খুলে দেখান, অথচ একপ্রকার করুণ রূপে।

সবশেষে, আমার অত্যন্ত প্রিয় এক কবিতা তাঁর “জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন”-এর কথা উল্লেখ করি—
“মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা”
(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন)

এত সরাসরি, এত উচ্চকণ্ঠ আত্মস্বীকারোক্তি বাঙলা কবিতায় দুর্লভ। আবুল হাসানের কণ্ঠ এখানে ব্যক্তিগত নয়, এক প্রত্যাখ্যাত রাষ্ট্রের কবি, এক নিঃসঙ্গ বোধিবৃক্ষের আত্মপরিচয়।

আবুল হাসান মারা যান মাত্র ২৮ বছর বয়সে। অথচ এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে তিনি বাঙলা কবিতায় রেখে যান এমনসব স্তব্ধ ও দীপ্ত প্রতীক, যা এখনো আমাদের কণ্ঠে ফিরে ফিরে আসে। তাঁর কবিতা নিঃসঙ্গ, কিন্তু নিজের মতো করে এক শুদ্ধ পথের খোঁজে অদম্য।

তিনি ছিলেন সেই কবি, যিনি বলেছিলেন—
“আমি বহুদিন একা একা প্রশ্ন করে দেখেছি নিজেকে”
এ প্রশ্নই হয়তো আজও বাঙলা কবিতার ভিতরে গুঞ্জরিত হচ্ছে—একজন আবুল হাসান হয়ে।

❑ সাম্য রাইয়ান 

কবিতার কাজ যদি হয় ভাষা দিয়ে এমন এক বাস্তব নির্মাণ করা, যা পাঠকের চৈতন্যকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়, তবে সব্যসাচী মজুমদার নিশ্চিতভাবেই এক আধুনিক কবিতার কারিগর। তাঁর কবিতা পঠনের অভিজ্ঞতা একান্তই শরীরগত, মানসিক ও পারিপার্শ্বিক দ্বন্দ্বে ঘেরা এক ভ্রমণ, যা পাঠককে সরলীকরণের বিপরীতে ঠেলে দেয়। এখানে কবিতা খণ্ড নয়, বরং প্রবাহ। এক ধরনের ভাষিক-সমগ্র যার মধ্যে ‘অংশভাগ’ হয়ে থাকে শরীর, মন, সমাজ, প্রকৃতি এমনকি ভাঙা ইতিহাসও।

সব্যসাচী মজুমদারের কবিতা এক অভিযান, যেখানে ভাষা শুধু বাহন নয়, বরং অন্বেষণের ক্ষেত্র; তাঁর পংক্তিমালা এক একটি জৈব-ভূখণ্ডের মতো বিচ্ছিন্ন, অথচ অভ্যন্তরীণ ছন্দে সংযুক্ত। তাঁর কবিতায় সময়, দেহ, ভাষা, যৌনতা ও ভূগোলের রক্তমাখা উপস্থিতি যেমন আছে, তেমনি আছে একধরনের জৈবিক নিরুদ্দেশতা—যা নিতান্ত চেনা বাস্তবের বাইরে, অথচ তারই অংশ। তাঁর কবিতা কোনো একক ব্যক্তিসত্তা ধারণ করে না—বরং ছড়িয়ে থাকে অনেক স্তরে।

এই স্তরবিন্যাসের একটি দৃষ্টান্ত হল “অংশভাগ” কবিতাটি, যা বারোটি খণ্ডে বিভক্ত হয়ে এক বিরাট অনুভূতির অনুপুঙ্খ পাঠ তৈরি করে। কবিতার প্রথম অংশেই উচ্চারণ করা হয় এক আত্মগত প্রত্যাহার, যে প্রত্যাহার কোনো আত্মদংশ নয়, কিংবা নিছক আত্মবিমুখতা নয়, বরং ইতিহাস, প্রেম ও সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে এক ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্জন্মের ইঙ্গিত। “পিছিয়ে এসেছি যত, ততটাই তোমার রোদ্দুর / যত দীর্ঘকাল যাই ততই শকুন…”—এই দুই পংক্তি যেন কবিতার গোড়াতেই পাঠককে জানান দেয়, এখানে সময় রৈখিক নয়; বরং ছিন্ন অংশের সমাহার। রোদ্দুর ও শকুনের দ্বৈততা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, আলো ও মৃতদেহ একই পৃথিবীর বাসিন্দা। এই দ্বৈততাই সব্যসাচীর কবিতার কেন্দ্রে অবস্থিত।

এই দ্বৈততার সঙ্গে যুক্ত হয় ফসিল, বাঁশি ও লিপির প্রসঙ্গ, যা একরকম প্রত্নচেতনাকে হাজির করে। “আমি কি বুঝি না তার বাঁশি, তার লিপি ও ফসিল”—এই পংক্তিতে ভাষা, সংগীত ও ইতিহাসের সংমিশ্রণে গঠিত এক পাণ্ডুলিপির আভাস পাওয়া যায়। কবি এক অতীত-অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী, যে বসন্তকালেও সামুদ্রিক প্রাণীর জন্ম প্রত্যক্ষ করে এবং এইসব বেঁচে উঠতে চাওয়া প্রাণী দেখে “বিশ্বাস করে মমির বিদ্বেষ”। বিদ্বেষ এখানে ভয় কিংবা অস্বীকার নয়, বরং মৃতকে শত্রু বলে মানার মধ্যে দিয়ে জীবনের প্রামাণ্যতা পুনরুদ্ধার।

এই দ্বন্দ্বে ধরা পড়ে শরীর ও দেহের ভেতরকার দূরত্ব। “যদিও দেহটি শরীরের মতো নয় / দ্রবণ দ্রবণ যুগ পার…”—এই উচ্চারণে সময়ের সঙ্গে শরীরের বিকলতা এক হয়ে যায়। শরীর আর প্রমাণ নয়, বরং দ্রবণে দ্রবণে ভেসে যাওয়া এক অবয়ব। এই দ্রবণের সঙ্গে যুক্ত হয় শরণার্থীত্ব—“নদী ডাকতে এখনও পার না / তুমি কি গো! / বস্তুত শরনার্থী প্রবাহ!” শরীর হয়ে ওঠে বহিষ্কৃত, অসার, অথচ প্রবাহমান। এই ‘নদী না ডাকার’ অপারগতা প্রেমেরও, সময়েরও।

একইসাথে দেখা যায়, বাষ্প, রোদ্দুর ও শ্রেণি-জটিলতার এক চমৎকার ব্যবচ্ছেদ। “বাষ্পের ভূমিকা বুঝি / কীভাবে জটিল হয় তার শ্রেণি!” এই শ্রেণিবিন্যাস শুধু সামাজিক নয়, প্রাকৃতিক উপাদানের মধ্যেও এক ক্ষমতার পরিসর নির্মাণ করে। সেই পরিসরে “একটি রোদ হয়ে গেছিল আরেক রোদ”—একটি আলোর অস্তিত্বকে গ্রাস করে অন্যটি। এই স্বপ্লবাক্য রচনার মধ্য দিয়ে সব্যসাচী ভাষার প্রপঞ্চটিকে উন্মোচন করেন, যেখানে ফাল্গুন এসে “কেবল বাগার্থ ঘটে”। সে ভাষা আর নিছক যোগাযোগ নয়, বরং এক ধরণের ছদ্মভাবনার উৎপত্তিস্থল।

কবিতায় কখনো কখনো ‘তুমি’ হয়ে ওঠে কৃষিজীবী, সংসারী অথবা প্রাকৃতিক প্রাচীনতায় গড়া এক শরীর। “তুমি ক্ষেতে ক্ষেতে পটল বুনেছ / পটলের ওপরে ওস / তাতে তৃতীয় দুনিয়া…”—এই পংক্তি কৌতুকমিশ্রিত হলেও প্রহসনের আড়ালে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতা অনুপমভাবে ধরা পড়ে। পটল শুধুই সবজি নয়; এটি হয়ে ওঠে তৃতীয় বিশ্বের প্রতীক—যার উপর অপ্রত্যাশিতভাবে ওস পড়ে, হয়তো আন্তর্জাতিক দৃষ্টি বা সাম্রাজ্যিক হস্তক্ষেপ। এই অনুপুঙ্খের মাধ্যমে সমাজ, ইতিহাস, রাজনীতি এক অন্তঃস্রোতের মতো কবিতায় ঢুকে পড়ে।

শরীর ও সমাজের দ্বিমুখিতা আরও সুস্পষ্ট হয় “তুমি দ্বিমুখী হরিণ / দৌড়ে পার হচ্ছ সন্ন্যাস-গ্রহণ, কিসসা, রামায়ণ” উচ্চারণে। এখানে হরিণ শুধু নিরীহ নয়; ছলনারও আরেক নাম, দ্বিধাগ্রস্ত এবং ধর্মীয় আখ্যানের সীমায় ধাবমান। এই দ্বিমুখীতা বাঙলা আধুনিক কবিতায় বহুল ব্যবহৃত হলেও সব্যসাচীর হাতে তা মিথ-উন্মোচনকারীর মতো হয়ে ওঠে—যেখানে ‘সিউডো ধারণা’ মাথায় নিয়েই প্রেম, সমাজ ও ইতিহাস ছুটে চলে।

সবচেয়ে সংবেদনশীল ও দর্শনমূলক যে অনুচ্ছেদটি দেখা যায় তা হল—“কিছুটা পাহাড়ি ছাঁদে আমার মরণ / সেভাবে কি বলা যায়— কেন যে মরেছি!” এখানে মৃত্যু ব্যক্তিগত নয়; তা এক অভিজ্ঞতার ভাষায় রূপান্তরিত হয়। সেই মৃত্যু রেণুতে পৌঁছায়, পূণর্ভবার প্রশ্ন তোলে। অথচ কবি স্বীকার করেন: “বুঝিনি আমি তোমার হলুদ / বুঝিনি তোমার মতো ওড়ার কারণ”। এই ‘তোমার’ প্রতীক কখনও নারী, কখনও দেশ, কখনও স্বপ্ন—তবে তার মূল রহস্য এক অপার ওড়ার ভঙ্গিমা।

শেষদিকে এসে কবি আমাদের ফেলে যান একটি স্তম্ভিত বাস্তবতার মুখোমুখি। “তবে কি অবর্ণনীয় ঘাসে / আমি হাড় কটি পুঁতে চলে যাব?”—এই প্রশ্নে মৃত্তিকার সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত হয়। এই হাড় পোঁতা এক মুদ্রাদোষ নয়; বরং তা নতুন ভাষার জন্মস্থান। কারণ পরক্ষণেই উচ্চারিত হয়: “তুমি দেখবে অবিন্যস্ত ভূমি / ফুটেছে জগৎ…”—এ যেন মৃত্যুর মধ্য দিয়েই এক জগৎ তৈরি হবার রহস্য।

এই রহস্যের অভ্যন্তরে থাকে এক বিক্ষিপ্ত গান, এক ভাঙা নদীর পার হয়ে যাওয়া, একক শেয়ালের ডাক, এবং প্রান্তিক জনতার কোলাহল—যা সব্যসাচীর কাব্যভাষায় গড়ে তোলে এক প্রত্নঋতু। এই কবিতাগুলো পাঠক ফিরে ফিরে পড়ে; পড়তে হয়। কারণ এগুলো এক পাঠে আত্মস্থ হয় না, বরং শরীরের ভেতরে জমে থাকে।

শুধু “অংশভাগ” নয়, “কবিতা”, “যৌথরাগ” ও “সারঙ”-এর মতো কবিতাগুলিও সেই জৈবিক-বিকল চৈতন্যের ধারক। “কবিতা”-য় লেখা হয়, “একাকী মাংসের বিনীত চলে যাওয়া / তুমুল মেঘ দিল অসহ্যে…”—এ যেন আত্মার মাংসে রচিত বেদনা। আবার “যৌথরাগ”–এ যৌনতা এক চৈতন্য হয়ে ওঠে। সেখানে বলা হয়: “দ্রংষ্ট্রা চাই লিঙ্গ চাই / নিঃসহায় তক্ষকের / গন্ধ চাই স্বপ্ন চাই”—যৌনতা এখানে পুরুষতন্ত্রের ভাষায় নয়, বরং এক আকুল প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপান্তরিত।

“সারঙ” কবিতায় আবার নদী ও শরীর এক অনুপম মিথোজীবিতার ভাষা রচনা করে—“তুমি তা জেনেও ফের রুক্ষস্তনদ্বয় / মেলেছো রোদের দিকে মফসসলি মেয়ে”—এই মফস্বল যেন শুধু ভৌগোলিক নয়, এক সাংস্কৃতিক উপনিবেশ, যেখানে নারী শরীর বারবার ধুয়ে নেয় প্রান্তিকতা, প্রলয় ও প্রেম।

এই সবকিছু মিলে সব্যসাচীর কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে স্বরলিপিহীন সংগীত, যার ধ্বনি শোনা যায়, অর্থ ধরা যায় না—তবে অনুভব করা যায় অক্ষরের শরীর। তাঁর কবিতা কেবল পাঠ্য নয়, এক ধরণের বহুমাত্রিক ভাস্কর্য, যাকে ছুঁতে গেলে আপন শরীরের সীমা টের পাওয়া যায়।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *