সাক্ষাৎকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সাক্ষাৎকার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সরকার আশরাফ সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন নিসর্গ বইমেলা ২০২৫ সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছে৷

নিসর্গ: একজন লেখকের সামাজিক দায় ব্যাপারটা কেমন?

সাম্য রাইয়ান: লেখকের সভ্যতার প্রতি দায়, নিজের প্রতি দায়। সমাজের চাহিদা মেটানোর কোনো দায় লেখকের নেই। লেখক যদি সত্য বলতে-লিখতে পারেন, তাহলেই তার দায় পূরণ করা সম্ভব। একেকজন লেখক একেকরকম স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। কেউ ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য, কেউ জাতিগত স্বাধীনতার জন্য, কেউবা লেখার ফর্মের স্বাধীনতার জন্য...। এটা নির্ভর করে নির্দিষ্ট স্থান-কাল ও লেখকের শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির উপর। 

একজন লেখক যে শ্রেণি-অবস্থান থেকেই আসুন না কেন যদি তিনি সৎ ও সংবেদনশীল হন, তাহলে অবশ্যই তাঁর সাহিত্য ক্ষমতা ও আগ্রাসনের বিপরীতে নিপীড়িতের পক্ষে দাঁড়াবে।

কর্পোরেট, ক্ষমতা (power) এর প্রভাবমুক্ত থাকতে না পারলে মুক্ত বা স্বাধীন চিন্তা চর্চা করা অসম্ভব। দুর্বৃত্ত পুঁজির করাল গ্রাস থেকে, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে না পারলে স্বাধীন সৃষ্টি অসম্ভব। একারণেই নতুন চিন্তা-বোধের কারিগর কোনোরূপ চিন্তার দাসত্ব করতে পারেন না। তা সে হোক মহৎ কিংবা হীন চিন্তা।

বাঙলাদেশের দৃশ্যমান লেখকরা, যাদেরকে ইদসংখ্যা-পুজা সংখ্যা-বিজ্ঞাপন-মঞ্চ-টেলিভিশন সর্বত্র মুহুর্মুহু দেখা যায়, এদের অধিকাংশ সাহিত্যিকই নয়, বরং সাহিত্যিকের মুখোশ পরে আছে, যেন একেকটা ফেক আইডি। বছরের পর বছর ক্ষমতা আর সাহিত্যপাতায় একে অপরের পেছনে তেল ঘষাঘষি করে, মঞ্চে আসন পেতে গলায় ক্ষমতার মেডেল ঝুলিয়ে সুবিধার নানা প্রপঞ্চের দাসত্ব করে চলেছে। অথচ আমাদের দরকার অবিক্রিত ও অবিকৃত লেখক-বুদ্ধিজীবী।

নিসর্গ: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে নানা পট পরিবর্তনে লেখকদের ভূমিকা ও অবস্থান ক্ষমতার সাথে পরিবর্তিত হতে দেখা যায়, এই বিষয়টিকে নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

সাম্য রাইয়ান: প্রথমত বাঙলাদেশে সাহিত্য, লিটল ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা, প্রকাশনা শিল্প সবকিছুই অবিকশিত। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আজ পর্যন্ত হাতে গোণা কয়েকজন মাত্র ব্যক্তি ‘সাহিত্যিক’ হয়ে উঠতে পেরেছেন, বাকি সব দলিল লেখক তুল্য। ফলে এদের না আছে প্রজ্ঞা, না আছে সত্য লেখার সাহস। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও এখানে পাঁচটা জাতীয় সাহিত্য পত্রিকা নাই, যেখানে নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করতে পারবে এদেশের ৬৪ জেলার লেখকগণ! এমন পাঁচজন প্রজ্ঞাবান লেখক নাই, যাদের জীবন সাহিত্যে সমর্পিত— যার কাছে নতুন লেখকরা নিঃসঙ্কোচে হাজির হতে পারেন তার পা-ুলিপি নিয়ে, সংকটকালে যিনি নতুন দিশা হাজির করতে পারেন! ‘বাংলা একাডেমী’ এখনো জাতির মননের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেনি! আমাদের চলমান পরিস্থিতি যখন এমনই প্রতিকূল, তখন সংঙ্কৃতির ভাঙা সেতুটাকে নতুন করে জোড়বার প্রয়াস শুধু কঠিনই নয়, অসম্ভবতুল্য।

ফলে মানতে কষ্ট হলেও সত্য এইই যে, সাহিত্যিক হয়ে ওঠার যাপন এখানে চোখের সামনে উপলভ্য নয়। সকল বেড়াল নিজেকে বাঘ ভেবে হালুম করে ওঠে! 

ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের দালালিও পরিবর্তন হয়। দেখবেন জুলাই অভ্যুত্থানের আগে যারা বিগত রিজিমের দালালি করতো, অভ্যুত্থানের পর তারা নতুন রিজিম প্রতিষ্ঠার জন্য দালালি অব্যাহত রেখেছে। এইটা মূলত কালচারাল ফ্যাক্ট। কালচারাল রেভল্যুশন তো হয়নি এদেশে। এক মুঠো ভাতের জন্য কেউ রাস্তায় পড়ে আছে, কেউবা দাঙ্গা-হাঙ্গামা এমনকি খুন করতেও দ্বিধাহীন। লেখকরা যদি সত্যিকার লেখক হয়ে উঠতো, তাহলে এই সকল সংকট তাদের সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো। অথচ তারা নিজেরাও এত অসক্ত বৈষয়িক নানা লোভে, যার কাছে ভাল দাম পায় তার কাছে কলম বন্ধক রাখে। সম্প্রতি দেখছি মামুলি আইফোন-ম্যাকবুকের জন্যও অনেকে জিভ ক্ষয় করতে দ্বিধা করছে না! এদের কোনো আদর্শই নাই। এরা মূলত টাকার জন্য কলমকে খদ্দেরের সাথে শুইয়ে দেয়। আর যারা প্রকৃতই সুশাসন চায়, গণতন্ত্র চায়; তারা সব আমলেই সংখ্যালঘু-নিপীড়িত।

নিসর্গ: দেশে যে প্রমিত ভাষার বিপক্ষে একটা ভাষার রাজনীতি চলছে- এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখা উচিত?

সাম্য রাইয়ান: ভাষা ও উপভাষার সাহিত্যিক প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নাই। বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব। একথা আমরা সবাই জানি, ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে লিখিত ও কথ্যরূপে তার ব্যবহার দরকার। ফলে উপভাষার সাহিত্য নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি বাঙলার সকল উপভাষা জানি-বুঝি না, সেইটা আমার ব্যর্থতা।
তবে এদেশের ঢাকাই সাহিত্যের ক্ষমতাধর কিছু লোক প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে ক’বছর যাবত জেহাদ ঘোষণা করেছেন, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত তাত্ত্বিক ভিত্তি আমি খুঁজে পাই না।

বরং অন্য পয়েন্টে কিছু প্র্যাক্টিকেল সমস্যা তৈরি হচ্ছে। বাঙলাদেশে উপভাষা কিন্তু সংখ্যায় কম নয়। এক্ষেত্রে মান ভাষায় যারা লিখছেন সেটা সাধারণ ঘটনা, কিন্তু রংপুর বা বরিশাল অঞ্চলের একজন লেখক তিনি চাইলে তার উপভাষায় লিখতে পারেন, এতে করে তার উপভাষাটি বিকাশের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু প্র্যাক্টিকেল সমস্যাটি হলো, তাদের কেউ কেউ ঢাকাই উপভাষায় লিখে নিজেকে আরবান হিসেবে উপস্থাপনের প্রয়াস পাচ্ছেন। তাঁর জন্মঅঞ্চলের উপভাষা নিয়ে একজন লেখকের এই হীনমন্যতা গভীরভাবে সমস্যার কারন তো! বরং বাঙলার সকল উপভাষায় যদি সাহিত্য রচিত হতো, তাহলে বাঙলার ভাষাবৈচিত্র্য অপূর্ব ভঙ্গিতে দৃশ্যমান হতো। সেটা আদতে ভাষার কাজে লাগতো। এখন লেখক কোন ভাষায় লিখবেন তা অবশ্যই তার মর্জি। কিন্তু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সামগ্রিক প্রবণতা নিয়ে আলোচনা হওয়া সময়ের দাবি।

আর এক্ষেত্রে যারা অগ্রণী রাজনীতিবিদ, তাদের সামগ্রিক কাজকর্মও সুবিধার না তো। এরা নাটক-সিনেমা বানাচ্ছেন, সেইখানে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, নারী-পুরুষ সম্পর্ক যেভাবে হাজির করছে, প্রেম ও যৌনতা যেভাবে উপস্থিত করছে তাকে সফট পর্ণের বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না। এখন ফেসবুক রিলস ভিডিওর যে অবস্থা, এদের নাটক-সিনেমাও তেমনি। আর্টকালচারের নামে এরা প্রতারণা করছে।

নিসর্গ: সাহিত্যে ইতিহাসচেতনা কীভাবে রক্ষিত হবে যা অতিরঞ্জন বা ক্লিশে মনে হবে না?

সাম্য রাইয়ান: বাঙলাদেশের তথাকথিত লেখকের দল বছর বছর শুধু ক্ষমতার দালালী করে গেল— সেলিব্রেটি হলো, পদবীর লোভে পদলেহন করে গেল! ফলে এদের বদমায়েশির শিকার এদেশের সাহিত্য-ইতিহাস। শিল্পীর প্রধানতম কর্তব্য হলো তাকে সত্য বলতে হবে। এই কর্তব্য যদি সে সঠিকভাবে পালন করতে পারে, তাহলেই যথেষ্ট। লেখক-শিল্পী সে নয়, যে অতিরঞ্জিত করে। আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালে আমরা যত লেখককে মুহুর্মুহু দেখতাম, বলতে গেলে সবাইই নানাভাবে ক্ষমতার পদলেহন করেছে— এই পদলেহনকর্মই আওয়ামীলীগকে ফ্যাসিবাদী করে তুলেছিল। যখন আওয়ামী লীগের পতন হলো তখন সেই লেখকগুলোকেই দেখলাম কেউ বিএনপি, কেউ জামাত আবার কেউ বৈষম্যবিরোধী ও অন্য অনেক নামে অনেক ক্ষেত্রে ভীড়ে গেল। এদের না আছে সততা, না আছে প্রজ্ঞা।
লেখকের পরিমিতিবোধ থাকার কথা সবচে বেশি। আমি কতটুকু লিখবো, আর কতটুকু না— এই বোধ না থাকলে সে সাময়িক হাততালি পেলেও শেষ গন্তব্য আস্তাকুঁড়। লেখক সমাজের সেই প্রয়োজনীয় ইনজেকশন যা শরীরে ইনজেক্ট করার সময় ব্যথা লাগে বটে, কিন্তু এর সুদূরপ্রসারী ফল সভ্যতার উপকারেই লাগে। কিন্তু সমকালে সেই ব্যথাটুকু সমাজ গ্রহণ না-ও করতে পারে। এখন লেখক যদি মনে করেন, সমাজ মুচমুচে তেলেভাজা খেতে পছন্দ করছে বলে তাকে তা-ই সরবরাহ করি, তাহলে তা সমকালে যতই প্রশংসিত হোক না কেন, দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারন। যে ক্ষতি অতীতের অনেক লেখক করেছেন, এখন অনেক তরুণও করে চলেছেন। জনপ্রিয়তার লোভ লেখককে সভ্যতার অশ্লীল ক্লাউনে পরিণত করে।

নিসর্গ: আড্ডা বা ছোটকাগজ বা ইত্যাকার গোষ্ঠীবদ্ধতা সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: আড্ডা ও লিটল ম্যাগাজিন অঙ্গাঅঙ্গীভাবে যুক্ত। আর সৃজনশীল গোষ্ঠীবদ্ধতা লিটল ম্যাগাজিনের গ্রাউণ্ড। এক বা একাধিক লেখক যখন প্রচলিত চিন্তা-পদ্ধতির চর্চাপথে হাঁটাচলা করতে না পেরে নতুন পথের নির্মাণ করতে উদ্যত হন, তখনই গড়ে ওঠে লিটল ম্যাগাজিন। যে নিজেই নিজের পথ-নির্মাতা। গুচ্ছ গুচ্ছ নতুন পথের যাত্রীর আশ্রয়দাতাও সে-ই। লেখককে সে আটকে রাখে না, সীমাবদ্ধ করে না; অসীম ছোঁবার স্বপ্নটি দৃঢ়তার সাথে উস্কে দেয়। একটি সত্যিকার লিটল ম্যাগাজিন লেখককে নিয়ন্ত্রণ করে না, লেখককে ধারণ করে। লেখকের হাতের সাথে পা বেঁধে বলে না, ‘উড়ে যাও’; বরং বাঁধন খুলে দেয়ার গেরিলা ভূমিকা পালন করে সে।

আমাদের বঙ্গদেশে আরেকধরনের নীচশ্রেণির গোষ্ঠীবদ্ধতাও সগৌরবে চলমান! সাহিত্যিক গোষ্ঠীর নাম করে ক্ষমতাবান লোকেরা ব্যক্তিগত বাহিনী তৈরি করে বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন! এরা ইচ্ছে হলে যা খুশি করতে পারে। জাতীয় কমিটি করতে পারে, আন্তর্জাতিক কমিটি করতে পারে, লিটলম্যাগ-জাতিগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বিবৃতি দিতে পারে, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করতে পারে, লিটলম্যাগের নামে জুতোর দোকান দিতে পারে, লিটলম্যাগের সমিতি বানাতে পারে; এবং সকল কর্মকান্ডে ট্যাগলাইন দিতে পারে ‘সারাদেশের লিটলম্যাগ কর্মীদের পক্ষ থেকে!’ জ্বি এরই নাম প্রেম, প্রেমের নাম বেদনাৃ ও না স্যরি, এরই নাম ক্ষমতা, ক্ষমতার ডাকনাম ‘পাওয়ার’।

এইভাবে পুরনোপন্থী কিছু পার্টিআম্রেলাপার্সন নিজেদের কয়েকটি ‘লিটল ম্যাগাজিন’কে সারাদেশের লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার যে পথ দেখিয়েছে তারই পথ ধরে এখন দেশে ধর্মীয় পত্রিকাগুলোও নিজেদের সাহিত্যের লিটল ম্যাগাজিন দাবি করছে। খেলা শুধু এখানেই থেমে নেই, তারা ধর্মীয় পত্রিকাগুলো দিয়ে লিটল ম্যাগাজিন মেলা করছে, লিটল ম্যাগাজিন সমিতি বানাচ্ছে।

পুরনো চিন্তারপথের এই যাত্রীগণ লিটল ম্যাগাজিনের কাঁধে তাদের পুরনোপন্থী নানারকম— মনের মাধুরী মেশানো এজেন্ডা চাপিয়ে লিটলম্যাগের চলন ভারাক্রান্ত করতে চান। অথচ, এই সবরকম ফর্মেশন উল্টে দেয়াই লিটল ম্যাগাজিনের ধর্ম। লিটলম্যাগ— সে তো সকল প্রচল-প্রথার বিরূদ্ধে— যা কিছু প্রতিষ্ঠিত-আরোপিত— সেই সকল পদ্ধতি/সংজ্ঞার বেড়ি ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়। কবিতার মতোই সে স্বাধীন ও মুক্ত। প্রাতিষ্ঠানিক চিন্তাপদ্ধতির সম্পূর্ণ বিপরীতে তার অবস্থান। পুরনো চিন্তা দিয়ে তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলার চেষ্টা বাতুলতামাত্র!

একসময় এদেশে লিটলম্যাগের পাওয়ারফুল গোষ্ঠীগুলোর একমাত্র এজেন্ডা ছিল দৈনিক পত্রিকায় গল্প-কবিতা ছাপানোর বিরোধিতা করা। অথচ লেখক কোথায় লিখবেন, না লিখবেন, এইটা সেকেন্ডারি ইস্যু। গোটা দুনিয়ায় ফার্স্ট ইস্যু হচ্ছে লেখক কী লিখবেন, কীভাবে লিখবেন, কেন লিখবেন। কিন্তু ১৯৮০-র দশক থেকেই এইদেশে হলো উল্টো। লেখক কোন কাগজে লিখবেন, এটাই হয়ে গেল প্রধানতম আলোচ্য। ফলে শিল্পকলা শিল্পহীন, রইলো শুধুই কলা। তারই ফলাফল এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। অবিকশিত এই মুভমেন্ট হাজামজাডোবা পুকুরে ডুবে রইল। নতুন সাহিত্য নির্বাসিত, লিটলম্যাগ মুভমেন্ট বিপর্যস্ত। অবস্থা নির্মম, দুঃখজনক। না কোনো নতুন সাহিত্যতত্ত্ব, না কোন  নতুন সাহিত্যদর্শন— কিছুই দেয়া গেল না, আন্দোলিত হলো না সাহিত্য! একারণেই কলকাতার পঞ্চাশ বছর আগের কবিতা কিংবা ইউরোপ/লাতিনের দুইশ বছর আগের কবিতা লিখতে পারলেই আনন্দে-আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাচ্ছি! কেউ কেউ তো আরো এক কাঠি সরেস— শতবর্ষ আগের কবিতার অনুকরণে লিখে নিজেকে নতুন সাহিত্যের প্রবক্তা দাবি করে বসছে! কতই রঙ্গ দেখি বাঙলায়!

তবুও থামে না প্রয়াস! কুমিরের খাঁজ কাটা গল্পের মতো লিখিত হতে থাকে দিস্তা দিস্তা এজেন্ডা, বস্তা বস্তা ধুলোবালির স্তুপ— গার্ডার ভেঙে যায়, তবু হুশ ফেরে না।

দুঃখটা কী জানেন, যে লিটলম্যাগ প্রচল-প্রথার বিরুদ্ধে, গত দশ বছরে তাতে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের লোকেরাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার ক্ষমতা-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, তাতে এখন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামাতের নেতারাও ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে! যে লিটলম্যাগ সকল প্রকার আধিপত্যের বিরুদ্ধে, তাতে এখন কর্পোরেট ঢুকে গেছে নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে!

অথচ, লিটল ম্যাগাজিনের এজেন্ডা বলে যদি কিছু হয়, হতে পারে শুধু একটাই— লেখকের স্বাধীনতা!

নিসর্গ: দেশের সাহিত্য পুরস্কারগুলোর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ কেমন মনে হয়? পুরস্কারগুলো সাহিত্যের কী কাজে লাগে?

সাম্য রাইয়ান: সবথেকে হাস্যকর ব্যাপার হলো, বৃদ্ধ বয়সেও এদেশে লেখকরা কোনো পুরস্কার গ্রহণই বাদ রাখতে চান না; নানান পুরস্কার নিতে হাজির হন নগরে ও গ্রামে। যাদের বরং তরুণদের পুরস্কৃত করার কথা, আলোচনা-সমালোচনা দিয়ে, তারা নিজেরাই সেখানে পুরস্কার নেয়ার জন্য লালায়িত হয়ে থাকেন। আমি যখন দেখি যে লেখকের বিচারকের আসনে থাকার কথা সে নিজেই পুরস্কার নিচ্ছে— আমার হাসি পায়। 
এদেশে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পুরস্কার দেখলাম না যেটা সত্যিকার অর্থে লেখকের কোনো কাজে এসেছে। অন্তত যদি টাকাপয়সা দিত পাঁচ-দশ লাখ, তাতে অন্তত লেখকের কিছু উপকার হতো। কিন্তু ম্যাক্সিমাম পুরস্কারই অর্থমূল্যহীন। ফুলের মালা গলায় দিয়ে মামার বাড়ি যাই। এরা বরং সাহিত্যকেই হাস্যকর করে তুলেছে। লেখক যদি লিখে সম্মানের জীবন যাপন করতে না পারেন সেটা সমাজের পশ্চাৎপদতার নিদর্শন। লেখক যদি বই বিক্রি করে ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করতে না পারেন তাহলে তিনি যখন ক্ষমতার পদলেহন করেন, সমাজের সে বিষয়ে কিছু বলার নৈতিক অধিকার থাকে কি? এদেশে এমন লেখক কেন আমরা পাই না যিনি শেষ বয়স পর্যন্ত লেখার মান ও সততার সাথে কম্প্রোমাইজ করেননি? এগুলো নিয়ে আমাদের চিন্তা করা দরকার।

এইসব পথচলতি পুরস্কারের অর্থমূল্য ছাড়া আর সব অপ্রধান আমার বিচারে। এখানে সরকারি-বেসরকারি বলতে গেলে সকল পুরস্কারই নিজেদের অসাহিত্যিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো বেড়ালকে বাঘ হিসেবে হাজির করতে চায়। বাংলা একাডেমি পুরস্কার হতে পারতো এদেশের লেখকদের জন্য সম্মানজনক পুরস্কার। কিন্তু ওর সাহিত্যিক মান লোক পুরস্কারের চেয়ে খারাপ। লোক পত্রিকা যে কয়েকজনকে পুরস্কার দিয়েছে যদিও তারা সকলে সম্পাদকের ১৯৯০ দশকের বন্ধু-বান্ধব, সে যা-ই হোক; তবু তারা সাহিত্যিক তো অন্তত। তাদের প্রত্যেকেরই উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম রয়েছে। কিন্তু বাংলা একাডেমি যা আমাদের ‘জাতীয় মননের প্রতীক’ হবার কথা ছিলো, সেখানে যাদের পুরস্কৃত করা হয়, তাদের অধিকাংশই সাহিত্যিকই না। এগুলো জাতির সাথে মশকরা, প্রতারণা। বছরের পর বছর এগুলো চলছে। দেখার কেউ নেই—কথা বলার কেউ নেই। যাদের মাঝে মাঝে এসব নিয়ে হাউকাউ করতে দেখি তার অধিকাংশই মূলত নিজেরা না পাওয়ার বেদনা নিয়ে হাউকাউ করছে৷ এদের চাওয়া ভীষণরকম আত্মকেন্দ্রিক।
অথচ একজন প্রকৃত লেখক, সে কখনোই বিক্রির জন্য নয়, সহজলভ্য নয়। চোখ ঘোরালেই তাকে পাওয়া যায় না। সভ্যতার সংখ্যালঘু জীব।

বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্য রাইয়ানের সাক্ষাৎকার৷

৯ই জুন ২০২৫ তারিখ বাংলা ট্রিবিউন পত্রিকায় প্রকাশিত৷

বাংলা ট্রিবিউন: কোন বিষয় বা অনুভূতি আপনাকে কবিতা লিখতে অনুপ্রাণিত করে?

সাম্য রাইয়ান: যা কিছু আমাকে চিন্তিত করে, যা আমি ভাবি—অনুভব করি, তারই নির্যাস কবিতা৷ আমার জীবন—সামগ্রিক অর্থে যাপন (দরশন) ও তার সাথে সম্পর্কিত সবকিছু নিয়ে আমার কবিতাযাত্রা৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি কী ধরনের থিম বা বিষয় নিয়ে কবিতা লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
সাম্য রাইয়ান: সাধারণত আমি মানব মনের বৈচিত্রময় অনুরণন লিখতে পছন্দ করি৷ সেই অর্থে বলা যায় প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশই আমার লেখার বিষয়৷ এখন অব্দি এর বাইরে কিছু লিখতে পারিনি৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তাৎক্ষণিক অনুপ্রেরণায় লেখেন, নাকি ধীরে ধীরে শব্দ সাজান?
সাম্য রাইয়ান: যখন আমি আইডিয়া পাই তাৎক্ষণিক চিন্তায় অনুপ্রাণিত হই, কিন্তু কবিতার অবয়বে তা ধীরে ধীরে রূপ পায়৷ আমি হয়তো একটা শব্দকে কেন্দ্র করে ভাবতে শুরু করলাম, ঐটা সেন্টার পয়েন্ট; যাকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ পরিসর গড়ে ওঠে৷ আর তারপর আমি তাকে বারংবার সংস্কার করি, যাতে করে তা আমার কল্পনা ও অনুভূতির আরো কাছাকাছি পৌঁছতে পারে৷ এমন কবিতা আছে যা আমি এক বসায় লিখে ফেলেছি, পরে টুকটাক এডিটিং করেছি— খুবই সামান্য; যেমন: তীব্র কুড়িগ্রাম, হাসতে হাসতে মরে যাবো, স্বাধীনতা লাগবে, এরকম আরো আছে৷ অপরদিকে অনেক কবিতা আছে যা আমি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস সময় নিয়ে লিখেছি৷ যেমন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘জীবনপুরাণ’-এর কথা, যা এক বছর সময় লেগেছিল লিখতে৷ আবার ধরুন, ‘গভীর স্বপ্নের ভেতর’, ‘বেধিদ্রুম’ বা ‘উড়ন্ত কফিন’ এই কবিতাগুলো লিখতেও এক বছরের কাছাকাছি সময় লেগে গিয়েছিলো৷ ফলে আইডিয়া তাৎক্ষণিক হলেও লিখতে আমার অনেক সময় লাগে৷ সে ধীরে ধীরে তৈরি হয়৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার কবিতার ভাষা ও শৈলী কীভাবে বেছে নেন?
সাম্য রাইয়ান: সেটা নির্ভর করে আমি কী নিয়ে লিখছি তার উপর৷ আমি যা চিন্তা করি, যেভাবে অনুভব করি তা প্রকাশের জন্য যেকোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে আমি প্রস্তুত৷ তথাপি আমি চেষ্টা করি এক আনকোরা ভঙ্গিমার, যা সহজ কিন্তু গভীর৷

কবিতার ফর্ম, তার শরীরে ছন্দ, অলংকার—এই সকলই চলে আসে কবিতার প্রয়োজনে। ফর্মটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি এমন কোনো ফর্মে লিখতে চাই না যা চর্বিতচর্বন। নতুন চিন্তা, যা আমি প্রকাশ করি, প্রচার করি; তা নতুন ফর্মেই প্রকাশ করতে পছন্দ করি।

তাছাড়া প্রতিটি পাণ্ডুলিপিতে আমি একই ফর্মে প্রকাশিত হতে পছন্দ করি না৷ ভিন্ন ভিন্ন বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হওয়া আমাকে নতুন ধরনের আনন্দ দেয়৷ ফলে ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ কিংবা ‘লিখিত রাত্রি’ কিংবা ‘হালকা রোদের দুপুর’ কিংবা ‘জলের অপেরা’ কোনটিরই ভাষা ও শৈলী এক নয়৷ কোনো এক ফর্মে ফিক্সড না হয়ে আমি বরং খুঁজে চলেছি এক অন্যতর ভাষা ও শৈলীকে…৷ বলতে পারেন, এ এক আনকোরা প্রেমের দিকে অন্তহীন যাত্রা৷

বাংলা ট্রিবিউন: কোন কোন কবির প্রভাব আপনার লেখায় আছে?
সাম্য রাইয়ান: নির্দিষ্ট করে ওভাবে বলতে পারবো না৷ তবে সাধারণভাবে, যে সকল কবির কবিতা আমি পড়েছি, ভালো বা মন্দ লেগেছে তার সবই কোনো না কোনভাবে আমাকে প্রভাবিত করেছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: কথাসাহিত্যের চর্চা আপনার কবিতায় কতটুকু প্রভাব রাখে?
সাম্য রাইয়ান: আমার একমাত্র প্রকাশিত উপন্যাস— ‘সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’৷ আরো কয়েকটি ফিকশন লিখবার ইচ্ছে আমার অনেকদিনের; যেমন— ‘2.0 : সকল প্রশংসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের’, ‘মিথ্যার মিউজিয়াম’, ‘মৌন’, ‘ঢাকার ওভারব্রীজে একটি গরু’, ‘এফ মাইনর’, ‘কেয়ারলেস ওম্যান’ আরো বেশ কয়েকটি৷ কবিতা আর কথাসাহিত্যের ভাষা-শৈলীতে অনেক মিল থাকলেও দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ক্ষেত্র ভাবতেই আমি স্বচ্ছন্দ বোধ করি৷ কখনো কোথাও গিয়ে সব মিলিত হয়ে যাচ্ছে বটে, তবুও অমিলের জায়গাটি খুবই দৃশ্যমান৷ আমি যখন প্রথমবার ফিকশন লিখতে শুরু করলাম, তখন আমি এক নতুন জগৎ আবিষ্কার করেছিলাম৷ সেই উপলব্ধি সম্পূর্ণ অন্যরকম৷ আমার মনে হলো— উপন্যাস আমাকে অনেক বেশি স্বাধীনতা দিচ্ছে, অনেক বেশি উন্মুক্ত করে দিচ্ছে৷ সম্পূর্ণ আবরণমুক্তভাবে পাঠকের সামনে দাঁড় করাচ্ছে৷ ব্যাপারটা আতঙ্কেরও! এতে আমি ভীত সন্ত্রস্ত হলাম৷ কিন্তু তার প্রেমে পড়ে গেলাম৷ মনে হলো আরো লেখা উচিৎ৷

বাংলা ট্রিবিউন: আপনার প্রথম কবিতার বই সম্পর্কে কিছু বলুন। এটি লিখতে গিয়ে কেমন অনুভূতি হয়েছিল?
সাম্য রাইয়ান: প্রথম বইটা (চোখের ভেতরে হামিং বার্ড, ২০২০) প্রকাশের আগে আমি প্রায় এক যুগ সিরিয়াসলি লেখালিখি করেছি৷ আমি যেহেতু কনসেপচুয়ালি পাণ্ডুলিপি গোছাই, ফলে একই সাথে আমার কয়েকটি কবিতার পাণ্ডুলিপি তৈরি হচ্ছিলো সেসময়, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ (২০২০), ‘লিখিত রাত্রি’ (২০২২), ‘জলের অপেরা’ (২০২৪)৷ প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশের আগে প্রস্তুতিপর্ব হিসেবে এক/দুই ফর্মার চারটা পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলাম, তিনটা কবিতা ও একটা গদ্যের৷ তবে প্রথম কবিতাপুস্তিকা প্রকাশের ঘটনাটা একটু বিব্রতকর৷ এক ছোট প্রকাশকের বারংবার অনুরোধে ২০১৪-তে প্রথম পুস্তিকা প্রকাশের পরিকল্পনা করি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি জমা দেবার পর জানুয়ারির শুরুর দিকে তিনি আমাকে জানালেন— এটি প্রকাশ করা সম্ভব না, কারন লিটলম্যাগ অঙ্গনের অনেকে আমাকে পছন্দ করছে না, তীব্র বিরোধীতা করছে৷ এরপর, যেহেতু পাণ্ডুলিপিটা গোছানো ছিলো আর ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিলাম ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশের, ফলে পিছিয়ে আসতেও ইচ্ছে করছিলো না৷ আর কোনো প্রকাশকের কাছে গিয়ে আলাপ করারও আমার কখনো আগ্রহ ছিলো না ফলে শেষমেশ নিজেই ছেপে ফেললাম৷ এভাবে চারটা পুস্তিকা আমি নিজেই ছেপেছি৷ তারপর তো বাংলাবাজারের ঘাষফুল প্রকাশনী ২০২০ থেকে ছাপাছাপির দায়িত্ব নিয়ে আমাকে নির্ভার করলো৷ সেই থেকে এখন অব্দি আমার সব বইপুস্তক ওরাই ছাপছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা কি আপনার কবিতায় প্রভাব ফেলে? যদি ফেলে, তবে কীভাবে তা প্রকাশিত হয়?
সাম্য রাইয়ান: সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক ঘটনা—তা আমার মননে যে আলোড়ন তৈরি করে তার অন্তিম নির্যাস কবিতায় প্রকাশ করতে চেষ্টা করি৷ খোলা চোখে যা দেখি তা নিয়ে কম লিখলেও, বন্ধ চোখে যা দেখি মূলত তা নিয়েই আমার কবিতার সংসার৷ ক্ষণস্থায়ী কোনো বিষয়ে কবিতা বোধহয় আমি লিখিনি৷ সেই অনুভবের কথাই লিখতে চেষ্টা করেছি, যার মূল সুর আসলে কোন এক বিন্দুতে গিয়ে মিলিত হয়েছে কালের পরিক্রমায়—পরিবর্তিত নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতায়ও৷

বাংলা ট্রিবিউন: পাঠকদের মন্তব্য আপনার লেখায় কোনো পরিবর্তন আনে?
সাম্য রাইয়ান: পাঠকদের মন্তব্য আমি খুব মনযোগ দিয়ে শুনি৷ তাদের সমালোচনা থেকে আমি নিজের ত্রুটি চিহ্নিত করতে চাই৷ কিন্তু সেইরকম মন্তব্য পাই না বললেই চলে৷ ফলে পরিবর্তনেরও সুযোগ নাই৷ এদেশে লেখালিখি নিয়ে যে আলোচনা-সমালোচনা হওয়া দরকার, তার গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি৷ বাক-স্বাধীনতা নাই তো৷ ফলে সমালোচনা সাহিত্য গড়ে ওঠেনি৷ রবীন্দ্র আমলে বা তিরিশের কথাও যদি বলি, যেরকম সমালোচনা করা হতো লেখা ও লেখকের, তা যদি এখন কেউ করে তাহলে নিশ্চিত গোলাগুলি লেগে যাবে৷ এদেশের তথাকথিত লেখকদের যে অবস্থা এখন, তা দেখে সামান্য সমালোচনার সাহসও কোন পাঠক রাখেন না৷ ফলে পাঠকের মন্তব্য শোনার সুযোগ দিন দিন কমে আসছে৷

বাংলা ট্রিবিউন: ভবিষ্যতে কী ধরনের কবিতা লিখতে চান? নতুন কোনো ধারা বা শৈলীতে কাজ করার ইচ্ছা আছে কি?
সাম্য রাইয়ান: কবিতায় আমার একটা অন্যরূপ-রূপান্তর প্রয়োজন৷ সেই সময়টা দিচ্ছি নিজেকে৷ ফলে আগামী চার-পাঁচ বছর কবিতার বই প্রকাশের পরিকল্পনা নেই৷ বিশেষ প্রয়োজনে পুস্তিকা হতে পারে, আবার! সাম্প্রতিক সময়ে কথাসাহিত্য আমার ভাবনার বিষয়৷ তাছাড়া গত পনের বছরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রসঙ্গে আমার প্রবন্ধ-নিবন্ধ-চিৎকারের এক সংকলন প্রস্তুত করছি—‘নীরবতা ভেঙে গর্ত থেকে বেরিয়ে আসুক সশস্ত্র পিঁপড়ে’৷

বাংলা ট্রিবিউনের লিংক৷


পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘এবং’, যার সম্পাদক দেশিক হাজরা; প্রকাশ করেছিল সাম্য রাইয়ান একক সংখ্যা৷ ২৩ জুলাই ২০২৩ তারিখ প্রকাশিত সংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত৷

এবং পত্রিকা: বিন্দু পত্রিকার সম্পাদনা করছেন ২০০৬ সাল থেকে এবং এই পত্রিকা, আজকের দিনে ভারত ও বাংলাদেশের মিলিত উচ্ছ্বাস। আমাদের সকলেরই জানা। সম্পাদক হিসাবে নির্বাচনের জন্য সর্বপ্রথম আপনি কিভাবে একটি লেখাকে দেখেন—

সাম্য রাইয়ান: প্রধানত আমি দেখি লেখাটি নতুন কিছু দিতে পারছে কী না৷ সেটা হোক চিন্তায়, আঙ্গিকে বা অন্য কোনোদিকে৷ আমি আসলে নতুন লেখা, নতুন চিন্তা প্রকাশ করতে চাই; কবিতা, গদ্য, যা-ই হোক৷ যে লেখা সাধারনত, সচরাচর প্রচলিত পত্রিকাগুলো প্রকাশ করতে পারে না, চায় না; আমি সেধরনের লেখা প্রকাশে অধিক মনযোগী৷ আমি মনে করি, শুধু লেখা প্রকাশ করেই একটি লিটল ম্যাগাজিনের দায় শেষ হয়ে যায় না৷ সার্বিকভাবে একজন লেখককে পাঠকের সামনে উপস্থাপনের দায়ও লিটল ম্যাগাজিনের উপর বর্তায়৷ আনন্দের সাথে এই দায় বিন্দু বহন করে চলেছে এত বছর ধরে৷ ফলে তুমি খেয়াল করবে, এমন সব লেখক, যারা জনপ্রিয় না, গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু পাঠক তাদের সম্পর্কে খুব একটা জানেন না, বিন্দু তাদের নিয়ে আলোচনা, সাক্ষাৎকার এবং বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে৷

এবং পত্রিকা: আপনার বেশিরভাগ কাব্যগ্রন্থের নামকরণ দেখতে পাচ্ছি নিসর্গবর্ণনামূলক— যেমন ‘হলুদ পাহাড়’, ‘চোখের ভেতর হামিং বার্ড’, কিংবা সদ্য প্রকাশিত ‘হালকা রোদের দুপুর’ এই নামকরণ গুলির প্রসঙ্গে যদি দু চার কথা বলেন…

সাম্য রাইয়ান: তুমি বলার আগে আমি নিজেও এভাবে মিলিয়ে দেখিনি৷ আসলে এই কবিতাগুলো, যেগুলো নিসর্গপ্রবণ, সেগুলো আমার ব্যক্তিজীবনের চড়াই-উৎরাইয়ের সাথেই বোধয় সম্পর্কিত৷ কবিকে আমার কেবলই মনে হয়— জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক— প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের…, সকল সম্পর্ক! এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন— রক্ষা— চ্ছেদ— বিকাশ বিষয়েই মনে হয় কবিজীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ কবিতাসকল৷ ২০১২ পরবর্তী সময়ে মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ আমার ব্যক্তিজীবনকে নির্মমভাবে আক্রান্ত করে তুলেছিলো৷ ‘পৃথিবী সিরিজ’ কবিতায় লিখেছিলাম,
“মৃদু শব্দেরা খুব দূরন্ত হয়েছে
আজকাল, ঘরবাড়ি তছনছ করে।
আমার পৃথিবী হ’লো উল্টোপালক
ভেঙে তছনছ—শ্রী একাকার!”
এত আঘাতে জর্জরিত হয়েই বোধকরি মানুষ থেকে দূরবর্তী হয়ে আমি প্রকৃতির নিকটবর্তী হয়েছি৷ অর্থাৎ মানুষকে বন্ধু বানানোর পরিবর্তে নিসর্গের বন্ধু হতে চেষ্টা করেছি৷ ‘ফুলকুমার’ কবিতায় লিখেছিলাম,
“মানুষের প্রতি নিষ্ফল প্রণয়যান
এড়িয়ে চলেছি আমি৷ দেখেছি
সেসব জীবনের ব্যর্থ অভিযান৷”
আরেকটি কবিতার কথা মনে পড়ছে, ‘লিখিত রাত্রি ২০’,
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই
শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক
জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো
পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল
আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”

এবং পত্রিকা: পাঁচের দশকের কবি, কবিতার অনিবার্য নাম উৎপলকুমার বসু এবং এই কাজের আগেও গদ্য রূপে উঠে আসে আরেকটি নাম আপনার কাছ থেকে সুবিমল মিশ্র (২০১৪)। তারপর সদ্য প্রকাশিত জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (প্রবন্ধ সংকলন) এই নামগুলো বেছে নেওয়ার নির্দিষ্ট কারণ আছে কোন?

সাম্য রাইয়ান: উৎপলকু্মার বসু, সুবিমল মিশ্র কিংবা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, এঁদের সাহিত্যের প্রতি ব্যক্তিগত ভালো লাগা তো আছেই৷ সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে যে পুস্তিকাটি লিখেছিলাম, সেটি ছিলো তাঁর সাহিত্য পড়তে পড়তে লিখিত নোটের সংকলন৷ এরপর উৎপলকুমার বসুকে নিয়ে সাত বছর ব্যাপী যে কাজটা করেছিলাম, সেটার কারন উৎপল পরবর্তী সময়ের কবিদের কবিতায় তাঁর প্রভাবের তীব্রতা; যা দেখে আমি প্রকৃতপ্রস্তাবে এর কারন অনুসন্ধান করতে চেয়েছিলাম৷ আবার যখন দেখলাম শারীরিক প্রয়াণের পর উৎপলকুমার বসুর কবিতা আরো তীব্রতর হয়ে উঠছে বাঙলা মুলুকে, তখন আরো বেশি আগ্রহী হলাম এর কারন জানতে৷ বাঙলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অর্ধ শতাধিক লেখকের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্লেষণ একত্রিত করে এই সংকলন প্রকাশ করেছিলাম৷ আর ওয়ালীউল্লাহ’র কথা নতুন করে কী বলবো! তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম স্মার্ট কথাসাহিত্যিক৷ আমি ভেবেছিলাম তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে বাঙলাদেশে অনেকেই অনেক উদ্যোগ নিবেন৷ কিন্তু আমি হতভম্ব হয়ে লক্ষ্য করলাম কেউই তাঁর শতবার্ষিকী প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন না৷ এত বড় অসম্মান মেনে নিতে পারলাম না৷ তাই বিন্দুর পক্ষ থেকেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম ‘জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’ প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশের৷

এবং পত্রিকা: আমার শেষ প্রশ্ন, এই দশকের আপনার প্রিয় কবি—

সাম্য রাইয়ান: গত দুই দশকে এত এত ভালো কবিতা লেখা হয়েছে, হচ্ছে, যা অভাবনীয়৷ আগের দশকগুলোতে আমরা যেমনটা দেখেছি কয়েকজনমাত্র কবি উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন, ভালো কবিতা লিখছেন, কিন্তু দুই হাজার পরবর্তী সময়ে আমরা তেমনটা দেখছি না৷ এসময়ে একসাথে অনেকেই ভালো লিখছেন, উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন৷ যেন একটা বিকেন্দ্রীকরণের মতো ঘটনা ঘটছে৷ এইটা নতুন ঘটনা বাঙলা সাহিত্যে৷ ফলে অগ্রজরা অনেক ক্ষেত্রেই কনফিউজড হয়ে যাচ্ছেন এই সময়ের কবিতা আলোচনায়৷ ফলে এই দশকে আমার প্রিয় কবি, প্রিয় কবিতার সংখ্যা অনেক৷ 





আমেরিকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্যপত্রিকা ‘মনমানচিত্র’ সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যার জন্য সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে৷ যা ২৪ মে ২০২৩ তারিখ প্রকাশিত হয়৷

মনমানচিত্র: লিখিত রাত্রি।।  কবিতাগুলোর বুনন খুব সংহত, কিন্তু কবি’র অন্তর্লোক বড় ছত্রখান। কবি হিসাবে কী বলবেন?

সাম্য রাইয়ান: ‘লিখিত রাত্রি’ অনেক মগ্নতার বই, অশেষ ভালোবাসারও। যা রচিত হয়েছিলো ২০১৫-র জুন ও জুলাই মাসে৷ এখন ভাবতে অবাক লাগে কী আশ্চর্য মগ্নতায় আমি রচনা করেছিলাম মাত্র এক/দেড় মাসে এই পঞ্চান্নটি কবিতা! অথচ ওই সময় আমি মানসিকভাবে খুবই ডিসটার্বড ছিলাম৷ চারদিক থেকে এত এত আঘাত— বারবার ভেঙে আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছিলাম৷ রচনার ছয় বছর বাদে ঘাসফুলের কল্যাণে পাণ্ডুলিপিখানা আলোর মুখ দেখেছিলো৷ এর মধ্যে কত সম্পাদনা, কত মাতামাতি এই সিরিজ নিয়ে!
পঞ্চান্ন পর্বের এই সিরিজজুড়ে আছে রাত্রির গল্প— অনেক রাত— রাতের পর রাত যা লিখিত হয়েছে— এক রাত্রিতে এসে তা মিলিত হয়েছে৷ সেখানে বিস্তৃত হয়েছে রাত্রির নিজস্ব আসবাব— কুকুর, পতিতা, নাইটগার্ড, পাখি, কবি, প্রেম, বিবাহ, ট্রাক ড্রাইভার…!

মনমানচিত্র: লোকাল ট্রেনের জার্নাল।। একেবারে গৃহস্ত ঘরের প্রেমিক ছেলেটি বুঝি আকুতিগুলো বলে যাচ্ছে একের পর এক। আপনার কী মনে হয়?

সাম্য রাইয়ান: ‘কবিতার দুর্বোধ্যতা’ শীর্ষক প্রবন্ধে বুদ্ধদেব বসু লিখেছিলেন, “কবিতা সম্বন্ধে ‘বোঝা’ কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা বুঝিনে; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু ‘বোঝায়’ না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ। ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা ‘বোঝা’ যাবে না, ‘বোঝানো’ যাবে না।” আমি বুদ্ধদেবের এ বক্তব্যের সাথে সম্পূর্ণ একমত৷ কবিতা আমরা অনুভব করতে পারি৷ এমত ভাবনা থেকেই ২০১০ সালের দিকে শুরু করেছিলাম এক নতুন খেলা— কবিতা বনাম কবিতা কবিতা খেলা! এ হলো সিরিজ গদ্য৷ প্রথম গদ্যটি লিখেছিলাম, ‘সময়ের অসহায় দাস’, যা পরে বাতিল করেছি৷ এরপর লিখেছি, ‘হাঁটতে হাঁটতে পথ গ্যাছে ক্লান্ত হয়ে’৷ এরপর ক্রমান্বয়ে আরো প্রায় দশ-বারোটি গদ্য লিখেছি৷ এই গদ্যগুলোতে আমি বাঙলা ভাষার বিশেষত নতুন সময়ের নতুন কবিদের কবিতা পাঠপরবর্তী অনুভব ব্যক্ত করেছি৷ এগুলো মূল্যায়নধর্মী গদ্য নয়৷ কখনো কবিতা পড়তে পড়তে আমার মধ্যে যে ভাবের উদয় হয়েছে, তা বিবৃত করেছি৷ আবার কখনো কোন কবিতা পড়ে ব্যক্তিগত কোন স্মৃতি মনে পড়েছে, তা-ই উল্লেখ করেছি৷ হুবহু, অকপটে!

মনমানচিত্র: চোখের ভেতরে হামিংবার্ড।। বইটিতে কেমন একটা শ্লোকের মত ব্যাপার আছে, আর আছে কেমন একটা স্বস্তির ভাবে। এমনটা কীভাবে হলো—আগের বইয়ের ছেঁড়াছেঁড়া ভাবটি কোথায় গেল?

সাম্য রাইয়ান: কবিকে আমার কেবলই মনে হয়- জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি৷ সে নানান সম্পর্ক- প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের- সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা৷ সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই এক রূপ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷ এর উৎসর্গে লেখা আছে- ‘সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি/ চুইয়ে পড়ো সুতো হয়ে/ নিচেই বিদ্ধ আমি/ সেলাই হই, তোমার সুতোয়।’
‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ে আমি একই ফর্মের কবিতাগুলো রেখেছি৷ যেমনটা আমি প্রতিটি পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে করি৷ 

মনমানচিত্র: বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা।।  কাব্যগ্রন্থের নামটি দেখে মনে হয়, এটি একজন মাওবাদী গেরিলা কবি'র কবিতা হয়ে উঠতে পারতো৷ কিন্তু তা হয়নি, যদিও পোড়খাওয়া রাজনৈতিক স্বপ্নের একটি আঁচড় আছে এখানে। বইটি সম্পর্কে কিছু বলুন।

সাম্য রাইয়ান: এ পুস্তিকাটি আমার লেখালিখির শুরুর দিকের কয়েকটি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত৷ তখন ছাত্র আন্দোলন করতাম৷ আর বাঙলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আমি শুরু থেকেই হতাশাবাদী ঘরানার৷ ফলে কবিতায় এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন বোধ করি৷ আর আমি এক সময়ে একরৈখিক কবিতাই লিখেছি তা নয়৷ একই সময়ে আমি বহুরৈখিক কবিতা লিখেছি৷ কিন্তু পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে আমি সময় নিয়েছি অনেক৷ এর প্রধান কারন হলো, আমি চেয়েছি কনসেপচুয়াল পাণ্ডুলিপি হোক প্রতিটি৷ ফলে একই সময়ে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ ও ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ বইয়ের কিছু কবিতা লিখলেও পাণ্ডুলিপি তৈরির ক্ষেত্রে কবিতাগুলোকে আমি আলাদা করে ফেলেছি৷

মনমানচিত্র: মার্কস যদি জানতেন।। এই বইয়ের কবিতাগুলো আরও বেশি তির্যক ও সরাসরি হবে বলে ধারণা করেছিলাম, কিন্তু বাস্তবত সরাসরি না হয়ে কবিতাগুলো যথেষ্ট পরিমাণেই রূপকাশ্রয়ী- আপনার বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞান কী এমন যে, কবিতায় প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি, বা শ্রেণীসংগ্রামের জঙ্গমতা আসলে এর শৈল্পিক ভারসাম্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে?

সাম্য রাইয়ান: আপনার প্রশ্নের শেষাংশে আমার উত্তর আছে৷ আমি এমনটাই মনে করি, কবিতা আড়াল দাবি করে৷ আর এ প্রসঙ্গে আরেকটু বলি, আমার ধারনা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একটা বড় ফ্যাক্ট৷ বাঙলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরাসরি কথা বলার কোন সুযোগ নেই৷ একসময় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ইস্যুতে কার্টুন অনেক জনপ্রিয় ছিলো৷ কিন্তু আজ সেসব কার্টুন বিলুপ্ত! এর কারন বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা৷ কিন্তু এই ফর্মটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মিমস’ রূপে প্রকাশিত হচ্ছে৷ দুঃখের কথা হাসির ছলে বলছে৷ মানুষের বেদনা ঘনীভূত হতে হতে এমন রূপ ধারণ করেছে যে, তা নিয়ে নিজেই মশকরা করছে৷ কারন তার প্রতিবাদ করার শক্তিও আর নেই৷
তবুও এসময়ের কবিতায় এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়৷ সময়ে সময়ে কবিতার ফর্ম বদলে যায়৷ প্রতিবাদের কথা, রাজনৈতিক চিত্র— সেসব থাকে নতুন সময়ের ফর্মে৷ ষাট, সত্তর কিংবা নব্বই দশকে যে ফর্মে রাজনৈতিক কবিতা রচিত হয়েছে, আজ নতুন শতকে এসে সেই ফর্মে কবিতা লেখা হবে না, এটাই স্বাভাবিক৷ তারই প্রতিফল হয়তো পাচ্ছেন ‘মার্কস যদি জানতেন’-এ৷

মনমানচিত্র: হলুদ পাহাড়।। বইটিতে আবছা কোথায় যেন খানিক পরাবস্তবতার পোঁচ আছে। হলুদ পাহাড় নিয়ে আপনার অনুভব কী?

সাম্য রাইয়ান: ‘হলুদ পাহাড়’ এর কবিতাগুলো আমি এক মাসে লিখে ফেলেছিলাম৷ যেন হঠাৎ করেই এই সবগুলো কবিতা আমার কলমের ডগায় উপচে পড়ছিলো৷ অন্তর্গত অনুভূতিমালা আর দৃশ্যের বিবরণ লিখেছি; আমি যা দেখি— যেভাবে আমার চোখে ধরা পড়ে, তা-ই… হয়তো আমার ‘দেখা’ ‘স্বাভাবিক’ নয়… পরাবাস্তব হতে পারে… 

মনমানচিত্র: আপনার প্রত্যেকটি বই ভাবে ও ভঙ্গিমায় আলাদা আলাদা। আপনি কী থিমেটিক্যালি বইগুলো করেছেন?

সাম্য রাইয়ান: একটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি হবার পর আমি সময় নিই; মাসের পর মাস কিছু লিখি না৷ পূর্বের ফর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করি৷ নতুন কিছু লিখতে চাই৷ নতুন চিন্তা— নতুন ফর্মে৷
আমার এমন হয়; দেখা যায়, মাসের পর মাস আমি কবিতা লিখিনি, লিখতে পারিনি; শুধুই ভেবেছি— চিন্তিত হয়েছি৷ কখনো বছর পেরিয়ে গেছে— কবিতা আসেনি! আগে মনে করতাম আর বুঝি লিখতে পারবো না, আমার বোধয় লেখা শেষ৷ কিন্তু না৷ তার পরই হঠাৎ করে কবিতা লিখতে শুরু করি; মনে হয় সাইক্লোনের মতো সবকিছু ভেঙেচুড়ে আসছে৷ দুর্বার গতি— যাকে রোধ করা অসম্ভব৷ এমন অবস্থা থাকে এক থেকে দেড় মাস৷ সেই সময় প্রচুর কবিতা লিখে ফেলি৷ এভাবেই লেখা হয়েছে ‘হলুদ পাহাড়’, ‘লিখিত রাত্রি’, ‘হালকা রোদের দুপুর’… 

মনমানচিত্র: একদম সাম্প্রতিক কালে অনেকের কবিতায় কেমন ধাঁধার মত একটা ব্যাপার থাকে। মনে হয়, পাঠকের যেন একটি ধাঁধার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। ধরুন আপনার এই কবিতাটি—
এই হেমন্তে

উঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃৎপিণ্ডের
মতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতম
ক্যানভাস থেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিত
জলের ইতিহাস। ডুবন্ত চাঁদের যাত্রী কীভাবে,
সেইসব তীব্র বিরল ছবি অলক্ষ্যে রোদের বাগানে
ফুটাতে দিয়ে কোনোদিন, সূর্যবেলায় খুব নির্ভার হবো।
আপনার কী মনে হয়, এই কবিতাটি পাঠকের প্রাণের কাছে আরও অনায়াস হয়ে উঠতে পারতো?

সাম্য রাইয়ান: আমি আসলেই চাই অনায়াস করে তুলতে৷ এমন একটি প্রচেষ্টা আমার মধ্যে কাজ করে৷ হয়তো পারি না, পেরে উঠি না ঠিকমতো৷ কিন্তু সহজ করে বলতে চাই৷ স্বাভাবিকভাবেই লিখি, বাড়তি কসরত আমি করি না কবিতায়৷ কিন্তু তা যে রূপ ধারণ করে তা কতোটা ‘স্বাভাবিক’ মনে হয় পাঠকের কাছে সে সম্বন্ধে আমার ধারণা নেই৷

মনমানচিত্র সব কবিরই জানায় অজানায় একটি দর্শন থাকে—আপনার দর্শন কী?

উত্তর: আমার দর্শন, সে তো কবিতায়ই প্রকাশিত৷ সেই দরশনের কথাই লিখি কবিতায়৷ আমার কবিতাই আমার দর্শন৷

মনমানচিত্র: আপনি বাংলা কবিতার পরম্পরায় নিজেকে কীভাবে যুক্ত করেন? আবার বাংলা কবিতার পরম্পরা থেকে নিজেকে কোথায় বিযুক্ত করে প্রাতিস্বিক হয়ে ওঠেন?

সাম্য রাইয়ান: আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই; বিকল্প নেই৷ আমি তা-ই লিখতে চেষ্টা করি কবিতায়— যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না৷ বলার ভঙ্গিতে নতুন কিছু করবার প্রয়াস আমার মধ্যে থাকেই৷ এতে কতটুকু সফল আর কতটুকু ব্যর্থ তা পাঠকই বলতে পারবেন৷

দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক আবু জাফর সৈকত নিয়েছেন তাঁর সাক্ষাৎকার৷ যা ২৭ জুন ২০২০ তারিখ দৈনিক শিল্প-সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷

আবু জাফর সৈকত: করোনাকালীন এই সময়ে কেমন আছেন?
সাম্য রাইয়ান: ভালো নেই৷ নিজেকে এখন সার্কাসের ক্লাউন মনে হয়৷ ভালো থাকার ন্যূনতম আয়োজন এদেশে নেই৷ জীবন নিয়ে এখানে চলে রাষ্ট্রীয় সার্কাস, যা বন্ধ হওয়া দরকার৷

আবু জাফর সৈকত: লেখার শুরুটা কীভাবে?
সাম্য রাইয়ান: এলেবেলে লিখতে লিখতেই শুরু৷ কবে, কীভাবে তা আজ আর মনে নেই৷ তবে এক দিনের কথা মনে পড়ে, সম্ভবত ২০০৫ এর কোনো এক বিকেল, রাশেদুন্নবী সবুজ আমায় ডেকে বললেন, “তুই তো লিখতে পারিস, এক কাজ কর, ‘স্বাধীনতা তুমি’ নামে একটা কবিতা লিখে দে— একটা প্রতিযোগিতার জন্য৷” তো আমি সেদিন ওটি লিখেছিলাম, যদিও শেষপর্যন্ত প্রতিযোগীতায় পাঠানোর তারিখ বেমালুম ভুলে যাওয়ায় আর পাঠানো হয়নি৷ সম্ভবত ওইই প্রথম, কবিতা লিখবো মনস্থির করে লিখতে বসেছিলাম৷ এখানে একটি কথা বলে রাখি, ২০১২ পর্যন্ত আমার প্রায় সকল লেখাই আমি ফেলে দিয়েছি৷

আবু জাফর সৈকত: লিটল ম্যাগাজিন না ফেসবুক কোনটা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম, আপনার মতে?
সাম্য রাইয়ান: দুইটি ভিন্ন মাধ্যম৷ একটির সাথে অপরটির তুলনা চলে না৷ যেখানে ক্ষমতার (power) রক্তচক্ষু নেই, অন্যায্য সেন্সর নেই, সেটাই শ্রেষ্ঠ মাধ্যম৷

আবু জাফর সৈকত: এই সময়ের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতা পড়েন? সমসাময়িক কবিদের—
সাম্য রাইয়ান: এমনিতে বই তো পড়িই৷ তাছাড়া, ‘বিন্দু’ সম্পাদনার সুবাদে প্রচুর নতুন লেখা পড়া হয়৷ পত্র-পত্রিকায় দুই ধরনের ‘জিনিশ’ কবিতা নামে প্রকাশিত হয়, এক হলো: যা কবিতা, দুই হলো: যেগুলো তা নয়৷ আমি সবই পড়ি, যা নজরে পড়ে যায়৷ এই সময়ে প্রচুর ভালো কবিতা লেখা হচ্ছে৷ এখনকার অনেক কবির কবিতাই আমি পড়তে পছন্দ করি৷

আবু জাফর সৈকত: কবির সাথে অকবির তফাৎ কতোটুকু?
সাম্য রাইয়ান: প্রেমিকার সাথে গণিকার তফাৎ যতোটুকু৷

আবু জাফর সৈকত: পরজন্ম বলে যদি কিছু থাকে তখন কী হতে চাইবেন?
সাম্য রাইয়ান: ‘কোয়ালা’ হতে চাইবো৷ অস্ট্রেলিয়ার এই প্রাণীটি তার জীবনের ৯৯% সময় খেয়ে আর ঘুমিয়ে কাটায়। ১% সময় সে তার জীবনসঙ্গী খোঁজে। খোঁজার জন্য খুব একটা কিছু ব্যতিব্যস্ত যে সে হয়, তাও নয়। কোনো সঙ্গী না জুটলে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

আবু জাফর সৈকত: একজন কবি ও দার্শনিকের মধ্যে পার্থক্যটা কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: কবি মাত্রই দার্শনিক, কিন্তু দার্শনিক মাত্রই কবি না৷ 

আবু জাফর সৈকত: কবির স্বাধীনতা বলতে আপনি কী মনে করেন?
সাম্য রাইয়ান: কবির জন্য অতিরিক্ত কোনো স্বাধীনতার দাবি আমি করি না৷ মানুষের বেঁচে থাকবার প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক স্বাধীনতা থাকলেই হলো৷

আবু জাফর সৈকত: এপার বাংলার কবিতার ভাষা এবং ওপার বাংলার কবিতার ভাষার মধ্যে পার্থক্য কতটুকু এবং কেন?
সাম্য রাইয়ান: এখন তো কোনো পার্থক্য নজরে আসছে না৷ উভয়ই কলকাতার মান ভাষায় লিখছে৷ তবে পার্থক্য নজরে আসতো, যদি বাঙলাদেশের জেলায় জেলায় যে ভাষা বৈচিত্র্য, তা এদেশের কবিতায়— সাহিত্যে দৃশ্যমান হতো৷ 

আবু জাফর সৈকত: সাহিত্যের বিশ্বাস আর ধর্মের বিশ্বাসের মধ্যে পার্থক্য বা দ্বন্দ্ব কোথায়?
সাম্য রাইয়ান: ধর্ম নিয়ে যা বলার, আহমদ শরীফ, হুমায়ুন আজাদ… এঁরা বলে গেছেন৷ আমি আর নতুন করে কোনো মন্তব্য করতে চাই না৷

আবু জাফর সৈকত: কবিতায় ছন্দের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলুন।
সাম্য রাইয়ান: ছন্দ ছাড়া গাছে ফুল ফোটে না, বৃষ্টি ঝরে না৷ এমনকি শিশুর প্রথম কান্নাও ছন্দ ছাড়া নয়৷ জীবন ও জীবনহীনতার প্রতিটি সত্যবিন্দুতে রয়েছে ছন্দ৷ আর এই-সব-কিছু নিয়েই তো কবিতা…

আবু জাফর সৈকত: পুরস্কার একজন লেখকের জন্য প্রয়োজনীয়?
সাম্য রাইয়ান: পুরস্কারের ক্রেস্ট, মেডেল লেখকের কোনও প্রয়োজনই নেই৷ কিন্তু টাকাটা খুবই প্রয়োজন৷

আবু জাফর সৈকত: ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ আপনার এ বছর প্রকাশিত কবিতার বই৷ এটিকে আপনি প্রথম বই বলছেন, তাহলে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ বা ‘মার্কস যদি জানতেন’ এগুলোকে কি আপনি অস্বীকার করছেন?
সাম্য রাইয়ান: নাহ্, অস্বীকার করবো কেন? হামিংবার্ডের ফ্ল্যাপে সবগুলোর নাম উল্লেখ করেছি তো৷ ফেব্রুয়ারি মাসে কিছু সংবাদপত্র যখন বইটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছিলো তখন আমি এ বিষয়ে বলেছিলাম৷ আবারও বলছি, বাকিগুলো ছিলো পুস্তিকা, এক থেকে দুই ফর্মার চটি৷ যেমন আমার প্রথম প্রকাশিত পুস্তিকা ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট’ এক ফর্মার গদ্য সুবিমল মিশ্রকে নিয়ে, তারপর তিনটি কবিতার পুস্তিকা যথাক্রমে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’, ‘মার্কস যদি জানতেন’, ‘হলুদ পাহাড়’৷ এরপর চার ফর্মার বোর্ড বাঁধাই করে একদম বইয়ের রূপ দিয়ে প্রকাশিত হলো ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’৷

আবু জাফর সৈকত: বইটি প্রকাশের পর পাঠকদের সাড়া কেমন পেলেন? প্রকাশক নিয়ে কোনো ঝামেলায় পড়তে হয়েছিলো কি?
সাম্য রাইয়ান: আমি লিটলম্যাগের বাইরে আজ পর্যন্ত কোথাও লিখিনি৷ ফলে জনপ্রিয় হবার তরিকার বাইরে আমার অবস্থান৷ আর আমি বেসিক্যালি মূর্খ লোক৷ আমার মতো একজন লেখকের যে সামান্য কিছু কবিতা, গদ্য যে লোকে পয়সা খরচ করে কিনে পড়ে এটাই আমার অনেক বড় পাওয়া৷ আমি জানি, এঁরা সব সচেতন পাঠক৷ কেননা, সচেতন পাঠক ব্যতিত কেউ লিটলম্যাগ পড়ে না৷ আর লিটলম্যাগ যিনি পড়েন না, আমার সন্ধান পাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়৷
হামিংবার্ড ব্যতীত সবগুলো পুস্তিকাই আমি নিজে ছেপেছি এবং নিজেই বিক্রি করেছি, ফলে পাঠকের সাথে সরাসরি আমার যোগাযোগ হয়েছে, পরিস্থিতিটা নিজে দেখেছি৷ ‘মার্কস যদি জানতেন’ পুস্তিকাটি তো আমি সম্পূর্ণ পাঠকের পয়সায় ছেপেছিলাম, পাঠক অগ্রিম পয়সা দিয়েছিলো প্রকাশের জন্য৷ আসলে এর মধ্য দিয়ে নিজেকে বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু এবার ঘাসফুল প্রকাশনীর মাহাদী আনাম নিজে থেকে দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু করেছেন৷ বিক্রিতেও আমার তেমন হাত ছিলো না৷ ফলে সরাসরি ব্যাপারটা দেখার সুযোগ এবার হয়নি আমার৷ কিন্তু অনেকে ফেসবুকে, ওয়েবসাইটে বইটি নিয়ে কথা বলেছেন, আলোচনা লিখেছেন, সেগুলো পড়েছি৷ আমি এ ভেবেই পুলকিত যে লোকে পয়সা খরচ করে এ বই কিনেছেন, পড়েছেন এবং এ নিয়ে কথাও বলছেন৷ 

আবু জাফর সৈকত: আপনি ২০০৬ থেকে লিটলম্যাগ ‘বিন্দু’ সম্পাদনা করছেন৷ কিছুদিন আগে ওয়েবসাইটও হয়েছে বিন্দুর৷ এত বছর ধরে কেন প্রকাশ করছেন?
সাম্য রাইয়ান: আমি বিন্দুর সম্পাদক হলেও বিন্দু আমার একার কাগজ নয়, আমাদের কাগজ, এর সাথে অনেকেই যুক্ত৷ সকলে মিলে আমরা এটি প্রকাশ করি৷ প্রথমে বিন্দু যে উদ্দেশ্যে প্রকাশ করেছিলাম তা হলো, আমাদের লিখবার কোনো জায়গা ছিলো না৷ তাই একটা জায়গা দরকার ছিলো৷ এত বছর পরে এসেও মনে হয়, আজও কি আছে তেমন জায়গা, যেখানে আমরা হাত খুলে লিখতে পারি? বিন্দুর প্রয়োজনীয়তা আজও রয়েছে এজন্যই যে, আমরা আমাদের লেখাগুলো কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির চোখ রাঙানি উপেক্ষা করেই এখানে প্রকাশ করতে পারি৷ এখানে বলে রাখি, দিন দিন লেখক ও পাঠক উভয় দিক থেকেই পরিসর বাড়ছে, যা প্রমাণ করে বিন্দু প্রকাশ জরুরী৷ আর ওয়েবসাইট (bindumag.com) আরও আগেই দরকার ছিলো, নানা সীমাবদ্ধতায় তা করা হয়ে উঠেনি৷ ২০১৯ এর ২৬ মার্চ তা সম্ভব হলো৷ এতে আরও অধিক লেখা প্রকাশের এবং পাঠকের কাছে পৌঁছনোর সুযোগ হলো৷

আবু জাফর সৈকত: সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ৷
সাম্য রাইয়ান: ধন্যবাদ ‘শিল্প-সাহিত্য’ পত্রিকাকে৷ শুভকামনা…

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *