দিনলিপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
দিনলিপি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

❑ সাম্য রাইয়ান

আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক শূন্যতায় ঢুকে যাচ্ছি, যেখানে সত্য বলার সাহসী কণ্ঠগুলো নিভে যাচ্ছে? লুডভিগ ভিটগেনস্টাইন বলেছিলেন, “The limits of my language mean the limits of my world.” মাহফুজা খানম ও যতীন সরকার আমাদের ভাষার সীমা বিস্তৃত করেছিলেন, আমাদের জগতকে বড় করেছিলেন। এখন তাঁদের অনুপস্থিতি মানে শুধু দুটি মৃত্যু নয়—দুটি ভাষিক মহাবিশ্বের পতন।

গতকাল প্রফেসর মাহফুজা খানম মারা গেলেন। আজ যতীন সরকার। এই দুই দিনের শোকবার্তা আমাদের জাতীয় দিনলিপির ওপর একটার পর একটা কালো দাগ টেনে দিল। যারা জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা, শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য ও সমাজের জন্য নিজেদের উজাড় করে দিয়েছেন, তারা একে একে চলে যাচ্ছেন—আমরা দাঁড়িয়ে আছি এমন এক প্রান্তে, যেখানে বিদায়ের ধারাবাহিকতা ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

প্রফেসর মাহফুজা খানম শুধু একজন শিক্ষাবিদই নন, তিনি ছিলেন ভাষা ও নারী-শিক্ষা আন্দোলনের দৃঢ় কণ্ঠ। তাঁর ভাষা ছিল স্পষ্ট, তাঁর অবস্থান ছিল নির্ভীক। আমার মনে পড়ে, এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন—“মেয়েদের শিক্ষিত করা মানে শুধু তাদের জীবন বদলানো নয়, সমাজের নৈতিক মানচিত্রও নতুন করে আঁকা।” মৌলবাদপ্রবণ সময়ে এই বিশ্বাসের মানুষ হারানো মানে ভবিষ্যতের ওপর আস্থার একটি স্তম্ভ ভেঙে যাওয়া।

যতীন সরকার ছিলেন অন্য ধরনের বাতিঘর। তঞ্চক রাজনৈতিক ইতিহাসকে যেভাবে তিনি ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে মিশিয়ে পড়তে পারতেন, তা বিরল। তাঁর টেক্সট পাঠকের মননে দায় সৃষ্টি করতো—তুমি ইতিহাস ভুলে যেতে পারো না, কারণ ইতিহাস তোমাকেই পড়ছে। তিনি ছিলেন মাঠে-ঘাটে-গ্রামে ঘুরে বেড়ানো এক শিক্ষক, যিনি বইয়ের ভেতর আটকে থাকেননি। আজ মনে পড়ছে তপন স্যারের কথা, প্রফেসর তপন কুমার রুদ্র—যিনি তাঁর বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যতীন সরকারকে কুড়িগ্রামে অতিথি করে আমাদের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁর সান্নিধ্য প্রাপ্তির৷ আমার নিজের অভিজ্ঞতায় যতীন সরকারের টেক্সট পড়া মানে চোখের সামনে একদিকে ঐতিহাসিক বিস্তৃতি, অন্যদিকে বাঙলার মাটির গন্ধ একসঙ্গে পাওয়া। তার চিন্তার সাথে কিছুক্ষেত্রে দ্বিমত ছিলো, সেগুলো বিভিন্ন সময়ে বলেছি৷ আজ এই দুঃখভারাক্রান্ত দিনে সেসব আর উল্লেখ করতে চাই না৷

আমাদের জাতীয় বেদনার প্রকৃতি এমন যে, এটি সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি হয় না। সময়ের সাথে সাথে বোঝা যায়—যাদের হারিয়েছি, তাদের শূন্যতা পূরণ হয় না কখনোই। আজ হয়তো এই ক্ষতকে ভাষায় বাঁধা কঠিন, কিন্তু ভবিষ্যতে যখন আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম জানতে চাইবে—তখন হয়তো আমরা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলব, আর বলব—তোমরা তাদের দেখোনি, শুনোনি, তাই বোঝোনি কী হারিয়েছ।

দিনহীনের দিনলিপি : ২৯ শ্রাবণ ১৪৩২
১৩ আগস্ট ২০২৫

❑ সাম্য রাইয়ান

আজ, এই তারিখটা আমার কাছে ক্যালেন্ডারের নিছক একটা দিন নয়। এটা সেই দিন, যেদিন আমি জানলাম—কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও, দূর-দূরান্তে বাস করেও আমার লেখাজোখা পাঠ করে চিন্তার খোরাক পেয়েছে।
হয়তো ভালোবেসেছে।
হয়তো বিরক্ত হয়েছে।
কিন্তু অগ্রাহ্য করেনি।

দুবছর আগের এই দিনে, বিস্ফোরণের মতো প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যের আলোকপত্র ‘তারারা, সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যা’—যেখানে আমার লেখা, আমার ভাবনা, আমার শব্দচিন্তা নিয়ে হ্রস্ব ও দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলেন বিভিন্ন দেশের বাঙলাভাষী লেখকরা।
বাঙলাদেশ, ভারত, ইউরোপ, আমেরিকা—যেখানে বাঙলা বেঁচে আছে, সেখান থেকে কেউ কেউ আমাকে পাঠ করেছেন, প্রশ্ন করেছেন, সমালোচনা করেছেন, কখনো মমতায় স্পর্শ করেছেন।

সেদিন আমি তীব্রভাবে অনুভব করেছিলাম, লেখালেখি একাকিত্বের প্রকল্প হলেও, তার প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে যেতে পারে কত দূর-দূরান্তে!

আমার কণ্ঠস্বর হয়তো ক্ষীণ, কিন্তু কিছু মানুষ সেই কণ্ঠস্বর শোনার মতো ধৈর্য ও ভালোবাসা ধরে রেখেছেন।
এই অনুভব আমার লেখার জগতে নতুন এক মাত্রা এনে দিয়েছিল৷ ফলত পত্রিকাটি আমার কাছে একটি সংখ্যামাত্র নয়— একধরনের আত্মপরীক্ষা, এক ধরনের আত্ম-দায়বদ্ধতা।
সেই সংখ্যায় লেখা প্রতিটি পংক্তি আমাকে নিজস্ব প্রতিবিম্বের দিকে তাকাতে বাধ্য করেছিল।

কেউ কাব্যিক কাঠামোর প্রশংসা করেছিলেন, কেউ অন্তরালের ক্ষত খুঁজে বের করেছিলেন।

তাদের সকলের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তারা প্রত্যেকেই আমার লেখার গভীরে নেমে যে চিন্তার আলোটি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা আমি আজও বহন করছি।

তাই, ৬ই আগস্ট আমার কাছে শুধু তারিখ নয়, একটা আয়না। যেখানে আমি মুখোমুখি হই, নিজস্ব সাহিত্যের।

৬ আগস্ট ২০২৫

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *