❑ সাম্য রাইয়ান
শামসুর রাহমানকে আমি জাতীয় চেতনার প্রধানতম কাব্যিক রূপকার মনে করি। তার কবিতায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ একদিকে যেমন রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের হাতিয়ার, তেমনি ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের গভীর অন্বেষণ। তার কবিতায় মাতৃভাষা, ভূখণ্ড, ইতিহাস ও মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা একত্রিত হওয়ার ফলে তা কোনো সংকীর্ণ পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ না থেকে মুক্তির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এক মানবিক স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল।
কবিতায় তিনি শহরের কোলাহল আর নির্জনতা, রাজনৈতিক মিছিল আর ব্যক্তিগত প্রেম, স্বপ্ন আর হতাশাকে একইসাথে শব্দে রূপান্তরিত করেছেন। ফলে তার কবিতা শুধু শব্দের কারুকাজ নয়, বরং হয়ে উঠেছে জাতির ইতিহাসের অন্তরালে লুকানো দুঃখ, স্বপ্ন আর সংগ্রামের সাক্ষ্য।
তাঁর সমকালীন ও বন্ধু হুমায়ুন আজাদ তাঁকে নিয়ে যে বই লিখেছিলেন, “নিঃসঙ্গ শেরপা”—সেই নামটির মধ্যেই লুকানো আছে শামসুর রাহমানের কবিত্ব ও জীবনের অমোঘ প্রতীক। কঠিন পর্বতারোহণে মানুষকে পথ দেখানো শেরপার মতো কাজই তো করেছিলেন কবি।
বাঙলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শামসুর রাহমানের কবিতা একপ্রকার দলিল। স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে গণতন্ত্রের দাবি পর্যন্ত—সবখানেই তাঁর কণ্ঠ ছিল নির্ভীক। অথচ তিনি কেবল রাজনৈতিক কবি হয়ে থাকেননি, তাঁর প্রেমের কবিতাগুলোতেও রয়েছে অনন্য স্নিগ্ধতা। শহরের ছাদে বসে যে প্রেমিক-প্রেমিকা দৃষ্টিবিনিময় করছে, সেই দৃষ্টি ও রাজপথে লড়াইরত মানুষের দৃষ্টি—দুটোই যেনো এক হয়ে যায় তাঁর কবিতায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তার কবিতা ছিল আন্দোলনের স্লোগান, সামরিক স্বৈরতন্ত্রের সময়ে ছিল প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর, আবার প্রেম আর নগরের সাধারণ মানুষের জীবনকথাতেও তিনি একই তীব্রতা ধরে রেখেছিলেন। এই দ্বৈততা, এই দ্বন্দ্বই তাঁর কবিতাকে পূর্ণতা দিয়েছে।
শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে মনে হয়, আমরা একইসাথে হারিয়েছি একজন সাহসী কবি ও এক ধরণের বৌদ্ধিক আকাশ! যিনি আমাদের হাতে এমনই দুঃসাহসী কাব্যিক ভাষা দিয়ে গেছেন যা আজও স্বৈরাচার-ফ্যাসিস্টের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক৷ নব্বইয়ে অনেক কবি-সাহিত্যিক যখন এরশাদের থেকে ফ্ল্যাট সহ নানা উপঢৌকন বাগাতে ব্যস্ত ছিলেন, শামসুর রাহমান ছিলেন রাজপথে৷ কবি শহিদ কাদরীর একটা কথা মনে পড়ছে—“আমরা আবার শামসুর রাহমান ছাড়া আর কাউকে রিকগনাইজ করতাম না। বলতাম, শামসুর রাহমান ছাড়া আর কারো কিছু হয়ই না। ফলে অন্যরা সবাই আমাদের হেট করত। সবাই হেট করত।”
বর্তমান বাঙলাদেশে শামসুর রাহমানের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয় সত্য উচ্চারণের সাহস ও মানবিকতার কণ্ঠস্বর হিসেবে। যখন গণতন্ত্র ক্রমাগত আঘাতপ্রাপ্ত, মুক্তচিন্তা সংকুচিত, আর ফ্যাসিস্ট প্রবণতা নতুন রূপে মাথা তোলে—তখন তাঁর কবিতার কথা মনে পড়ে। তিনি দেখিয়েছিলেন, জাতীয়তাবাদ মানে কেবল রাষ্ট্রভক্তি নয়, ভূখণ্ডের প্রতি অন্ধ আনুগত্য নয়, ফ্যাসিজম নয় বরং মানুষের স্বাধীনতা, ভালোবাসা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের লড়াই; মুক্ত চিন্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার প্রতি দায়বদ্ধতা। আজকের বাঙলাদেশে শামসুর রাহমান চলমান প্রতিরোধ ও মুক্তির সংগ্রামে একটি অনিবার্য আলোকবর্তিকা।