❑ সুবীর সরকার
কত রকমের কবিতা। কত রকমের ফ্রেম। এই যে জনমভর কবিতা করিডোর ধরে হাঁটলাম, বিচিত্র সব কবিতার আলো অন্ধকার কুহক আমাকে বিস্মিত করলো, জাপটে ধরলো, তীব্র এক পূর্ণতা দিল সে আমার তুমুল কিংবা তুলকালাম অর্জন।
কবিতার পাঠক হিসেবে সারাজীবন অদ্ভুত এক বিস্ময় আমাকে তাড়া করেছে। আমি কবিতা থেকে কবিতায় ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে বারবার দুপুর রৌদ্রে এসে দাঁড়াই।
সম্প্রতি পাঠ করলাম কবি সাম্য রাইয়ান এর কবিতার বই ‘লিখিত রাত্রি’।
৬৪ পৃষ্ঠার এই বইটিতে রয়েছে শিরোনামহীন ৫৫ টি কবিতা। কবিতাগুলির রচনাকাল জুন–জুলাই,২০১৫৷ বইটি প্রকাশিত হয়েছে অমর একুশে বইমেলা ২০২২-এ ঘাসফুল প্রকাশনী থেকে।
২.
সাম্য রাইয়ান কুড়িগ্রামে থাকেন। ১৬ নদীর দেশ কুড়িগ্রাম। সম্পাদনা করেন বাংলা ভাষার অন্যতম লিটলম্যাগ ‘বিন্দু’। নিজের লেখা-পড়া-কাজ-স্বপ্ন নিয়ে সার্বক্ষণিক একজন সাহিত্যকর্মী।
সাম্যর কবিতায় অদ্ভুত এক স্তব্ধতা। খুব নিবিড় এক আড়াল তার মনোজগতের অন্দরে খেলে বেড়ায়।
শব্দ প্রয়োগে খুব সচেতন সাম্য লেখেন:
১. ভূগোল ক্লাসের স্মৃতি ভুলে গেছি তমোগুনে!
২. নির্জনে ডাহুক ডাকে নাই বুঝি সারাংশসমেত।
৩. ছাপোষা মধ্যরাতে পুরোনো প্রেমিকাকে মনে পড়া
দোষের কিছু নয়।
পাঠক লক্ষ করুন ‘তমোগুনে’, ‘ভূগোল ক্লাসের স্মৃতি’, ‘সারাংশসমেত’, ‘ছাপোষা মধ্যরাতে’ —এই শব্দবন্ধের প্রয়োগ!
সমস্ত যুক্তিফাটল পরিহার করে কবি এক যুক্তি ফাটলের ম্যাজিক তৈরি করতে চেয়েছেন। সাম্য রাইয়ান অত্যন্ত শব্দ ও সময় সচেতন কবি। তার প্রতিদিনের দেখা তাকে তাড়িত করে নিজস্ব এক ভুবনবিশ্ব গড়ে তুলতে।
সাম্য রাইয়ান লিখছেন,
“সাপের ঝাঁপির মতো যে ঘরটিতে আমি থাকি
তার পশ্চিমে একটা আকাশমুখী জানালা আছে।
ঘরের একমাত্র যাত্রী হিসেবে আমি প্রতিদিন
সেই জানালা দিয়ে জিরাফের মতো গলা বের করি।
আমাকে বাঁচতে হয় এতো এতো সুন্দরের মাঝে!”
একটা ঝাঁকুনি ছড়িয়ে পড়তে থাকে, পাঠকের পাঠপদ্ধতি ঘন হয়ে জুড়ে বসতে থাকে। সাম্য রাইয়ান তার মেধার বাতিঘরে এভাবেই স্বাগত জানান।
সাম্য উচ্চারণ করেন:
“ছত্রভঙ্গ হবার আগে জেনেছি, রঙ করা পাখিদের
ঠোঁট থেকে ভেসে এলে সুরেলা সঙ্গীত, সুসজ্জিত
পুস্তক, মানুষের মনে কোন প্রভাব পড়ে না।”
কবি নিজে দেখেন, দেখার ভেতরে ঢুকে পড়েন আর সেই সূত্র অনুসরণ করে আমরাও দেখে ফেলি অগণন দৃশ্যের কোরাস। যেমন:
১. লিখিত বাগানের দিকে যেতে থাকি পুরনো কৌতূহলে।
২. শুনেছি, বনমোরগের কোন শুভাকাঙ্ক্ষী নাই!
৩. আমরা কেউ কারো নই, একাকী একাকার
৩.
সাম্য রাইয়ান ভিন্ন প্রজাতির কবি। অত্যন্ত সচেতন তার নির্মাণ কৌশল। নিজের যাপন আর চারপাশের খুঁটিনাটি অত্যন্ত নিমগ্ন এক ব্যাপ্তিতে পৌঁছে দিতে জানেন সাম্য।
ভারি অন্তর্গত মৃদু শিসের একান্ত হয়ে ওঠা ম্যাজিক সাম্যের কবিতায় অনন্যতা এনে দেয়:
“যে পথে স্পিডব্রেকার নেই সেটা তো নিরামিশ পথ!”
কিংবা,
“এসো হাইহিল,মৃদু জুতার বাগান,অহেতুক
মেতে উঠেছি ধনুকের সুতোয়; সামান্য ছুতোয়।”
খুব যত্নে, খুব মনোযোগ নিয়ে সাম্যকে পাঠ করতে হবে। ডুবে যেতে হবে তার কবিতার কুয়াশা বন্দরে।
বহুবর্ণের এক কবিতার ভুবনজোত সযত্নে নির্মাণ করেছেন কবি সাম্য রাইয়ান। যেখানে আমরা খুঁজে পাই বিবাহিত ভোর, উজ্জ্বল পাখিঘুম, স্নানঘরে গড়িয়ে পড়তে থাকা শীতল জল, কৈশোরসেতু, কামনাবাগান, যোনিফুল, জলের কীর্তন, খেলনামমি আর পৃথিবীর বিপণিবিতানে এক হলুদবর্ণ শহরতলী।
৪.
কবি সাম্য রাইয়ানকে পাঠ করা মানে একজন সৎ কবিকে আবিষ্কার করা। এটুকুই বলি, এই মেধাবী কবি ঝিকিমিকি সন্ধ্যাতারার মতো অন্ধকার দুহাতে সরাতে সরাতে বাংলা কবিতাকে অনেকটা দুর অবধি নিশ্চিত পৌঁছে দেবেন। আর পাঠক একান্তে উচ্চারণ করবেন:
“বাবার কান থেকে খসে যাচ্ছে গ্রামোফোনের সুর
পৃথিবীর সব পথ আজ ফাঁকা পড়ে আছে”