মার্কস যদি জানতেন: সাম্য রাইয়ানের রাজনৈতিক কবিতার দিগন্ত

❑ সাজ্জাদ সুমন 

একবিংশ শতাব্দীর কবিদের নিয়ে প্রায়শই শোনা যায়, বর্তমান কবিদের কবিতায় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আসছে না৷ এই কথা যে সম্পূর্ণ ভুল, তার উজ্জ্বল উদাহরণ সাম্য রাইয়ানের ‘মার্কস যদি জানতেন’৷ ‘ম্যাডামের দেশে’র মতো রাজনৈতিক এক ডজন কবিতা নিয়ে এক ফর্মার কবিতা পুস্তিকা ‘মার্কস যদি জানতেন’৷ গণঅর্থায়ন বা ক্রাউড ফাণ্ডিং-এর মাধ্যমে ২০১৬-এ প্রকাশিত হয়৷

কবি সাম্য রাইয়ান জন্মেছেন বাংলাদেশে। বেড়ে উঠেছেন সেখানেই, নদীঘেরা কুড়িগ্রাম জেলায়, প্রাণ-প্রকৃতির কোলে৷ তাই বারবার তার কবিতায় প্রকৃতি নতুন রূপে উপস্থাপিত হয়৷ এমন সে রূপ— যা কবি আবিষ্কার করেছেন, যার সাথে আমাদের পূর্ব পরিচয় ছিলো না৷ কবির মাধ্যমে যেন প্রকৃতির সাথে আমাদেরই সংযোগ তৈরি হয়৷

কবিতায় তিনি শব্দের বারুদ নিয়ে ফেটে পড়েননি। অনেক কবিতায় বরং নিপুণ কায়দায় বারুদের গন্ধকে পৌঁছে দিয়েছেন মনস্তাত্ত্বিক-বিশ্লেষণে, পাঠকের অন্তরের গহনে। বেশকিছু চিন্তা উদ্রেককারী বারুদমাখা কবিতা রয়েছে সাম্য রাইয়ানের। ক্ষমতাতন্ত্রের বিরুদ্ধে রয়েছে তার সত্য-সাহসী কণ্ঠস্বর। কর্পোরেট আগ্রাসনের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি লিখেছেন, “দু'চোখ মুড়িয়েছি রঙিন কফিনে; দেখতে পাচ্ছি না কিছু, বিজ্ঞাপনে৷” (বিশ্বরূপ)

“কোন চিহ্ন রাখবেন না ম্যাডাম / এটা দাস ক্যাপিটালের যুগ / ঘরে ঘরে মার্কস ঢুকে যাবে!” —সাম্য রাইয়ানের উচ্চারণ। সমাজের পরতে পরতে ঢুকে-পড়া অবক্ষয় বিবেক ও বোধের লোপ ব্যথিত করেছে তাকে। সমাজের দায়বদ্ধতাকে স্বীকার করেছেন তিনি। তাই তো সমাজের বিশৃঙ্খলা, অনাচার ও স্বেচ্ছাচারিতাকে মেনে নেননি।

“তুমি কি তাহার কুকুর?
লেলিয়ে দিয়েছে বলে
আক্রোশে ছুটে এলে!”
(পরিচয়)

প্রতিবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ এটি। ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধী অবস্থান সাম্য রাইয়ানকে শক্ত ও মর্যাদাকর স্থানে বসিয়েছে। মেরুদন্ডহীন বাঙালির মধ্যে স্বতন্ত্রতা প্রদান করেছে। এ শক্তি ও অবস্থান তাঁর কবিতার ভাষাকে করেছে আলাদা। তাঁর চরম অসন্তোষের প্রকাশ ঘটে কবিতায়৷ ১৯৭৫ সালের ২ জানুয়ারি বন্দী অবস্থায় বিরোধী রাজনৈতিক, কমরেড সিরাজ সিকদারকে বাংলাদেশ পুলিশ গুলি করে হত্যা করে! ‘মার্কস যদি জানতেন’ পুস্তিকায় কবিতা দিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন কবি—

“যদি অব্যাহত বেঁচে থাকি
শ্বাস নিই গ্যালন গ্যালন;
প্রতিটি রক্তফোঁটা থেকে শব্দ জন্মাবে আর
গহীন থেকে বেরুবে নির্ভীক সিরাজ সিকদার।”
(প্রভিন্ন পৌনঃপুনিক)

রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে, ধর্মে-অধর্মে, ধনী-গরিব ইত্যাদির মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বৈষম্য আদিকাল থেকেই বিরাজমান। 'গায়ের জোর' বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। বিশ্বমানচিত্রেও ক্ষমতা একটা বিরাট ব্যাপার। ক্ষমতাধর, সুপার পাওয়ার যুক্তরাষ্ট্র বললে সেটাই মানবতা, ন্যায়। তৃতীয় বিশ্বের কাছে পালনীয় তা, বক্তব্য বা মনের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয় না। গ্রামের মাতব্বর যা করে সেটাই সঠিক। এসব দেখেই সাম্য রাইয়ানের মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—
“এই যে চায়ের দোকান। খুব পরিচিত।
দেখা হলে কথা হয়। চলে গেলে ওই
চেয়ারে টেবিলে অন্য কুটুম বসে ।

ভিন্ন মানুষ হয়ে বারবার আসে। রক্তাক্ত
ক'রে ঘুমের ভেতর দেখা দেয়।

দুই কাঁধে বসে প্রশ্নকর্তা সেজে
জেরার পরে জেরা
আরও আরও জেরায়
আগুন লাগিয়ে আগুন নেভাতে যায়।”
(সোসাইটির চাকার নিচে)

আসলে কবিরা অসময়ে চুপ থাকতে পারেন না। যে কবি অসময়ে চুপ রাখে, তিনি আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন। নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে ঘোষণা দেন তিনি— ‘বোমার সুতোয় যারা ম্যাচ ঠুকে দৌঁড়তে পারে, আমি তাদের দলে নই৷’ (মানুষ)

সাবলীল শব্দ বা ভাষার ব্যবহার করে নতুন চিত্রকল্প তৈরির মাধ্যমে মনন ও মেধায় শক্তিশালী সাম্য রাইয়ান সহজেই পাঠকের মনে ঢুকে যেতে পেরেছেন৷ অতিআবেগী বাঙালির চেতনায় তিনি চেতনার রঙ ছড়াতে চেয়েছেন। কবিতায় অনিবার্যভাবে 'মেরুদন্ড সোজা' রাখার চেতনা ছড়িয়েছেন। তাঁর কবিতা পাঠে এমন উপলব্ধি হতে বাধ্য। পাহাড়ের নুড়ির ওপর স্বচ্ছ জল প্রবাহের মতো তাঁর কবিতার সুর নতুন প্রতিবেশ সৃষ্টি করে পাঠককে আবিষ্ট করে রাখে। এই সম্মোহনী ভাব পাঠককেও সম্মোহিত করে। এই সহজ ভাব উন্মোচনের নিজস্ব প্রক্রিয়াই আসলে একজন কবির স্বতন্ত্র ভাষা ও ভাবের কবিতা নির্মাণের ক্ষেত্রটি শক্তভাবে প্রস্তুত করে। 

কবি সাম্য রাইয়ানকে অভিবাদন কবিতায় তাঁর নিজস্ব স্বর উন্মোচনের প্রজ্ঞা ও শক্তিমত্তার জন্যে।

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *