যার কেবল মানুষ হারায় তার জন্য লেখা কবিতা

❑ সাম্য রাইয়ান 

“ONE DAY I'LL FIND THE RIGHT WORDS AND THEY WILL BE SIMPLE.”
–JACK KEROUAC

ফারিহা নূরের কবিতার আলো চোখ ধাঁধানো নয়, স্পটলাইটের মতো নয়; বরং এ আলো জোনাকির— হঠাৎ ঘন বেদনাময় কোনো রাতে দেখা যায়, আবার হারিয়েও যায়।

তরুণ কবি ফারিহা নূর তার কবিতায় যে আত্মচৈতন্যের রূপায়ন করেন তা মূলত প্রেম আর বিষাদের গহনে ডুবে থাকে। কিন্তু এই প্রেম একরৈখিক নয়, ব্যক্তির ভেতর দিয়ে ধাবিত হয়ে তা ছুঁয়ে যায় বৃহত্তর মানবিক বোধকে, নারীর অন্বয়ী অভিজ্ঞতাকে; এমনকি দ্রোহ ও প্রকৃতির ভাষাকেও। বইটির নামকবিতা থেকে যদি শুরু করি—
“যার কেবল মানুষ হারায়, তারেও কেউ ভালোবাসে৷”
(তারেও কেউ ভালোবাসে)

এই একটি পংক্তির মধ্যে অনুপস্থিত মানুষের অভাব, মানবিক ব্যর্থতার ইতিহাস, অন্ধকারের ভেতর থেকেও ভালোবাসার সম্ভাবনা— সবকিছুই সংকেতের মতো উপস্থিত। এমন সংবেদী উচ্চারণ আলাদা এক তল গড়ে তোলে, যেখানে হেরে যাওয়া মানুষের জন্যও থাকে একটুখানি আশ্রয়— ‘তারেও কেউ ভালোবাসে’।

প্রেম এখানে গরলমাখা, অপ্রাপ্তির আর্তিতে জন্ম নেয়। যেমনটা তিনি লিখেন—
“অপেক্ষার শেষে পড়ে আছে কিছু ভাঙা শব্দ
সময়ই গড়েছে প্রাচীর, ইচ্ছেরা তালাবদ্ধ
কত বাসনা ম্লান হয়, ঝরে যাওয়া পাতার মতন অবেলায়
সকল ক্ষুধা, তৃষ্ণা, প্রেম…”
(বিরহী সময়)

এই পংক্তিগুলোতে ‘সময়’ এক বিরুদ্ধ চরিত্র— যে প্রাচীর তোলে, ‘ইচ্ছে’কে তালাবদ্ধ করে, বাসনাকে ম্লান করে দেয়। এখানে ‘ভাঙা শব্দ’ হয়ে ওঠে প্রত্যাখ্যানের নিদর্শন, যা ফারিহা নিজের কাব্যিক অভিধানে অনন্ত বিষাদের অনুবাদ হিসেবে হাজির করেন।

তবু ফারিহার কবিতা পুরোপুরি নিরাশায় থেমে যায় না। তার ‘বেঁচে থাকা’ কবিতায় দেখা যায়—
“জীবনের সব রঙ ছুঁয়ে দেখা হয় না আমাদের
তবু এই বেঁচে থাকা প্রতিনিয়ত রঙিন হতে চায়।”
(বেঁচে থাকা)

জীবন যদিও সমস্ত সম্ভাবনার স্পর্শ পায় না, তবু সে নিরন্তর নিজেকে রঙিন করতে চায়। এটা যেন সত্তার আত্মসংকল্প, বিপরীত পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেকে রঙে রাঙানোর প্রত্যয়।

‘আগন্তুক’ কবিতায় কবি এক অন্তর্জগতে আশ্রয় নেন; যেখানে তিনি আরও অন্তর্মুখী—
“বুকের মধ্যে সীমাহীন এক আকাশ পুষে রাখি”
(আগন্তুক)

এখানে কবির বুকের ভেতর ‘সীমাহীন আকাশ’ এক ধরণের মহাবিশ্ব। সীমাহীনতা তার কবিতার বারবার ফিরে আসা মোটিফ। এই পংক্তি তার ভেতরের বিস্তারের কথা বলে; এই বিস্তার কোনো ‘পাঠ্যপুস্তকীয়’ ব্রহ্মাণ্ড নয়— এটা একান্ত, ব্যক্তিগত, ঘনঘোর অনুভবের পরিসর।

‘ভালো আছি, ভালো নেই’ কবিতায় দেখি এক বেকার যুবকের গল্প—
“বন্ধুদের আড্ডায় চায়ের কাপে
গল্পের ঝড় তোলা যে ছেলেটা বলে, ভালো আছি
বিষণ্ণ রাতে অজস্র স্মৃতির দহনে সেও ভালো নেই।”

এখানে এক অলিখিত, প্রায় সমস্ত মধ্যবিত্ত জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে এনেছেন ফারিহা। এই যে “ভালো আছি” বলা, যা অধিকাংশ সময়ে সামাজিক মুখোশ— সেই মুখোশের আড়ালে থাকে ‘স্মৃতির দহন’। কবিতা হয়ে ওঠে মুখোশ ছেঁড়ার আয়োজন।

এই ছেঁড়া-জোড়ার মধ্যেই ফারিহা তৈরি করেন তার কবিতা-ভাষা। এই ভাষা সরল, অথচ প্রগাঢ়। ‘জীবনবোধ’ কবিতায় পাই—
“যদি বিনিদ্র রাতে, দ্বিধায় আলোড়িত হয় হৃদয়
তবে ফিরে যাব প্রকৃতির কাছে
ফিরে যাব, পাতাঝরা বৃক্ষের কাছে
ভুলগুলো ভুলে যাব ফুল ভালোবেসে।”
“যদি উৎকণ্ঠায় কাটে অপেক্ষার দিনগুলি
তবে নত হব ক্লান্তির কাছে
ভেসে যাব নিশব্দে”

প্রকৃতি এখানে কেবল চিত্রকল্প নয়—একধরনের পুনরাবিষ্কারের ইশারা। যখন হৃদয়ে দ্বিধা জাগে, ক্লান্তি এসে নামে, তখন মানুষ প্রকৃতির শরণ নেয়— পাতাঝরা বৃক্ষ বা ফুল এখানে প্রাচীন পবিত্রতার অনুরণন তৈরি করে।

তেমনই ‘দোসর’ কবিতায়—
“জমে থাকা নিঃশ্বাস,
মিশে যায় পথের সীমানায়”

এই দুই পংক্তি অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে দম বন্ধ করা কষ্ট, অব্যক্ত চাপ। সেই জমে থাকা নিঃশ্বাসও শেষমেশ পথের সীমানায় মিশে গন্তব্যে হারিয়ে যায়। কবিতার গর্ভে জমে থাকা একধরণের বেদনাযাত্রা— যেখানে বাস্তব হয়ে ওঠে শ্বাস নেবার লড়াই।

শেষ করি ‘ঝরাপাতা’ কবিতার পংক্তিতে—
“ঝরে যাওয়া পাতার
শেষ চিহ্নটুকু আর নেই”
“হারিয়ে গেছে মানুষর পদতলে
চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে”

পাতা ঝরে যায়, চিহ্নও থাকে না। কবির অসহায় পর্যবেক্ষণ— পৃথিবীর দ্রুততায় হারিয়ে যায় সব কিছু। চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে হারিয়ে যায় মানুষ, তার পদচিহ্ন। চিনুয়া আচেবে যেমন লিখেছিলেন— “সবকিছু ভেঙেচুরে যায়;” হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন— “সবকিছু ভেঙে পড়ে”৷
এখানে ব্যক্তি নয়, একসমস্ত মানবজাতির ক্ষয় প্রতিফলিত হয়। যে অনুভূতি যুগ যুগান্তর ধরে মানুষের হৃদয়ে প্রবাহিত হয়ে চলেছে৷

ফারিহা নূরের কবিতার ভাষা সহজ, সাবলীল। তার কবিতায় আছে বিষাদ, দ্রোহ, প্রেম, প্রতিটি স্তবকে থাকে অভিজ্ঞতার ছায়া। যে অভিজ্ঞতা সর্বজনীন হয়ে ওঠে তার সারল্যের কারণে।

এ বইয়ের অনেক কবিতায় আছে নারীবাদী সুর, যা চিৎকারে নয়, ছায়ার ভঙ্গিমায় প্রকাশ পায়। তিনি প্রত্যক্ষ দাবি জানান না, কিন্তু তার কবিতার শরীরজুড়ে থাকে এক ধরনের অনুভূতির ন্যারেটিভ, যা পাঠকের মনে অনুরণন সৃষ্টি করে।

‘তারেও কেউ ভালোবাসে’ বইটি তাই কেবল প্রেমের নয়, বিরহের নয়, বরং এই সময়ের এক তরুণ কবির আত্মোপলব্ধির দলিল—
“যার কেবল মানুষ হারায়, তারেও কেউ ভালোবাসে।”
এই ভালোবাসাটুকু আমাদের প্রয়োজন, এই কবিতাটুকু প্রয়োজন এই ধূসর সময়ে। 

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *