❑ বিপুল বিশ্বাশ
“মিছা কথা কইও না, আমার শীত করে”
(চূড়া)
আরে কয় কী! এই কথাডা কই পাইলো এই কবি! এ যেন গাবের আঠার মতো টানিয়া রাখিতেছে। নিজস্ব দেহের ভিতর নিজস্ব মনকে একাকার করিয়া কবি নিজেকে যে নিজের ভিতর হারাইয়া ফেলিয়াছে, তাহা পরিষ্কার। এ তো অল্প বয়সী ফুড়ফুড়ে পুরোমাত্রার এক রোমান্টিক কবি। তিনি নিজেই তো স্বগতোক্তি করিয়াছেন—
“জুলাইয়ের কোনো এক সকালে
আমি জন্ম নিলাম শব্দ থেকে
আর সামনে উন্মোচিত হল
পৃথিবীর প্রবেশদ্বার"।
(তোমাকে)
জন্ম, জন্মদিন, জন্মান্তর এগুলোতে সবারই আলাদা আলাদা গল্প থাকে— হাসির, কান্নার, কষ্টের। প্রতিটা দিনই তো আমাদের এক একটি ব্যক্তিগত ইতিহাস। আমাদের পায়ের বৃত্তচাপের সাথে জমা হয় সামাজিক, অর্থনৈতিক আর রাজনৈতিক বৃত্তচাপ। তখন কিছুই ভালো লাগে না। এই অভিজ্ঞতা আমাদের সবারই। কবিরও—
“কিছুই ভাল্লাগছে না আজকাল, অগণিত
মিথ্যে সংবাদপত্র, বাহারি চোখ-মুখ
আলোর জৌলুশ, সিরামিক সোসাইটি”
(বোধিদ্রুম)
ভালো না লাগা শুরু হইলে মানুষ দুই জায়গায় যায়— তার প্রিয় মানুষের কাছে অথবা ঈশ্বরের কাছে। আর যখন সে তাহার প্রিয় মানুষের ভিতর ঈশ্বরকে খুঁজিয়া পায়, তাহার মতো আনন্দের কিছু নাই। কিন্তু এই চাওয়া তো সবসময় নিজের মনের মতো করে মেলে না। নিজের সব কিছু উজাড় করিয়া বলিবার জন্যে যাহার কাছে ছুটিয়া আসা তাহার কাছে যে সেই জিনিস আর নাই। কবি তাই বলেন—
“আমার ঈশ্বর তুমি, ভেতরে সবুজাভ পাট; অথচ আশ্চর্য, তোমারই হৃদয়ে ঘটে বানানবিভ্রাট!”
(বানানবিভ্রাট)
কবি বুঝিতে পারেন এই সবের সূত্রমুখ অন্য কোথাও আছে, অন্য কোনো মানুষের ভিতর। যদিও সব মানুষ এখন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন। সবার মুখ অচেনা, যেন দ্যাখাই হয়নি কোনদিন। যে মুখ তিনি চিনিতেন, সেখানে অন্য মুখ লাগানো, এভাবে—
“মানুষই হরণ করেছে মানুষের সুখ৷
আহা জীবন
কী বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ!
তীব্র স্বরে ডেকে যায় নিঃসঙ্গ শালিক৷”
(জীবনপুরাণ)
এরপর আরো বেশি বিচ্ছিন্ন হয় মানুষ। আরো বেশি দূরবর্তী হয়। একই গ্রহে থাকিয়াও সে যেন গ্রহান্তরের মানুষ। এই তো চারিপাশের শিশুরা হাসিতেছিল অথচ তাহারাই আবার কাঁদিতেছে—
“কোথায় সে গ্রহ, এতো হাসির শব্দ আসে!
আমার শিশুরা কাঁদছে; এদের ঘুম ভেঙে গেছে৷”
(ক্রোধ)
কবি বা আমরা এই সব ভুলিয়া যাইতে চাই। আর যাহা কিছু ভুলিয়া যাই তাহাও তো এক ধরণের স্মৃতি। সেই স্মৃতিতে থাকে ছোট্টবেলা, ডাকঘর, আর প্রিয়তম মানুষ। কবি ভুলে যেতে চান—
“ভুলে যেতে চাই হারিয়ে যাওয়া ডাকবাক্সের
স্মৃতি; আর সেই নীল-জামা
মাতাল তরুণীর কথা৷”
(গভীর স্বপ্নের ভেতর)
অল্পবয়সী ফুড়ফুড়ে এই রোমান্টিক কবির রোমান্টিসিজম, কোনো এক উচ্চতর বিন্দুতে পৌঁছে কবিকে দিব্যচক্ষু দান করিয়াছে, যাহাতে তিনি সব পরিস্কার দেখিতে পান।
তিনি যেন একটু বেশিই দ্যাখেন। এ এক অন্যরকম দ্যাখা। ‘ডানা ও ব্যাধ’ কবিতায় তিনি তাহার দৃষ্টির প্রসারতা এইভাবে ছড়াইয়া ও আবদ্ধ রাখিয়াছেন—
“ছায়ার ডানায় বেঁধে ব্যাধের উচ্ছ্বাস
ক্ষুব্ধ ধ্বনির সাথে হেসে উঠছে─
হেলে পড়ছে স্বরবৃত্তের মেঘ। ঘুম ও
জাগরণের মধ্যখানে তোমার এলোচুল
ছাড়া কোনো বিভেদরেখা নাই। আলোর
মুহূর্তে শুধু জীবন্ত হচ্ছে চুল; এতোগুলো
গোসলের পর কী সুদূর রেখা বেয়ে
ভেসে উঠছে হারিয়ে ফেলা জামার বোতাম।”
(ডানা ও ব্যাধ)
নিজস্ব ঘরানার চৌকাঠে এই কবির এক পা দেয়াই আছে, অন্য পা বাহিরে যাইবার জন্য প্রস্তুত। তিনি জানিয়া গেছেন ঘরের বাহিরে তাহার চারণভূমি, সেখানে আরো অনেকেই তাহার জন্যে অপেক্ষা করিতেছে। তিনিও পারেন সেখানে অন্য সব কবিদের সাথে একসাথে আড্ডায় মাতিয়া উঠিতে। আর সেই আড্ডায় কোনো কবি তাহার নিজের পকেট হইতে সিগারেট বাহির করিলে, কবি সাম্য রাইয়ানও তাহার নিজের পকেট হইতে আগুন বাহির করিয়া স্মিতহাস্যে সেই সিগারেট ধরাইয়া দিতে পারিবেন, নিঃসন্দেহে।