❑ সুতপা রায়
বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলা থেকে জন্মসূত্রে উঠে আসা এক অসামান্য কবি ও গদ্য লেখক সাম্য রাইয়ান। লিটল ম্যাগাজিন ‘বিন্দু’র সম্পাদনার সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে আছেন অসংখ্য পত্রিকায় নিজের সাহিত্য সৃষ্টি নিয়ে। কবিতা, প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছেন নতুন ধরণের আখ্যানধর্মী গদ্য৷ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ: সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয় নোট (গদ্য, ২০১৪); বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা (কবিতা, ২০১৫); মার্কস যদি জানতেন (কবিতা, ২০১৮); হলুদ পাহাড় (কবিতা, ২০১৯); চোখের ভেতরে হামিংবার্ড (কবিতা, ২০২০); লোকাল ট্রেনের জার্নাল (গদ্য, ২০২১); লিখিত রাত্রি (কবিতা, ২০২২); হালকা রোদের দুপুর (কবিতা, ২০২৩)৷ সম্পাদিত গ্রন্থ : উৎপলকুমার বসু [নির্বাচিত রচনা ও পর্যালোচনা, ২০২২], জন্মশতবর্ষে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [প্রবন্ধ সংকলন, ২০২৩]৷
ওনার রচনার মধ্যে থেকে আলোকপাতের জন্য বেছে নিলাম অভিনব গদ্য ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’কে। সাম্য রাইয়ানের লোকাল ট্রেনের জার্নাল যেন সত্যিই এক কাব্যিক জার্নাল, যেখানে বাস্তব ও পরাবাস্তব একসঙ্গে জাগ্রত। মনে হয় যেন প্রতিযোগিতা চলছে কে কাকে ছাপিয়ে যেতে পারে। “ঘরের জানালা এক বিরতীহীন টেলিভিশন”— সত্যি বোকাবাক্স ছেড়ে যদি এ বোকামি রপ্ত করা যায় তবে খোলা আকাশ, প্রকৃতির রঙের বদল, পাখির উড়ে চলা সব দৃশ্য সুখ হয়ে উঠে আসে। পৃথিবীর নিখুঁত পরিসীমার বাইরে এ তো অতিরিক্ত প্রাপ্তি। কেশাবিষ্ট ঘুমিয়ে পড়া মুখ দেখা যায়। তা বলে “দু ঝুঁটি চুলের ঘুমিয়ে পড়া”, “কুয়াশা গোটানো আস্তিনের ঘুমিয়ে পড়া”, “কোলাহলের ঘুম”— ব্রেভো, এ দেখার দৃষ্টি তো শব্দহীনতার প্রত্যাশা। বৃষ্টি বাদল কখন ক্লাসের বন্ধু বাদল হয়ে যায়" শ্যামল ধান ক্ষেতের মতো সন্ধ্যেও শ্যামল হয়, এ এক আশ্চর্য আবিষ্কার।
“কালো বাঘ লাল কাক পাশাপাশি শুয়ে থাক”তে “কোথাও কোন শব্দ হয় না, যেন শিশিরবিন্দু নয়, প্রবাহের শব্দ হবে! তবু কোথাও যেন ঝরে গেল কিছু, কোথাও আবার জমা হলো যেন”—
সৃষ্টি সমূহের মধ্যে বেঁচে থাকার আর্তি, যাকে কবি মন অনবধানে স্থায়ী হতে দেখতে চায়। চলে যেতে যেতেও এভাবে থেকে যাওয়া একটা স্বপ্নের মতো। যে স্বপ্ন লালিত হয় প্রত্যেক স্রষ্টার অন্তরে।
এই প্রসঙ্গে কয়েকটা লাইন—
আমি যেদিন চলে যাবো/ সেদিন হয়তো সূর্য উঠে যাবে সময়ের আগেই/ কোনো পাখি ডাকবে না সারাদিন/ কোথাও লেখা হবে না একটাও কবিতা/ শব্দজরায় ভুগতে ভুগতে/ কবিদের কেউ কেউ সেদিন/ ব্যর্থ রমনের শেষে চলে যাবে স্নানে/ কেউ হয়তো থলে হাতে কেরাণীর মতো/ লালশাক কিনতে যাবে ঘিনঘিনে বাজারে,/ কিংবা বালু-সিমেন্টের হিসেব মেলাতে/ কেউ যাবে কোনো ঠিকাদারী মাঠে/ আপনারা ভয় পাবেন না।
(আবুল হোসেন খোকন, অপ্রকাশিত, ফেসবুক থেকে)
“একটা সত্যি কথা বল”তে সাম্য রাইয়ান এক অবিসংবাদিত রোমান্টিক আবহ সৃষ্টি করেছেন, যেখানে রোমান্স ঘা খেয়ে খেয়ে ফিরে আসে। যেখানে কবি বিবমিষায় প্রেমিকার “ব্যাগ ভর্তি গুডবাই” দেখতে পান। তপ্ত দুপুরকে রূপবতী বলার যে এলেম দরকার তা কবি করে দেখিয়েছেন। দুনিয়াকে দুহাতে তুলে ছুঁড়ে ফেলার ইচ্ছে, এ তো হিম্মতের দুনিয়াদারি। বনভূমির অহম-অপূর্ব উপমা। বন্ধুত্বের বিশ্বাসঘাতকতায় সত্যিই অক্টোপাসের বন্ধন। কবির পকেট ভর্তি আলোচনা বা কবিতা থাকে কিন্তু ঘরে থাকে প্রয়োজন। এ কবির আক্ষেপ না কাব্যিক অবগাহন? স্বপ্নবাজ তাঁতি শুনে অবাক হতে হয়, কবি সাজায় তার বয়নের শব্দ যাতে স্বপ্ন লেপটে আছে। এ যেন নিজের কাছে নিজের সমর্পণ। দিনমান টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়েছি তোমাদের অসংখ্য বসতবাড়িতে। “রাতের সমাপ্তে এ কী হলো আমার? ভরপেট দানাপানি দিলে গুলিও করে দিবো বুঝি!” —লেখক, কবির সারাদিনের পরিশ্রম তার লেখনী তো পাঠকের জন্যই। তাই তার অবস্থান তো অন্যের বাসস্থানেই হবে। সেটা যত বেশি হবে তত স্রষ্টার পরিতৃপ্তি বাড়বে। আবার লেখনী যখন প্রকাশকের দখলদারিতে পণ্য হয়ে যায় তখন তার দহনমাত্রা বাড়তে পারে। বা কবির হৃদয়চুম্বী জনপ্রিয়তা কবিকে বাধ্য করে সমাজের জগদ্দল পাথরগুলোকে আঘাতে আঘাতে বিদীর্ণ করতে, এই স্পৃহাই ‘গুলি’ শব্দটার জন্ম দেয়।
“কবি যা বলেন তা গুরুত্বপূর্ণ, যা বলেন না তা-ও গুরুত্বপূর্ণ” মুক্তগদ্যে “আমরা যারা ভবিষ্যত বিক্রির টাকা দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মত্ত, মিডলক্লাস তাদের গালি দেয় মন খুলে। কখনও পাগল বলে প্রচার করে।” এই উপলব্ধির থেকে বড় সত্যি আর কিছু হতে পারে? বোধগত পরিশ্রম সাহিত্য সৃষ্টিতে ব্যস্ত রেখে কতজনের ভবিষ্যৎ শিকেয় উঠেছে অর্থাৎ বিক্রি হয়ে গেছে এমন সম্প্রদায়কে মধ্যবিত্ত সমাজ গাল দেবে, পাগল বলবে এটাই তো স্বাভাবিক।
পাছে কারোর নিজের সন্তানও এই কাব্যজ্বর, এই পাগলামিতে আক্রান্ত হয়! তবে এই পাগলেরা আছে বলেই ইতিহাস তৈরী হয়, সম্পর্কের ভাঙাগড়া নজরে আসে। গীতিকাব্যের মূর্ছনায়, বাউলের শব্দক্ষেপে হৃদয় সিক্ত হয়। “প্রচুর শব্দের অপচয়/ অনর্গল বাক্যব্যয়, হয়েছে/ হুলস্থূল সব এলোমেলো৷”
এমন করে আত্মকথনে বিষাদের সুর বাজে। তবুও মৃৎশিল্পীর খড়ের কাঠামোর ওপর প্রতিমা গড়ার মতো শব্দের বাহু বেয়ে বাক্য নামে। নানা অভিব্যক্তিতে সেইসব সৃষ্টিরা ছড়িয়ে পড়ে।
“অন্ধকারে সাঁতার কাটে সোনার হরিণ” মুক্তগদ্যে ‘শহিদুল ভাই’ নামক চরিত্রের চোখ দিয়ে সমগ্র পাঠক সমাজের ভাবনাটাকে ভাবিয়ে নিলেন গদ্যকার। কবি সম্পর্কে সাধারণের যে লুকোনো সম্ভ্রম আছে তা অভিজ্ঞতালব্ধ। “কবিতা হলো ডাক্তারের প্রেসক্রিপশনের মতোন”— অস্পষ্ট হাতের লেখা আর কবিতার রহস্যময়তা শেষমেশ মিলেমিশে যায়। তাই রোগ উপশমের দাওয়াই দু ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। একটা মনকে সম্পৃক্ত করা অন্যটা শরীরকে। আর কে না জানে শরীর ও মন একে অপরের পরিপূরক। শিল্পবিহীন কলার পরিণতির সমাচারে গদ্যকারের অসীম রসবোধের পরিচয় পাওয়া যায়।
“এইম ইন লাইফ বিষয়ে কথা বলার সময় ছাত্রটি বলেছিল”—ছাত্রের ভাষণে সত্যিই এক সদ্য তরুণের আবেগ ছিল। তবে আমরা জানি পেশাগত জীবনে এসে খুব কম জনেরই সে আবেগ অবশিষ্ট থাকে। তখন ত্যাগের জায়গায় সে টাকা তৈরীর মেশিনে পরিণত হয়। তখন ওর আগের আর্তের সেবা করার ত্যাগের প্রতিশ্রুতিকে লোকালয়ে কারুর বেওয়ারিশ মূত্রত্যাগের সঙ্গে তুলনা করলেও গদ্যকার অশ্লীল কথন দোষে দুষ্ট হন না। সকালের ঘুমভাঙা চোখে কফি সেবনের সময় ঐ কাপের ধোঁয়াকে উড়োজাহাজের ছেড়ে যাওয়া ধোঁয়ার সঙ্গে তুলনার কল্পনায় মোটেও কষ্টকল্পনা থাকে না। বরং ঝর্ণার অনাবিষ্কৃত উৎস দর্শনের মতো ঐ আচমকা রূপকে আচ্ছন্ন হতে হয়। “রাত নেমে এলে যখন চাঁদের দ্যাখা পাওয়া যায়, তখন তাকে ঘর থেকে ডেকে আনে চাঁদ”—চাঁদের আকর্ষণ কোন্ কবি-লেখক উপেক্ষা করতে পারে? চাঁদের হাসিতে কেউ মা’কে দেখে বা প্রিয়ার মুখ খুঁজে পায়। তবে রাত নামলে উপাসক দর্শক নিজেই তাকে খুঁজে নেয়। এক্ষেত্রেও গদ্যকারের ধারণা ব্যতিক্রমী। স্বয়ং চাঁদ কবিকে ঘর থেকে ডেকে এনে বোঝায় যে সূর্য এখন নেই, তাই সময়টা ওর একান্ত নিজস্ব সময়। চাঁদের সখ্যতা স্থাপনের জন্য নিজের নেমে আসা বা ওপরে ডাকা এমন ফ্যান্টাসি শুধু পড়লেই হয় না, অনুভব করতে হয়।
রোদ নিয়ে অভিনব বর্ণনা ও ব্যাখ্যা পাই যেমন “খরস্রোতা রোদ বয়ে যাচ্ছে তবু সাড়া দিচ্ছো না”—কবির ভাবনায় রোদও খরস্রোতা হয় সম্ভবত প্রখর তেজে।
“হাঁটতে হাঁটতে পথ গেছে ক্লান্ত হয়ে” মুক্তগদ্যে কবির অন্তর্দৃষ্টিতে সুখ হল জং ধরা, সম্ভবত সুখের স্থবিরতা কবির অপছন্দের তাই তাতে স্থবিরতার জং দেখেন অথচ তার দৃষ্টিতে দুঃখ ইস্পাতের ফলার মতো। কবির এই আত্মগত বৈপরীত্যের উচ্চারণ আবার মনে করায় কবির দর্শন আর সমাজের দর্শন মেলে না তাই কবি সেখানে একা হলেও অনন্য।
কলমকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করা সে তো প্রাসঙ্গিক বৈপ্লবিক চেতনা। অত্যাচারী শাসক তো বন্দুকের থেকেও কলমকে বেশি ভয় পায় তাই কলম ও তার ধারককে নানা কঠিন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। ‘কালো বাঘ লাল কাক শুয়ে থাক’ মুক্তগদ্যে মানুষের সাক্ষাতের সঙ্গে যে অবান্তর প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে এ কবির মতো করে কি আমরা সবাই বুঝি না? এ অনভিপ্রেত অভিজ্ঞতা কার নেই? সব সাক্ষাতে যে সাহচর্য মিশে থাকে তা নয়। তা ব্যক্তিগত পরিসীমায় ঢুকে পড়ে ক্ষতবিক্ষত করে। সমাজের থাকার জন্য মানানসই চক্ষুলজ্জায় আমরা তা বলতে পারি না মেনে নিই। সত্যদ্রষ্ট কবি তাই সমস্ত ভ্রষ্ট লজ্জাকে ছিঁড়েখুঁড়ে দিয়েছেন। আর হাসি মুখে দূষণ, তাও কিনা খুঁজতে হবে পকেট হাতড়ে। তবে হাসির দূষণ হয় না হলে হাসির এতো শ্রেণীবিভাগ থাকত না, যেমন নির্মল হাসি, দেঁতো হাসি, তেতো হাসি, মুচকি হাসি, খোলা হাসি আরো কতরকম। “ভালোবাসার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য মরে যাওয়ার জন্য নামের দরকার” —এ উক্তি যে কত অর্থবহ ও ধ্রুবসত্য। কোন নামে মানুষের বীতরাগ, কোনটায় অনুরাগ জন্মায়। কত কাজ শুরু ও শেষ হয় নাম মাহাত্ম্যে। বেঁচে থাকার জন্য তো পরিচিতির ভিত্তিই নাম। নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা গোত্রের অহমিকায় কত সম্পর্ক ভেঙে যায়, কত সম্পর্ক শুরু হয়। নামের আনুষ্ঠানিকতায় কোন ফাঁক থাকে না। আর মরে গেলে চন্দ্রবিন্দু সহযোগে নাম নতুন রূপ পায়। তবে সে থাকে তার নতুন অলঙ্করণে। “ছিন্ন জোট দূরে গেছে” সত্যি যারা বেঁচে থাকে তারা যেমন সংখ্যায় একজোট তেমন ও পারে মৃতরাও একে একে জড়ো হয়, জোট বাঁধে। জীবনের বিষাদ কি শান্তির দূত পায়রার পায়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়। যায় হয়তো কবির কল্পনার দৌড়ে। “বাজান, সবকিছু কিনে দেব বছরের শেষে; নতুন জামা, বাটা জুতা, ফুলপ্যান্ট, সানগ্লাস আর ফনিক্স সাইকেল” —এ লেখা তো নিম্নবিত্ত শত শত বাবার বুক চিরে বেরোনো এক আর্তনাদ যা কালের গহ্বরে বিলীন হওয়ার নয়। যা সন্তানের শৈশব, কৈশোর, যৌবনকে অতিক্রম করে একই অবস্থানে ভাবায়। অবস্থানগত পরিবর্তন সত্ত্বেও এ ভাবনা চিরকালীন।
“রাত্রি একটা অনাহূত বেদনার নাম” মুক্তগদ্যে রাতকে কেন্দ্র করে যে ভয়ংকর কল্পনাগুলো করা হয়েছে যেমন ব্রিজের ওপর থেকে লাফ, এ হয় কোন হতাশ প্রেমিকের উপাখ্যান বা জীবন যাকে তার চাহিদা মতো দু হাতে ভরিয়ে দেয়নি। “মতামতের উর্ধ্বে ছিল জন্মগ্রহণ প্রক্রিয়া” —এই যুক্তিতে রাতকে সাক্ষী করে আত্মহননে নিজেকে সঁপে দেওয়া হয় রেললাইনে নতুবা টানা চেনের জন্য জরিমানায়। এ জীবন তো কোন উৎসবের জীবন নয়, এ তো জীবন নিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহের প্রতিবাদ। যা সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত হতে পারে সেই রেললাইনকে নিরাময়ের দেবদূত বলা হচ্ছে। হয়তো জীবনের স্পৃহা হারালে মহার্ঘ্য জীবনেও ভার নেমে আসে। “সময় আর আমি পরস্পর দুই পায়ের মতো পাশাপাশি চলতে চলতে জেনেছি, প্রকৃত বিচারে-কিছুই এখনো জানা হয় নাই”
—এখানে দুই পায়ের মতো সময় আর নিজের অবস্থান কি সমতালে চলা? নাকি এক ছাড়া অন্যে অস্তিত্বহীন? এ লেখকের অনুসন্ধিৎসা বা খোঁজ।
“জল ছাড়া ভেঙে পড়ার আর কোন শব্দ শোনা যায় না” —সত্যিই তাই আভ্যন্তরীণ ভাঙন, ক্ষয় তো নিঃশব্দে চলে জলের মতো সশব্দে আছড়ে পড়ে না। জীবনের এই উপমাগুলো কতটা জীবনস্নাত হলে মণিমুক্তোর মতো তুলে আনা যায়। বিশ্বাসের পুরোনো দালান ভেঙে পড়া মানে আস্ত বিশ্বাসটাই ভেঙে পড়া নয়তো? রূপকের ঘোরে রূপকের ঘরে বাস করা এই লেখনী বড় রহস্যময়।
“শাদা অন্ধকারে অন্য মন্ত্র” মুক্তগদ্যে এমন জীবনের কথা বলা হয়েছে যেখানে সূর্য না থাকা বা তার উদয়ে কিচ্ছু যায় আসে না, যেখানে অন্ধকার সর্বোত্রগামী। কোথাও অসীম স্বর্গীয় সুখ বা অমরত্ব বলে কিছু নেই। গ্রীষ্মের দাবদাহ শ্রাবণে বৃষ্টি হয়ে নামে, সে বৃষ্টি নামাতে গেলে বুকে আগুন বইতে হয়। কবির লেখায় আক্ষরিক অর্থেই সেই আগুন আর শ্রাবণের বৃষ্টিকে প্রত্যক্ষ করা যায়। সেই আগুন এতোটাই তীব্র যে বৃষ্টি শুষে শুধু আশ্লেষের থুতু হয়ে যায়। তাই প্রশ্ন—
“সারাটা মাস পার হলো সে ছিটিয়ে কেবল থুতু,
শ্রাবণের এই বুকে সত্যি আগুন কিছু আছে?”
অপূর্ব কাব্যিক চিরপ্রস্থানের বর্ণনা। “আমার বন্ধু পরোপকারী ট্রেন, সর্বত্র গান গেয়ে বেড়ায়।”
এই যুক্তিকে খণ্ডন করা যাবে না। যাতায়াতের পথে ট্রেন যে কত বড় বন্ধু তা নিত্যযাত্রী, ফেরিওয়ালা, পথের ফকির সকলেই বোঝে আর শব্দে, বুকের ঝর্ণায় সে তো গানই বয়ে বেড়ায়। “ঐ পথের স্মৃতিকথা রবিবাবু লিখেছেন ছোট নদী কবিতায়।”
এ যেন অতীত থেকে উঠে আসা নদীকথন যে নদী বাস্তব ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী পালটে গেছে। এমনকি ওরকম নদীর কল্পনাও কষ্টকল্পনা। আর সত্যিই তো বিশ্বউষ্ণায়ণে মৌসুমী বায়ু তো এখন খামখেয়ালী। তার খেয়ালী বুকে বাষ্পের বদলে এখন ধ্বংসের ধূলিঝড় জমে। আধুনিকতার দাপটে সাম্প্রতিক অতীতও যাদুঘরে ঠাঁই পায়। “বাঁচার প্রথম শর্তে অর্থহীন আমি বর্তমান” সত্যি এ এক নয়া প্রজন্মের দিশা যেখানে ভবিষ্যৎ চকচকে ঝকঝকে করতে গিয়ে বর্তমান বাঁচাটাই ভুলে গেছে। অবিকল রোবটের মতো এক যান্ত্রিক জীবন যেখানে ভবিষ্যতের নিশ্চিন্ততার জন্য মধ্য মেধায় পৃথিবী ভরে গেছে। আমরা একটা টলেমি পাচ্ছি না, না গ্যালিলিও। না শুনতে পাচ্ছি সুভাষের উদাত্ত আহ্বান। আমরা বাঁচার উৎসবে নয়,বাঁচার একঘেয়েমিতে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি। “বোধের বিকল্প বুঝি কৌশল-চাতুরি-রোডম্যাপ-রোডম্যাপ
হৃদয়ের উষ্ণতা না, মাপকাঠি আজ সারফেস-টেক্সচার-মুখোশ-মুখোশ” —এ তো শীর্ণ সভ্যতার গালে সপাটে চড় মারা। অতল হৃদয় আজ নিখোঁজ, বদলে আমরা পেয়েছি মুখোশ। যা দিয়েই উঁচু নীচু, বোধ নির্বোধ, সব মাপা হয়। প্রকৃত মানুষটাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা ঐ সারফেসেই আটকে থাকি, ভেতরের কৌশল কারসাজি আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়। ঐ সারফেসই ব্যক্তির ভবিষ্যৎ ঠিক করে দেয়। কবির অতল মন লালনে বিহ্বল হয়, অর্থাৎ ঐ সাধন পথের জন্য আকুতি। সে লক্ষ্য বা মোক্ষে পৌঁছোতে না পারলেও চাওয়ার অবশেষটুকু রয়ে যায়। আকাশ নিয়ে কবির কৌতূহল যে কোন ভাবুক বা বাস্তববাদীর মতো। তাই মেঘের নামকরণে যেমন বর্ষার কালো মেঘ আছে তেমন আহা মেঘ আছে, যে মেঘের অস্তিত্ব বিজ্ঞানের পাতায় নেই চিত্রশিল্পীর তুলির টানে আছে।
“পৃথিবী খুব একটা মজার জায়গা না” এই গদ্যাংশের শুরুতেই পৃথিবীর অন্ধকার বোঝাতে এমন একটা উপমা ব্যবহার করা হয়েছে যার সঙ্গে পৃথিবীর সম্পর্ক কোটি কোটি বছরের। বরঞ্চ আমরা এই পৃথিবীর নবীন বাসিন্দা। তবে গাছের গহ্বরের মতো অন্ধকারাচ্ছন্ন, যেখানে আশ্রয় নেয় হিংস্র শ্বাপদেরা। তবে সম্পর্ক অনেকদিনের হলেও সে নবীন বাসিন্দার প্রয়োজনের দমন পীড়নের শিকার। তাই কবির মনে “মৃত মানুষের অনুভূতি জাগিয়ে দেয়।” চিরঘুমের কী অদ্ভুত সংজ্ঞা “একদিন ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে ঘুমিয়ে নেবো।” হাওয়া বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়,ধুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়। সেই হাওয়ার কাছে জীবনের সময়কাল উড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রার্থনা করা হচ্ছে। কারণ গদ্যকারের ভাষায়— “পৃথিবী অতোটা মজার জায়গা না।” আজ হৃদয়ে হৃদয় থাকে না তা জামায় বিজ্ঞাপিত হয় তাই গদ্যকারের আকাঙ্খা প্রকৃত ও জামা, এই দুই হৃদয়ের মালিক হওয়ার। শেষপর্যন্ত সঙ্গে রাখবেন পোশাকি হৃদয়কে অন্যটা বন্ধুদের দাওয়াতের ভোজে। হ্যাঁ, হৃদয়ের দখলদারি তো প্রকৃত বন্ধুদেরই দেওয়া যায়, তাই তিনি সে দরজা তাদের জন্য হাট করে খুলে দিয়েছেন। “আমার আছে জ্বর, পথে ঘোরেফেরে এক জ্বরাক্রান্ত মন” —শরীরের জ্বর আর শরীরে আটকে থাকে না, মনেও সংক্রামিত হয়।
জ্বরাক্রান্ত মন সিগারেট চায়ে মুক্তি খোঁজে। এ তো সৃষ্টির জ্বর তাই তো সিগারেটে মগ্ন হৃদয়।
“দৃষ্টিসীমায় দেখি প্লাবন। মনে হয়, সে অন্য কেউ নয়, এই আমি” নিজেই নিজেকে প্লাবিত হতে দেখা, স্বেচ্ছাকৃত বন্ধনছিন্ন হওয়া। তাই তো সে মাইশার পাগল দাদা। সৃষ্টি সুখের উল্লাসে কী বাঁধাগতে চলা যায়? এই পরিমাপ ছাড়া, বিনা ছন্দের জীবন তো শুধু মাইশার চোখে নয়, এ তো সমাজের চোখে পাগলামি। এই পাগলামিতেই কত খ্যাত, অখ্যাতজন কালের সীমা অতিক্রম করেছেন।
এই প্রসঙ্গে কয়েকটা লাইন—
“মানুষ/ তোমাকে ভালবাসি।/ এই ভাবে/ পৃথিবীর ইতিহাস বারবার/ বদলে গেছে,/ তবুও মানুষ, সব সময় বেঁচেছে।/ আমরা পাগলের মতো জীবন/ চালিয়ে গেছি/ কিন্তু, এটাই জীবন?/ আমাদের দিয়ে পৃথিবীতে কিছুই হয় না,/ কিছু নয়।
(ঋত্বিক ঘটক, প্রথমত, বর্ষ-৫, সংখ্যা-৭)
একই বাঁধাধরা জীবন শুধু পটচিত্রের ভাঁজ হয়ে থেকে যায়। তা কি শেষপর্যন্ত হৃদয়ের অঙ্গনে শিউলীমাস আনতে পারে? কিংবা শিউলী-বকুলের সুগন্ধ নিয়ে ফুটতে পারে? গদ্যকারের এই রেখে যাওয়া প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে ভাবীকাল। যখন প্রজন্মান্তরেও এ প্রশ্ন অমোঘ জিজ্ঞাসা হয়ে থেকে যাবে।