❑ সন্দীপন দাস
‘‘আমার শরীর যাকে আমি অবিশ্বাস করি নক্ষত্রের মতো, যারা বৃষ্টি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে না, এই যে কাছাকাছি পৌঁছানো গেল তার যে কোনো সময়ে সে ঈশ্বরের আত্মাকে রেখে না যায় আমার কাছে। আমার ভয় করে...’’। চরম অসাম্যতার নিদর্শন ফুটে উঠেছে উপরের পংক্তিটিতে। এমন অসাম্যতাকে যিনি নখদর্পণে সযত্নে লালিত করেন সাম্য, সাম্য রাইয়ান, ওপার বাংলার প্রখ্যাত কবি ও গদ্যলেখক।এক ক্ষুদ্র পরিমণ্ডল থেকে বৃহত্তর অংশে মাঝে-মধ্যেই ঘোরগ্রস্ত হয়ে ঢুকে যান কবি— ‘‘মাথার উপরে পৃথিবীময় পাখাটি ঘুরতে ঘুরতে বেলা বাড়ছে/ ... এমন অনুভূত হয়, যেন এক আধিভৌতিক পাখা। পক্ষীরাজের ডানা...’’ (পক্ষীরাজের ডানা)। ‘জোকার’ কবিতায় কবির মনে সন্ধে নামে—মনের ঘরে ঢুকে পড়ে একরাশ দলা পাকানো অন্ধকার, কবি Pessimistic হয়ে বলে ওঠেন— ‘‘আমি সেই জন্মবধির, পুরোনো ভঙ্গিতে পোষা দুঃখগুলো খাঁচা থেকে বের করে এনে ময়দানে খেলা দেখাই।’’
মানুষের সমুদ্রে কবি দেখেন ফুলেরা পূর্ণ হবার আগেই চুপচাপ ঝরে যায়। কাঁচের মানুষ কাছে থেকেও এক অদৃশ্য মায়ায় দূরেই থেকে যায়। ব্যথা বাড়ে—এক অমোঘ প্রশ্ন কবির অজান্তেই উঁকি দ্যায় নরম শরীর জুড়ে— ‘‘গর্তভরা শখের কৈ তো নিলেই ; আর কতটা ভাসিয়ে নিতে চাও?’’ (বিসর্জনের রাত্রে)। কিংবা, ‘‘যদি সে ক্ষমতা পায়, তখন কি আমি নিম্নবর্গের দলে ঢুকে/ আত্মবিসর্জনের জন্য অপেক্ষা করব?’’ (মনোকম্পন)। উত্তর কিন্তু অজানা– তবু পাখি গান গায়, প্রেম করে আর মানুষ শব্দ ও লক্ষ্য– দুটোই ভ্রষ্ট হয় বারবার কোন অজান্তেই। এক অমলিন জীবনবোধ কবিকে আবারও আচ্ছন্ন করে—তিনি অর্ফিয়াসের মতো বাঁশী বাজাতে বাজাতে গড়ে তুলতে চান নিজের মর্জিমতো এক ইনভিনসেবল এম্পায়ার যা নিয়ন্ত্রণ করবে, রূপান্তর করবে আগামীর অপেক্ষা, যে কোনো জাদু কিংবা হেলফায়ার— ‘‘দুনিয়ার যত আবর্তন, ঘটতেছে, ঘটতেছে স-ব আমার মর্জিমতো... মরুভূমির মতো বাতাস আমি চিত্রায়িত করেছি; ... আমি নিজেই একটা গোলাপী রঙের আলো।’’ (গোলাপী আলোর শব্দ)। একটা হলুদ পাহাড়ের স্বপ্ন কবির মনকে খানিকটা ভালো করে দ্যায়, তিনি অল্প অল্প Optimistic হতে শুরু করেন, দুহাতে পাহাড়ি ফুল আর শাদা মেঘ ওড়াতে ওড়াতে পার হয়ে যান কোনো এক নাম্নী সম্রাটের ক্ষত-বিক্ষত গণিকার প্রশস্ত গজল। সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়েই তিনি আড়াল করা ঝোলা থেকে, রাতের কফিন থেকে শব্দদের ছাড় দ্যান আকাশ জুড়ে— যেখানে ভিড় করে আসে এ জীবনের সব নিবিড়তা, সংযম আর ডিঙিয়ে যাওয়া আয়ু— “ভাবনার থেকে অধিক, আত্মপ্রেমে কামার্ত হল জল!’’ (কনফিউজড গোলাপ)। তার উড়ানপথে ডানা মুড়ে এসে বসে এক পথভুল করা বাঙালি সেনা, এক অদৃশ্য ঈশ্বরও, ফুলের মতো প্রেমও ঝরে যায়, নুইয়ে পড়ে বিষণ্ণ কার্ণিশে— ‘‘অনাবৃত পরিদের ঘুমন্ত আস্তাবলে ছড়িয়ে যায় রক্তের নীর সুষমা...” (বিষণ্ণ ছুটিবার)
ওই নির্লজ্জ আকাশের পাশে বসে রাজর্ষি কবির মন শান্ত হয়, তিনি সারবত্তা বুঝতে পারেন, ধরে ফ্যালেন কবিতার মূল মন্ত্রটি— ‘‘তোমার চোখ দেখে মরে অন্ধ কুস্তিগীর। সকল গান থেকে খসে যাওয়া/ সুর শুধু পড়ে থাকে, অবসন্ন জলে কিছু ঢেউ খেলে যায়।‘’ (অন্ধ কুস্তিগীর)। সেই জলের উপর কবি নিজের নাম লিখে রাখেন। নাম লিখে রাখেন তার বৈপরীত্যে আজীবন বয়ে যাওয়া অসামান্য এক আবেশী রহস্যের— “কিছু প্রজাপতি বিশ্বাস করবে পৃথিবীকে, তোমার মতো যারা সটান জবাগাছ;/ অথবা শরীরের বুনোপথের নিবিড় পর্যটক।” (জবাগাছ)। কবি অনুধাবন করেন—‘খোঁপাফুল থেকে ঝরে পড়া রক্ষাকবচ জানে মহাপ্রলয়ের সুর।’ (আন্তঃনগর প্রেম)। ফিরে যাবার সময় কবি পেছন ফিরে তাকিয়ে দ্যাখেন বেমানান বাতাসের প্রেমে পড়ে গ্যাছেন। কানে কানে কত কথা তার, চুপি চুপি ভোর নেমে আসে—দক্ষ ও পরিণত জাদুকর কবি তাকে বলে ওঠেন—
‘‘আমি শুধু জন্মকে মৃত্যুর প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতে ভালোবাসি....’’ (বানানবিভ্রাট) আর—
‘‘আমার ঈশ্বর তুমি, ভেতরে সবুজাভ পাট, অথচ আশ্চর্য, তোমারই হৃদয়ে ঘটে বানানবিভ্রাট’’। (বানানবিভ্রাট)
প্রভূত বৃষ্টির সম্ভাবনা মেনে দীর্ঘশ্বাসের দৃশ্য ছাড়াই শান্ত সেই ভোরের আকাশে কবি সাম্য গুচ্ছ গুচ্ছ দ্বিধাহীন পাখিকে আকার দিচ্ছিলেন, ফুৎকারে উড়িয়ে দিচ্ছিলেন তাদের খসে পড়া নেশাতুর পালক। তিনি জানেন প্লানচেটের আত্মারা রাইফেল দিয়ে এই সব পাখিদের হত্যা করে, সেই দৃশ্যকে মনে করে তিনি পাখির মতো দেহের পাশে নিঃশব্দে রেখে দ্যান ওই রাইফেল ... দুজনকেই সমবেদনা জানিয়ে একা মিলিয়ে মিলিয়ে যায় নৈঃশব্দের দিকে—
‘‘এভরিওয়ান ইজ আ ক্রিমিন্যাল...তবে আপেলের গান ভেসে আসছে কোত্থেকে? ... বৃষ্টির আড়ালে!... কেন এভাবে বৃষ্টি এলো?’’ (মহাকোলাহল)। বৈপরীত্যের ভালো-মন্দ, দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে কবি গ্রামীণ সৌন্দর্যকে আঁকড়ে দুচোখ ভরে উঠে আসার আর্তি জানান, শান্ত অথচ দৃঢ়কন্ঠে—
‘‘শিশিরবিন্দু প্রবাহের ধ্বনিজালে আটকা পড়েছি, উদ্ধার মন্ত্র জাগে? খসে যাওয়া নক্ষত্রের ঢেউয়ের প্রতিচ্ছবি আজ নিষ্পত্র ঝরনার বেগে... শূন্য আকাশের মতো কবিকে নির্ভার রাখো...’’ (শিশিরবিন্দু প্রবাহ)। এই হেমন্তে কবিতায় কবির অকপট Confession... ‘‘উঠোনের সমস্ত ব্যর্থতা খুবলে আনা হৃদপিণ্ডের মতো প্রকাশ করা দরকার আজ। উনুনের গভীরতম ক্যানভাস তেকে বের করে আনা দরকার সমস্ত অমুদ্রিত জলের ইতিহাস’’। (এই হেমন্তে)
অসাধারণ শব্দচয়ন ও Simile কবির। অগুনতি ভিন্ন ভিন্ন নিবিড় দৃশ্যের ঝাঁ চকচকে মিউজিয়ামে দাঁড়িয়েও কবি আদিম শ্রমিক, মাটির কাছাকাছি তার বসত। নতুনের শরীর জুড়ে কোথাও পুরোনো লুকিয়ে থাকে অঙ্গাঙ্গীভাবে—‘‘আদিম শ্রমিক আমি মেশিন চালাই।/ মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন/ চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন।‘’ (মেশিন)
তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম— আরো সব কমিউনিস্ট ইনটারন্যাশনাল ভেঙে গড়ে আর পরের দীপ্তিমান কৃষিজাতক মানব। যেখানে ‘Lost of the elan’ বা শেষ ডোডোপাখিটির মতো কবি সাম্য দাঁড়িয়ে অনুভব করেন ফুল ফোটার শব্দ, আদিম এক ব্রহ্মের শাশ্বত অদৃশ্য নীরব উপস্থিতি—‘‘সাইরেন থেমে গেলে পাখিরা ভাবতেই পারে নীরবতা এক অতিমানবিক অস্ত্র বটে।’’ (নীরবতা)। কিংবা, ‘‘বহুদূর মাঠ পেরোলে মেয়েটা জ্বলন্ত মোমবাতি হয়ে যায়।’’ (উদ্ভট চিন্তারাশি)। কবি আবারও ফিরে যেতে চান বৃষ্টিগন্ধা ঠিকানায় যেখানে তামাক ফুলের দেশ কিংবা রসুনের বন উঁকি দ্যায় মৃত্যুর গন্ধ মিশে থাকা বিছানা জুড়ে, ঘুমের সমদর্শী নির্লিপ্ততা ছুঁয়ে–- ‘‘নদীফলের দেশে কতো মেয়ে ঢেউয়ের চূড়ায় ভেসে-চলে গ্যাছে দূর তেপান্তর।’’ (উজ্জ্বয়িনীকে)
কবি জীবনানন্দের মতো এক মায়াবী মৃত্যুচেতনা কবি সাম্যকে আচ্ছন্ন করে— ‘‘পৃথিবী জুড়ে অন্ধকার/নিবিড় অন্ধকার।” (অন্ধকাল) এবং-- ‘‘ঘোর কেটে গ্যাছে পৃথিবীর, গাড়িটা থামাও / আমি নেমে যাবো।’’ (পৃথিবী সিরিজ)। তবু যাত্রা থামে না, নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক সাম্য যাত্রাপথেই লক্ষ্য করেন—‘তীব্র কবিতার মতো নিশাচর পতিতাদের হাস্যোজ্জ্বল কথাবার্তা’, ‘জানলা থেকে উপচে পড়া নাচের মুদ্রা’, কিংবা ‘উজ্জ্বল ঘাসফড়িঙের মতো বিচিত্র রঙের ফোটা’, —লক্ষ্যলাভের জন্য এ অনন্ত যাত্রা, ধর্মযাত্রা। বারে বারে গলিত আমিষ মৃত্যু পার হয়ে এ যাত্রা— ‘‘মৃত্যুকে পিঠে চাপিয়ে ফুলঝুরি বানাচ্ছে বাঘিনী/ ল্যাম্পপোস্ট বনে ছড়িয়ে পড়ছে অবৈধ প্রেতাত্মা।‘’ (ল্যাম্পপোস্ট বন)
‘হাটবাবা’ কবিতায় কবি সাম্য রাইয়ান আরও পরিণত, এক ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষি— “হাটবাবা দ্যাখে মাছি আর মাছে শুধু পাখনাতেই একঝাক তফাত!’’ জরাগ্রস্ত কুয়াশায় ঢাকা জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে কবি অনুভব করেন তার নির্মিত এম্পায়ারের কোনো ব্যক্তিগত আকাশ নেই, নেই কোনো বশীভূত বন্দর— ‘আমার পৃথিবী হোলো উল্টোপালক/ভেঙে তছনছ—শ্রী একাকার !” (পৃথিবী সিরিজ)। কবির চোখে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা আমরা লক্ষ করি—“দুর্গার পায়ের কাছে/ আমি চাই আগুনের তুমুল উত্থান।“ (পাগল হবার সহজ উপায়)। সেই অমোঘ দৃঢ়তা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে কবিতার পরতে পরতে, নরম মিষ্টি সকাল জুড়ে, আগামীর অপেক্ষা জুড়ে—
“পাহাড় থেকে বেরিয়ে আসা সূর্য/ ক্ষিপ্ত হলে রোদের তীব্রতা বাড়ে !/ নাভির ভেতরে তার লুকায়িত বন/ বেলিফুলের ঘ্রাণ, মুখরিত সকালে।’’ (হরিণীর নাভি)। কবি সাম্য বাংলা কবিতার এক বিষণ্ণ জাদুকর, শব্দের নির্লিপ্ত অহংকার। কবি ঝাঁ চকচকে নিয়ন আলোর রাতে দ্যাখেন—“বিষণ্ণ সঙ্গীতের পাশে রেলের পাটাতনে/ শ্রান্ত কবিতার মতো নিস্তরঙ্গ ঢেউটিন থেকেসুরগুলো নেমে আসে মৃদুমন্দ কম্পনে।’’ (ম্যাজিকবক্স থেকে)। কবি সাম্যের হাত থেকে আচমকাই খসে যায় জাদুকাঠি, তার আর রাষ্ট্র হয়ে ওঠা হয়না— “আমরা নির্জীব/ রাষ্ট্রের বাঁদর খেলা দেখি !’’ (শাদাকথা) তবু একটুকরো কৌণিক আলো ছুঁয়ে যায় এই শব্দ-তপস্বীকে। তিনি জানেন সময়ের মায়াবী ট্রেন বিষমাখা তূন লুকিয়ে আড়ালে অপেক্ষারত। তবু কবি সাম্য মরিয়া হয়ে বলে ওঠেন— “শব্দ, ব্রহ্ম, মুক্তি আর তার এলোমেলো/ মগজের টুকরো—/ ছড়িয়ে পড়ে আমাদের মগজময়।’’ (যাপনকাল) এক জিতে যাওয়া বা হেরে যাওয়ার আনন্দে কবির হৃদয় মশগুল হয়। তিনি অল্প আলোয় অলিগলি বেয়ে একা হেঁটে যান পৃথিবীর স্বপ্নান্ধপথে। তার পথ আগলে বুঝি দাঁড়ায় ক্লান্তহীন এক অবাধ্য ভায়োলিনের সুর...এক নাছোড়বান্দা বিষাদমন্ত্র...