❑ ড. প্রবাল চক্রবর্তী
সাম্য রাইয়ান অনেকদিন ধরেই ফেসবুকে আমার বন্ধু হিসেবে আছেন। যদিও কখনো কথা হয়নি, তবুও দূরবর্তী অবস্থানে থেকেও জানতাম সাহিত্যের একজন প্রবল অনুরাগী লেখক তিনি, পাশাপাশি সম্পাদক হিসেবেও বেশ সুনাম রয়েছে তাঁর। আমি সোচ্চারে বলব, এই সময়ে একজন কবি একান্ত বেপরোয়া নাছোড়বান্দাভাবে নিজের কবিতাটা লিখে চলেছেন, তিনি সাম্য রাইয়ান। তাঁর কাব্যপৃথিবী কতটা গভীর ও শক্তিশালী, সেটি সম্প্রতি তাঁর কবিতার বই, ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’ (২০২০) না পড়লে হয়তো জানাই হত না। সত্যি বলতে কি, আমি মুগ্ধ হয়েছি। এই কবি এ সময়ের কবিতায় অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য কাজ করে চলেছেন। আমি দৃপ্তভঙ্গিতে বলব, তাঁর কবিতা কোনো বিশেষ স্কুলিং বা গোষ্ঠীর ছাপ বহন করে না। কবিতার ভাষা ও ভাবনা, বিষয় ও প্রকরণে তিনি স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত। উপস্থিত গ্রন্থটিতে তার নিদর্শন সুপ্রচুর। এটি তাঁর প্রথম গ্রন্থ, যা প্রকাশিত হয়েছে ‘ঘাসফুল’ প্রকাশনী থেকে। ছোট-বড় বিভিন্ন আকৃতির মোট ৪৮টি কবিতা নিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার বই।
শব্দ ও শব্দার্থের খেলায় দক্ষ এই কবি বইটির উৎসর্গ ফ্ল্যাপ ও উৎসর্গ পাতা থেকেই নিজের পারঙ্গমতার পরিচয় দিতে শুরু করেছেন৷ কদাপি অটোমেটিক রাইটিং নয়, অথচ যেন কবিতাই কবিকে চালিত করছে, লিখিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। যেমনটা তিনি ‘উড়ন্ত কফিন’ কবিতার প্রথম ছত্রেই বলেছেন, “আমাকে লিখেছে কেউ, তার পরে বাজারে ছেড়েছে৷” নিজের জীবনকে খোরাক করেই যেন লিখে যাচ্ছেন এই কবি। উল্লেখ্য, বইটির উৎসর্গ পাতায় তিনি লিখেছেন, “সোনামুখী সুঁই থেকে তুমি / চুইয়ে পড় সুতো হয়ে / নিচেই বিদ্ধ আমি / সেলাই হই তোমার সুতোয়৷”
খুবই লিরিক্যাল ফর্মে লেখা এই উৎসর্গ পড়লেই যে শীতল পরশ হৃদয় আলোড়িত করে, তা বলাই বাহুল্য৷ বইটির ভেতরে এরকম অনেক লিরিক্যাল কবিতা আছে৷ কিন্তু যেমনটা ৮০ দশক বা তার পরবর্তী সময়ে সাধারণত দেখা যায় যে, গভীর উপলব্ধিহীন লিরিকের ছড়াছড়ি চারদিকে, দ্বিতীয় দশকের কবি সাম্য রাইয়ানের কবিতা তার একদমই ব্যতিক্রম৷ তিনি এতটাই গভীর অনুভূতির কথা লিখেছেন সহজিয়া ভঙ্গিমায় যা অনেকক্ষেত্রেই প্রচলিত ব্যঞ্জনা ছাপিয়ে নতুনতর এক নৈকট্যের সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম। এরকম শব্দের খেলা, শব্দার্থ নিয়ে খেলা আমরা গ্রন্থভুক্ত কবিতাসমূহের মধ্যে প্রায়শই লক্ষ করি, যা সাম্য রাইয়ানের কাব্যভাষার একটি লক্ষণীয় চরিত্র। অনেক নতুন শব্দও চোখে পড়ে, যা কবিসৃষ্ট বলেই অনুমান করি৷ যেমন: ‘মহুপাড়া’৷
একথা সকলে জানি যে, পাথর শিল্প নয়, কিন্তু পাথরের মধ্যে শিল্প লুকিয়ে থাকে। একজন ভাস্কর পাথরের অপ্রয়োজনীয় অংশকে কেটে ফেলে দিয়ে সেই শিল্পকে বের করে আনেন, তখন তা ভাস্কর্য বা প্রতিমারূপে প্রকট হয়। একজন কবির লেখকের কাজও একই৷ তাকে জানতে হয় কবিতার শরীরে শব্দ স্থাপনের অনন্য গোপন কৌশল৷ শুধু তাই নয়, তাকে আরো বেশি জানতে হয়, অপ্রয়োজনীয় শব্দ কীভাবে বাতিল করে কবিতাখানি এগিয়ে নিতে হবে৷ এক্ষেত্রে সাম্য রাইয়ানের পারঙ্গমতা নজর কাড়ার মতো৷ তিনি মাত্র দুই পংক্তির ‘শিকার’ নামীয় কবিতায় যত বিস্তৃত বিষয় বলে দেন, তাতে অধিক কথার কোন দরকারই পড়ে না৷
“প্রার্থনায় শিকার করো প্রিয়তম হরিণীকে
তার ভেতরে বইছে অনন্ত ঝরণাধারা!”
এই দুই পংক্তি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়৷ এ নিয়ে বিস্তর ব্যাখ্যা করা যেতে পারে যা মাত্র দুই পংক্তির জাদুতে কবি উপস্থাপন করেছেন৷
এই বইটি মূলত মানবের মধ্যেকার বহুবিধ সম্পর্কের বয়ান রচনার একটি কাব্যিক প্রয়াস; এর ভাষাভঙ্গি, স্বর ও শৈলী সম্পূর্ণ নতুন। প্রায় প্রতিটি কবিতায় নিজস্ব মগ্নতার ছাপ স্পষ্ট। চেতনা ও মগ্নচৈতন্যের খেলায় তাঁর কবিতায় ধরা পড়ে কখনো অন্ধকার, কখনো উচ্ছল আলোকধারা। এই বই পাঠকালীন সময়ে কবি সম্পর্কে আরো জানার আগ্রহ থেকে ইন্টারনেটে সার্চ করে তাঁর অনেক কবিতা ও মুক্তগদ্য পাঠের সুযোগ হলো৷ এবং এরই মধ্যে আমাদের আলোচ্য বইটি নিয়ে কবির একটি বক্তব্য আমার নজরে এল, যা আমার পাঠানুভূতিকেই সমর্থন করছে বলে অনুচ্ছেদটি উল্লেখ করছি৷ বইটি প্রসঙ্গে কবি বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিক দেশ রুপান্তর পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “কবিকে আমার কেবলই মনে হয়-জীবনব্যাপী সম্পর্কশাস্ত্র বিষয়ে গবেষণা করে চলা ব্যক্তি। সে নানান সম্পর্ক-প্রাণের সাথের প্রাণের, প্রাণের সাথে প্রাণহীনের, ক্ষুদ্রপ্রাণের সাথে মহাপ্রাণের-সকল সম্পর্ক। এই প্রকারের সম্পর্ক স্থাপন-রক্ষা-চ্ছেদ-বিকাশ বিষয়েই মনে হয় জীবনের সকল গবেষণা। সেই সম্পর্কশাস্ত্রেরই এক রূপ ‘চোখের ভেতরে হামিংবার্ড’।”
এই বক্তব্যের সমর্থনে কয়েকটি কবিতাংশ উদ্ধৃত করছি:
১৷ “বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়৷” (জীবনপুরাণ)
২৷ শীতকাল ব্যর্থ হোক তোমার গ্রীষ্মের কাছে৷” (উষ্ণতায়, উত্তাপে)
৩৷ “বিশ্বাস রাখার মতো কোনো মেশিন এখনো তৈরি হয়নি৷” (তোমাকে, পুনর্বার)
৪৷ “এতো নীল ছড়িয়ে দিলাম প্রেমে, ভালোবেসে৷” (ভাষাহীন)
৫৷ “দূর থেকে দূরে হারালো যে প্রাণময়,/ আমি তাকে… তার সমূহ হৃদয়ে ভ্রমণ করেছি৷” (একে একে একা হলাম)
শুধু তা-ই নয় কবিতার অন্তঃশরীরে ইতিহাস, ভূগোল, রাজনীতি, সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, পুরাণ ইত্যাদির বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার সাম্য-বর্ণিত এইসব মানব-সম্পর্কের ব্যাকরণে নতুন ও নির্ভীক একটি মাত্রাও যোগ করে। যেমন ‘জীবনপুরাণ’ কবিতায় কবি লিখেছেন—
“জীবন বন্দী ক’রে মৌল আঙিনায়
বোকাচন্দ্র ধর্মরথে চেপে অমরত্ব চায়৷
জেনেও জানে না কেন দূরন্ত লাটিম
ধর্মের সীমানা আছে, মানুষ অসীম৷”
খুবই আন্তর্জাতিক সুর আছে সাম্যের কবিতায়। তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত স্বর এতটাই আন্তরিক-মৌলিক যে, আজকের দিনে দাঁড়িয়ে অনেক নামজাদা কবিকে লজ্জা দিতে পারে। দার্শনিক প্রত্যয় আছে তাঁর কবিতায়৷ একজন কবিকে অবশ্যই দার্শনিক হতে হয়৷ সাম্যর কবিতায় দার্শনিক ডিসকোর্সের গভীর কথাও অত্যন্ত সহজ-সাবলীল হয়ে উঠে আসে৷ যেমন—
১৷ “অনেক কলা ঝরায়ে শেষতক বুঝেছি
আনন্দের কোনো মাথামুণ্ডু নাই৷” (বোধিদ্রুম)
২৷ “মনের ভেতরে আছে প্রকৃত শরীর, যাকে কখনোই জানা হয় নাই৷“ (প্রকৃত শরীর)
৩৷ “বিক্রেতার কাছে সকলই সমান, সমমুদ্রার৷” (তুমি ডাকলে না, এলেও না)
৪৷ “ঘুমন্ত মার্বেল, যা ক্রমশ গড়িয়ে যাচ্ছে৷”
৫৷ “এ জীবন, জড়িয়ে বেঁচে থাকা ছাড়া অবশিষ্ট কিছু নয়৷” (লতা)
৬৷ “অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে যাপিত আমাদের প্রতিটি জীবন৷” (জীবনপুরাণ)
তাঁর কিছু পংক্তি, কবিতা এমনই শক্তিশালী যে পাঠকের মস্তিষ্কে নিরন্তর অনুরণন সৃষ্টি করে এবং পাঠকের কল্পনার দ্বার উন্মোচন করে দেয়৷ পাঠক নিজ কল্পনার ডানা মেলে উড়তে পারেন, যখন ‘কবর দেখতে দেখতে’ কবিতায় কবি লিখেন, “চিবুক থেকে উড়ে যাচ্ছে কয়েকটি যুদ্ধবিমান” তখন পাঠককে ভাবতেই হয়, কবির কল্পনার সাগরে ভাসতেই হয়৷ এ ভাসান মহানন্দের৷
পাঠকের চেনা জগত, চেনা কবিতা, চিন্তার জগৎকে উসকে দিতে সক্ষম তাঁর কলম। তাঁর বিষন্নতা, তাঁর নির্জনতা, তাঁর প্রেম এই সময়ের বাংলা কবিতার একটা মাইলফলক তৈরি করছে। তাই সাম্য রাইয়ানের কবিতা আরও ব্যাপকভাবে পঠিত ও আলোচিত হওয়া উচিত বলে মনে করি।