নেশায় চুর এক জেলে: শব্দমাছ তুলে আনেন অবচেতনের বিপজ্জনক সীমা থেকে

❑ ফেরদৌস লিপি 

কবি সাম্য রাইয়ানের ‘হালকা রোদের দুপুর’-এ আপনি ঢুকে পড়ুন—ঘোরলাগা দিগন্ত প্রসারিত জনশূন্য ঘন ঘাসের জঙ্গল পেয়ে গেলেন, হাঁটছেন, শুনছেন— পদশব্দ বা ঘাসমাড়ানো খসখস, পাঠক আপনার মনের তুলোট ত্বকে বিঁধে যাচ্ছে তারই অভিজ্ঞতার প্রেমকাঁটাগুলো। সাম্য— অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর এমন বাস্তব—যেন পুড়ে যাচ্ছে কোনো সিগারেট, আর ধোঁয়ার আকারে জন্মাচ্ছে অবধারিত—কবিতা। কবিতাগুলো যেন উঠে আসে শব্দের পেট চিড়ে মাকড়সা-সুতার মতো মুহূর্তে পাঠককে জড়িয়ে ধরে। এবং ধরেই রাখে, আবেশিত ক'রে ঠিক চিরুনি+কাগজ রিলেশনশিপ—চুম্বকিত ক'রে। তাঁর কবিতা পাঠে ‘অন্য এক জীবন’ বাস্তব হয়ে ওঠে—পাঠকের কাছে মনে হয় যেন— তিনি লিফটের সেই ‘আরোহী’ যিনি নিজেকে ওজনহীন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ এক হোঁচটেই নিজেকে ওজনযুক্ত ‘বস্তুপিন্ড’ মনে করেন আর পুনরায় ফিরে আসেন গতানুগতিক জীবনে, ঐ কিছুকালব্যাপী ধাবমান লিফটে হঠাতই বাস্তব হয়ে ওঠে ভিন্ন এক অনুধাবন, সেই ‘অন্য এক জীবন’ যা এক ওজনশূন্য শূন্যতা। তাঁর ব্যবহৃত শব্দ থেকে শব্দে উৎসারিত ভাবনা পাঠককে তাড়িত করে— যেদিকে ধূপ ও ধোঁয়া উড়ে যায়। আমাদের জানা জগতের বাইরেও নিশ্চিত আরও জগতকে চকিতে দৃশ্যায়িত করে। সাম্যের কবিতাগুলো পক্ব, সহজ এবং গভীর। আছে দার্শনিক আহবান এবং পিছল সূচিমুখ কেবল ঢুকে পড়া যায় ভাবনায় আর ঢুকে যাওয়াটাও অবধারিত কেননা পাঠকের জন্য দ্বিতীয় কোনো উপায় রাখেন না কবি সাম্য। আর শব্দগুলো ধাবমান ক্ষুরের গতিজড়তার মতোই অসাবধানে ভেঙে দেয় সমস্ত সচেতন বোধ পাঠকের। তার কিছু পংক্তিকে আপাতভাবে মনে হতে পারে সম্পর্কহীন কিন্তু গভীরে অব্যর্থ এক টান ক্রিয়াশীল থাকে সবসময় চুম্বকের চূর্ণিত গুঁড়োর মতো। আমাদের স্পৃষ্ট করে, হুল ফুটানো অবশ করা পংক্তি “পৃথিবী এক ঢেউ ভুলে যাওয়া নদী” এ যেন বুঝে উঠবার কিছু নয়,সহজাত ভালো লাগা—অথবা রবীন্দ্রনাথের “কবিতা যতটা বোঝবার, মনে গিয়ে ততটাই বাজবার”, স্তব্ধতা ভেঙে এগিয়ে চলা কোকিলের কম্পিত সুর —আমাদের বোধের ভেতরে পৃথিবীর তরঙ্গময় আদিমতম অবস্থার অনুরণন উঠে আসে। কবির সুপ্ত অতীত ঝলকানির মতো ক্ষনিক সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে পাঠকের চোখের সামনে যখন অনুভবকে অনুবাদ করেন সরল ভাষায়— “পাখি নেই তবু ডানা ঝাপটানো আছে”। কবির কবিতায় উঠে আসছে সুররিয়ালিস্টিক ভাবনার অতিচেতনা— “ডানা আঁকো— সশব্দে ঝাপটাও” সত্যিই যেন পাঠক দূর থেকে শুনে উঠছে ডানার ঝাপট— উড়ে যাচ্ছে রক্ত-মাংসে নির্মিত কল্পনার অবয়ব। কবির কবিতায় আমরা পাই এক ভিন্ন জগতের প্রতিবেশ, ধরলার প্রতি সুতীব্র স্মৃতিকাতরতা। আর এক বিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে সবকিছুই জগতের— অনিচ্ছা সত্ত্বেও কোনো সংগোপন চাপে দূরে দূরে থেকে— তবুও ভেতরে রেখেছে যেন মিলিত হবার এক প্রবল উন্মাদনা—কবির ভাষায় “অনেক মানুষ —যারা হৃদয় ফেলে এসেছে ধরলার জলে, সকলে একত্রিত আজ” —ইন্দ্রীয়জ এমন গোপন অভিজ্ঞতা শেয়ারিংয়ে পাঠকমাত্রই মননে ব্রেকফেইল অভিঘাত নিয়ে আসে।

“তোমার উপশিরা যেদিকে এঁকেছে পথ শুধু সেই দিকে যাবো” এই একটি লাইনেই সৃষ্টির প্রকৃত রহস্য আচমকা বিদ্যুৎ তরঙ্গের মতো কেঁপে ওঠে কিংবা স্মরণে আসে গোপন অঙ্গকে আরও ঘনরহস্যময় করে রাখবার জন্য চেষ্টারত মেরিলিন মনরোর সেই তৎপর হয়ে ওঠা ‘হাত’—যেন ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল বলেই অসতর্ক উদ্ভাসিত হতে যাচ্ছিল-প্রায় সৌন্দর্যের অপার রহস্য—কিন্তু মুহূর্তেই জেগে উঠলো অতন্দ্র হাত! ধরলার পাড়ে বেড়ে ওঠা কবি কী অদ্ভুত কাব্যিক প্রতিভায় শিরা-উপশিরার উপমায় জীবন্ত বয়ে দিলেন প্রিয় নদীকে—কবিতায়। এবং সাগর অভিমূখী ধরলার প্রবাহের অন্তরালে আমরা দেখে উঠি আমাদেরই অনন্ত জীবনপ্রবাহকে। আমরা আরও ইঙ্গিত পেয়ে যাই নদীর প্রতি মানুষের লালিত প্রেম, মানুষের ক্রমবিকাশ আর জীবনইতিহাসের। “আলিঙ্গনরত ঠোঁট আমার আত্মকথা যেন” এখানে কবি তার অস্তিত্বকে স্প্রে করে দিলেন, আমরা পাচ্ছি তুমুল ঘ্রাণ। প্রেমের অনন্ত বিস্তারিত বিক্ষিপ্ত ইতিহাস এখানে পুঞ্জীভূত, যেন জমাট হয়ে আসা স্বতন্ত্র তারাদের ঘনীভূত অবস্থা। কবির ‘আমার’ শব্দটির ব্যবহারে আমাদের অভিভূত হতে হয়, কেননা এই ‘আমার’ তো ডারউইনের প্রথম হয়ে-ওঠা মানুষ থেকে শেষ হয়ে-যাওয়া মানুষ পর্যন্ত সমস্ত মানবমহাবিশ্বকে বোঝায়! মানুষের প্রেম, কাম-সঙ্গম, জন্ম-মৃত্যুকে বোঝায়! জীবনের প্রতি— পৃথিবীর প্রথম জন্মইতিহাস থেকে পরবর্তী শেষ অবধি—অনন্ত অমোঘ টানকে বোঝায়! শব্দের এরকম অনড় ব্যবহার, পাঠক বুঝে যায় পংক্তির প্রতিটা শব্দ কবির বোধ থেকে চুয়ে চুয়ে পড়া, রসসিক্ত, যথাস্থানে স্থাপিত। আরোপিত কিছু নয় কবিতায় খুব সহজেই চলে আসে ইম্প্রেশননিস্ট থিংক— “অনেক সন্ধ্যার আগে জানা হয়ে গেছে ফসলের নির্জনতম সুঘ্রাণ” —সন্ধ্যার অন্ধকারে ঘরে ফেরা পাখিদের মতোই উড়ে আসে মৃত্যুর আভাস। ‘নির্জনতম’, ‘সুঘ্রাণ’ শব্দদ্বয় মনে হতে পারে জীবনানন্দীয় কিন্তু তা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাস্নাত হয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে ব্যবহৃত হওয়ায় পাঠকের কাছে বিশিষ্ট।

এভাবে একের পর এক শব্দ তুলে এনেছেন, ডুবে-ডুবে, কবি সাম্য রাইয়ান— মহাজগতের রহস্যজাল হাতড়ে হাতড়ে নিজস্ব কাব্যিক দক্ষতায়, অভিজ্ঞতা বিশোধিত ভাবনাপ্রতিভায়, শৈল্পিক মনন-কলায় নিবিষ্ট থেকে থেকে—সাধনায় তিনি প্রকৃতই এক জেলে যিনি নেশায় চুর হয়ে আছেন আর শব্দমাছ তুলে আনছেন অবচেতনের বিপজ্জনক সীমা থেকে।

এ আলোচনায় আমি সাম্যের “হালকা রোদের দুপুর” বইটিতে কলোনিবদ্ধ চল্লিশটি কবিতা পরিবারের দীর্ঘ সারি থেকে কয়েকটির উপর বিচ্ছিন্নভাবে ফোকাস করবো। তার আগে, সাম্য সম্পর্কে দু-একটা কথা বলে নেয়া ভালো—তিনি অধুনা দ্বিতীয় দশকের একজন অগতানুগতিক কবি— একারণে যে তিনি স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে কবিতা লেখেন না, তাঁর অবচেতনের গর্ভে সচেতন শব্দের জাইগোট ক্রমে পুনঃপুন বিভাজিত হতে হতে পূর্নাঙ্গ আঙ্গিক বা আকারের এক একটা অবিরল প্রবাহের মতো কবিতার জন্ম হতে থাকে, যেন “জৈব অবয়বের নিয়মানুযায়ী উৎকৃষ্ট কবিতার প্রত্যেকটি প্রতঙ্গ, প্রত্যেকটি কণিকা এক অবিভাজ্য অমোঘ সংঘটনের লগ্নতায় আবদ্ধ” —অরুণকুমার সরকার যেমন বলেছেন। জন্মেছেন নব্বই দশকের ডিসেম্বরে, তিস্তা-ধরলার তীরঘেষা কুড়িগ্রাম জেলায় প্রকৃতির নিবিড় কোলে মাথা পেতে বেড়ে উঠছেন। তিনি মূলত কবি, তাঁর নেশা-পেশা-ধ্যান সবকিছুই কবিতাকে ঘিরে। এছাড়া সৃষ্টিশীল গদ্য লেখেন। পাশাপাশি তিনি ২০০৬ থেকে ‘বিন্দু’ (www.bindumag.com) নামক ছোটো কাগজের সম্পাদক হিসেবে শিল্পসাধনার পরিচর্যায় নিবিষ্ট আছেন। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি বই তাঁর বেরিয়েছে— ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ (কবিতা), ‘সুবিমল মিশ্র প্রসঙ্গে কতিপয়’ (নোটগদ্য), ‘মার্কস যদি জানতেন’ (কবিতা), ‘হলুদ পাহাড়’ (কবিতা), ‘চোখের ভেতরে হামিং বার্ড’ (কবিতা), ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ (মুক্তগদ্য), ‘লিখিত রাত্রি’ (কবিতা), ‘হালকা রোদের দুপুর’ (কবিতা)। ব্যক্তিগতভাবে কাছ থেকে তাঁকে জানবার সুযোগ হয়েছে আমার। কবিতার জগতে তাঁর বিস্তৃত বিচরণ আমাকে অবাক করে, এতটা এই তাঁর এত অল্প বয়সে (অনুর্ধ্ব তিরিশ)! যদিও কবিতার ইতিহাসে এসব বয়স-টয়স ব্যাপার কিছু না তবুও বিষ্মিত হতে হয় নতুন কোরে। সাম্য তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা থেকে কবিতা লিখে যান, দেখেছি চায়ের স্টলে বসে বা ধরলার পাড়ে বসে চলতি খোঁশগল্পের ভেতরও চলছে তাঁর নিউরণে কবিতার ক্রিয়া, মোবাইলে লিখে চলছেন কবিতা, পাঠ করে শোনালেন আবার গল্পে ফিরে এলেন! এবং সেসব কবিতা আসলে কবিতাই! এ কারণেই যে “সূক্ষ্ণ মাত্রাতিরেকের সাহায্যে কবিতা বিষ্ময় জাগাবে” এবং মনে হয় তা আমারই (বা যোগ্যতর পাঠকের) “মহত্তম চিন্তার শব্দরূপ”।

‘হালকা রোদের দুপুর’ এর কবিতাগুলোয় কবি তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা, কল্পনা, আর মননের এক জটিল বুনটকে স্পষ্ট আর সহজ সংঘবদ্ধতায় চিত্রিত করেছেন। কবির ভাবনাসমূহকে পদ্য নয়, ‘গদ্য’ই তাঁর সাবলীল ও সচেতন অনায়াসে নিজের করে নিয়েছে, যেন কবির নয়, এ দায় ছিল গদ্যেরই নিজের। কবিতাগুলো পড়তে পড়তে শঙ্খ ঘোষের একটি কথা আমাদের মনে হতে পারে: “এমনি এক ঘুমের এই কবিতা, এক অবচেতনের, যে অবচেতন থেকে জেগে ওঠে প্রবহমান মহাসৃষ্টির সঙ্গে নিজের লীনতার মুহূর্তজাত এক প্রগাঢ় অভিজ্ঞতা।”

পাঠক, এরকম এক উদাহরণ এখানে তুলে দিচ্ছি—
“মিনিবাসে চেপে। দুপুর রঙের মিনিবাস। কতোটা বাড়ছিলো বেলা— মনে নেই। ঝলসে যাচ্ছিল বাস— ছালছাড়ানো মুরগির মতো। বিহ্বল মেহগনি গাছের পোশাক। কোথাও দু-একবার ভুলবশত ফুটে ওঠা রোদে দেখা যায়, যেন চকমকি পাথর বিশেষ৷ সারিবদ্ধ পেতলের সানকির মতো ঠোকাঠুকি লাগে— জ্বলে ওঠে আদিম আগুন। এই সুর পরিচিত। এই পথ সকলের চেনা। যার পাশে বয়ে গেছে তুমুল হর্ষধ্বণি আর বেনামী যৌবন।”
(হালকা রোদের দুপুর–চার)

কবি বলছেন— “দুপুর রঙের মিনিবাস”, সময়টাই কি মিনিবাস? যার রংটা দুপুর রঙের (কমলা রং?)।সময়টা ধাবমান, সত্যি তো! মিনিবাস দৌড়চ্ছে, একটা গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছে। ভেতরে নিয়ে সব যাত্রী, সমস্ত জগৎ! তাদের সমস্ত যাপন অধীর এক অপেক্ষায়, গন্তব্য যেদিকে…। কবি নিজেও এক যাত্রী। সমস্ত চারপাশটাই গড়িয়ে যাচ্ছে, মিনিবাস, যাত্রী, ধাবমান—গলে গলে পড়ছে গতি। মনে পড়ে দালির সেই সময়-ঘড়ি “দ্য পারসিসটেন্স অব মেমরি”র কথা। সবকিছু মেনে নিয়েই কবি বসে আছেন এক মহাকালের মুখোমুখি, অধীর অপেক্ষায় তো আমরাও অর্থাৎ সমস্ত জগতই। এবং বাইরে তাকিয়ে আছেন কবি বাসটার জানলা দিয়ে, দেখছেন আবহমান পরিচিত পৃথিবী-জগৎ সময়-বাসের সাথে সাথে তাল মিলিয়ে দৌড়চ্ছে কিভাবে সবকিছু বদলে যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে যেতে যেতে, বেলা বাড়ছে ভেতর ও বাইরের রঙ পরিবর্তিত হচ্ছে, সবকিছুকে পেটের ভেতর নিয়ে দ্রুত ছুটছে কবির “দুপুর রঙের মিনিবাস” অর্থাৎ সময় স্বয়ং। যদিও সময়ের ভেতর-বাহির বলে কিছু নেই—সেই সুপরিচিত লাইন বারন্ট নর্টনের— “Time present and time past are both perhaps present in time future” অথবা দ্য ম্যাজিক মাউন্টেনের “Time has no divisions to mark its passage,there is never a thunder-storm or blare of trumpets to announce the beginning of a new month or year. Even when a new century begins it is only we mortals who ring bells and fire off pistols.”

তবুও অভূতপূর্ব ধীশক্তির দ্বারা কবি সময়কে দুপুরের রঙে চিত্রিত করেছেন, একটা নির্দিষ্ট আকারে সময়কে দৃষ্টিগ্রাহ্য করতে চেয়েছেন।
বিহ্বল মেহগনি গাছ, এবং গাছের পোশাকের কল্পচিত্রে কবির অভিনবত্ব দেখি। এবং পেতলের সানকির মতো ঝলকিত দেখে ওঠা সারিবদ্ধ গাছ, অদ্ভুত!

আগেই বলেছি কুড়িগ্রামের নিবিড় ছায়াঘন কোলে বেড়ে উঠেছেন এই কবি। এখানকার নদী, গ্রাম, মাঠ, প্রান্তর কবির পরিচিত। প্রকৃতির এইসব প্রশান্ত পথে আর দৃশ্যের ভিড়েই যেন কেটে গেছে কবির শৈশব-কৈশোর। আর ধাবমান “দুপুর রঙের মিনিবাসের” মতো যৌবনও চলমান। এখানকার আলো, বাতাস, জল শুষে নিয়েই কবি বড় হয়ে উঠেছেন। এক্ষণে স্মরণে আসছে সার্ত্রের “ফেসেস” গদ্যের কথা। যেখানে মানুষের শরীরকে তুলনীয় করছেন তিনি ব্লটিং পেপারের সাথে। ব্লটিং পেপার যেমন কালি শুষে নেয়, মানুষের চোখ-কান-নাক-ত্বক তেমনই শুষে নেয় তাপ, আলো, বাতাস, শব্দ, জল! তাই এসব আবহাওয়া, জলবায়ু কবির অস্তিত্বে মিশে আছে। কিছুতেই তিনি ভুলতে পারেন না সেইসব ফেলে আসা চনমনে রোদ আর দুপুর:

“চনমনে রোদে সেলাই করছি জুতো। পুরনো মহিষের আহামরি চামড়া। মুছে যাচ্ছে নাম। একা ঝরে যাচ্ছে হালকা রোদের দুপুর। এখান থেকে দেখা যাচ্ছে হোসেন খাঁ পাড়া গ্রাম। না গিয়েও মনে হয়, পৌঁছে গেলাম সূর্য মাথায় করে। নিবেদক কেউ ছিলো না, গানগুলো পোস্ট হয়ে গেছে। তুমি কিছু পোস্টকার্ড দিও জিপার ভাঙিয়ে। হারানো মেটাফোর খুঁজে ফিরিয়ে দিও ক্রুশবিদ্ধ নারীদের নামে৷”
(হালকা রোদের দুপুর–আঠারো)

এর অন্তর্বস্তু আসলে কবির নিঃসঙ্গতা আর স্মৃতিচারণ। বোর্হেস তাঁর ‘Everness’ অর্থাৎ ‘নিরন্তর’ কবিতায় যেমনটি বলেন: One thing does not exist: Oblivion. বিস্মৃতির কোনো অস্তিত্ব নেই, কেননা মহাবিশ্বই একটি স্মৃতি, একটি চেতনা। আমরা মহাবিশ্বের অংশ, আমরা নিজেই মহাবিশ্ব, এবং সেই স্মৃতি ও চেতনার অভিব্যক্তি আমরা।

সাম্য কবিতায় তুলে আনেন তাঁরই ইন্দ্রিয়লব্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা, অত্যন্ত সচেতন থাকেন সেই সৃষ্টির সময়। তাঁর অবচেতনের স্পেস ঢেকে দেন সচেতনতার মোটা আবরণে। এবং বিষয়বস্তু থেকে যারপরনাই নিজে থাকেন দূরে। আমাদের মনে পড়তে পারে “অবজেক্টিভ কোরিলেটিভ” এর কথা।যেখানে ব্যক্তিক আবেগ চিরন্তনতা পায়। আর এরকম ব্যক্তিক আবেগ বা কল্পনা মিশে যায় নৈর্ব্যক্তিকতার সাথে, বুদ্ধি বা প্রতিভার ঘন আড়ালে। এই কবি এভাবে চিরন্তনতার মোড়কে পাঠকের চোখের সামনে তুলে ধরেন দৃষ্টিগ্রাহ্য আবেগ যা তাঁরই মূহুর্তের অভিজ্ঞতাজাত:
“দগ্ধ হচ্ছে বন, আর তুমি ডুবে যাচ্ছো। এ কেমন ঋতু! তীর্থবনে—কৃষকের মৃত্যু ফুটে আছে রক্তিম কাঁটায়। ধ্বণিহীন, শোকবার্তার কাছে দৈব অনুরোধ, অনির্বাণ প্রেমিকার মতো জড়িয়ে দাও ফসলের ক্ষেতে। যা কিছু উজ্জল মোড়কে, ঘ্রাণযুক্ত স্মৃতির পোশাক, খুলে, নগ্ন করে দাও। ঋতুর পাশে নদী। বালু তোলার শব্দ। কৃষকের সমাধিতে রোপন করো দূরাগত ফসলের ঘ্রাণ। তারপর যথারীতি কান্নার দিকে যাও। নিজস্ব চোখের কাছে হাত পেতে ডাকো মেঘমল্লার, বর্ষার মৌসুম।”
(হালকা রোদের দুপুর–তেইশ)

পৃথিবীর সব দেশের কবিতায়ই চিত্রকল্প এক বিরাট জায়গা দখল করে আছে। আমরা ইমেজিস্ট শিল্প আন্দোলন সম্পর্কে সবাই অবগত। ফরাসি ও ইউরোপীয় ইমেজিস্ট চিত্রশিল্পী ও কবিদের জানি।চিত্রশিল্প এবং শব্দশিল্পে মূর্ত-ইমেজ মানুষের অনুভূতিকে সহজেই কাঠামোয় রূপ দিতে পারে।এক্ষেত্রে এজরা পাউন্ড যেমন বলেন: “An ‘image’ is that which present an intellectual and emotional complex in an instant of mind” আমরা আমাদের জীবনানন্দকেও জানি ইমেজের নৈপুণ্যতায় কতটা সিদ্ধহস্ত! আলোচ্য এই কবির কবিতায় নিখুঁত চিত্রময়তায় পাঠকের সামনে দৃশ্যের পর দৃশ্য জীবন্ত হয়ে আসে। এবার এইরকম একটা কবিতা পাঠকের সামনে তুলে দিচ্ছি—

“দুপুরে বর্ষা এলো, মধ্যরাতে ফের। জলের তলে অবাক পাহাড়, বিম্বিত বুঝি- নাচে, দুলে দুলে ওঠে পাহাড়চূড়ার ফুল! এমন আনন্দ থেকে দূরে সরে যায় স্মৃতির ঈর্ষা, কিছুটা নির্ভার তবু স্বাদের আড়ালে। পুরনো বনের অধিক সবুজ সমুদ্র বুকে; ঝাঁকে ঝাঁকে ঢেউ লাজুক ভঙ্গিতে নেচে ওঠে আর বাতাশের সুরে কথা কয়। কিছুটা ঈর্ষা আমাদের বাগানবাড়িতে পোঁতা ছিল। ঘঁষা কাচের মতো প্রেম চলে এসেছিলো নদীর ছন্দে, উদ্বাস্তু পাতার অধিক।”
(হালকা রোদের দুপুর–ত্রিশ)

সাম্য তাঁর পূর্বসূরিদের সকল সম্পদ যেন আত্মসাৎ করে নিয়ে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলবেন অর্থাৎ নিজস্ব কবিতার সাম্রাজ্য—এরকম একটা দুর্দম্য আকাঙ্ক্ষা নিয়েই কবিতার ভূগোলে এসেছেন।সবকিছু ভেঙ্গেচুরে শুরু করতে চান তিনি নতুন করে। তাঁর শব্দ, ছন্দ, ব্যঞ্জনা, আঙ্গিক, ভাষা এবং ভাব আমাদের সেরকম করেই ভাবায়; আমাদের চমকিত করে, আনন্দিত করে, প্রবহমান সময়কে যেন অবরুদ্ধ করে, একটা অবিচ্ছেদ্য সূতায় গেঁথে রাখে অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। আমরা অনুভব করতে থাকি এমন কিছু যা আমাদের চিন্তার সীমাকে অতিক্রম করে যায়। যেন একটা সাংগীতিক সুর ভেতরে খেলে যায়; সুতীব্র, অবিচ্ছেদ্য প্রবাহের মতো আমাদেরও সাথে নিয়ে চলে যায় কিন্তু একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আমাদের কাছে সেই সুর আর বোধগম্য নয়, তবু আমরা ভেসে চলি, চলতে হয়। যেরকম লেখেন এই কবি:
“কাঠ চেরাইয়ের শব্দ ভেদ করে ফুটে ওঠে দুপুরের রোদ। মাথা তুলে উঁকি দেয় শস্যদানা, প্রান্তরাভার তলে। কিছুদিন আগে নিহত শিশুদের দেখা হলো কমলা রঙের সাথে। সেই শিশু, যারা যীশুর ন্যায় বিস্মিত হন্তারকের ভালোবাসা পেয়েছে। মর্মরধ্বণি শুনেছে দমকা হাওয়ার গর্তে। তুমি বলো দু-একটা
সত্যের ঘূর্ণি- দেখাও অলৌকিক ডানা। পৃথিবীর কাছে সকল অনুভূতি জাগতিক আবর্জনা। সকাল অব্দি তার আয়ুর গৌরব। কী ভীষণ ধারালো, তবু মৃত্যুর দাসত্ব। দ্যাখো এইবার দুপুরের রোদ।”
(হালকা রোদের দুপুর–চৌত্রিশ)

ঠিক এরকম কিছু ভেবেই মোৎসার্টকে নিয়ে হয়তো কিয়ের্কেগার্দ বলেছিলেন একবার: “If ever Mozart become wholly comprehensible to me,he would then become fully incomprehensible to me.”

অনুভব কতটা তীব্র হতে পারে! কতটা সংবেদনশীল হতে পারেন কবি, প্রশ্ন থেকে যায়। অবচেতনের কতটা গভীর থেকে উঠে আসে অনুভবের সিসমোগ্রাফিক তরঙ্গ আর সেই কেন্দ্র থেকে ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে বোধের সচেতন ত্বকে আমাদের—সাম্যের কবিতা পাঠে কিছুটা তার আঁচ করা যায়।
এসব অনুভব আসলে অন্তহীন গন্তব্যের দিকে ক্রমে প্রসারমান। এসব অনুভবকে বলা যায় প্রকৃতির আদিমতম মৌল উপাদান। এসব অনুভব যেন নৈঃশব্দে গড়া, ব্রাক বা পিকাসোর বর্ণপ্রাচুর্য্যে ভরা উজ্জ্বল চিত্রপট। কবিতার এরকম পংক্তি কখনো নির্মাণ নয় এসব কবিরই মৌলিক সৃষ্টি। সাম্যের কবিতার অংশবিশেষ:
“আমাকে বহন করো নখের মতো, বেড়ে ওঠার যত্নে। উর্ধ্বশ্বাসে বেরিয়ে পড়া এই নভোযান, মেতে উঠেছিলো শব্দে। গন্তব্যের ছায়ায় পেয়েছিলো কোমল পানীয়, বিশুদ্ধ আহার। সবুজ পত্রালি, অপূর্ব ইচ্ছের দিগন্তে কারো খাদ্যকষ্ট নেই৷ নিবিড়তম গাছ উপচে পড়ছে ফলে। ফলাহার অনুভব করো৷”
(হালকা রোদের দুপুর–সাইত্রিশ)

বোদলেয়ার প্যারিসে একবার এক চিত্রপ্রদর্শনীতে ভবিষ্যতের শিল্প সম্পর্কে বলেছিলেন যে— “He will be truly a painter, the painter who will know how to draw out of our daily life, its epic aspects and will make us see and understand in colour and design, how we are great and poetic in our neckties and polished boots.”
একথা যেকোনো ভালো বা মহৎ শব্দশিল্পীর বেলায় খাটে মনে করি। আলোচ্য এই কবি যখন শব্দরঙে কবিতার ক্যানভাস আঁকেন আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই প্রতিচ্ছবি দেখে উঠি যেখানে দৃশ্যমান থাকে জীবনের মহান কাব্যময়তা কিংবা সচেতন পাঠক পিকাসোর “বেতের চেয়ারে স্টিল লাইফ” ছবিটিকে একবার ভাবুন আর ঐ তাতে আঁকা ফরাসি পত্রিকাটির কথা ‘JOU’—যেন প্রবহমান নিত্য জীবনেরই টুকরো প্রমাণ। এবার সাম্যের কবিতা থেকেই এমন এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ আমরা পড়ে নিতে পারি, যেখানে দেখা যায় কবির নিত্য জীবন হয়ে উঠছে আমাদেরই আবহমান জীবনের কথকতা:
“মিছেমিছে। খেলনা বাড়ির গ্রাম। বৃহৎ পরিখা ঘিরে সুরভর্তি গাছ। যেটুকু বিকেল, সেটুকুই ঘুম। ফিরে আসা সকলের নয়। তবুও সন্ধ্যা-ভোরে তৈরি হচ্ছে বাড়ি। ধর্মচ্যুত নুড়িপাথর একের পর এক, সারিবদ্ধ- বেলোয়ারি জীবনের পরে নতুন আশ্রয়ে বাঁচে বিপুল সঙ্গমে। শস্যহীন ময়দান চাপা পড়ে মহাজীবনের ভারে। প্রার্থনায় উর্দ্ধমুখী হাতে হেমন্তের দাগ। ডালিম ফোটার মৌসুমে হারিয়ে ফেলা দুপুর ভীষণ
যৌনকাতর।”
(হালকা রোদের দুপুর–আট)

অন্য একটি কবিতার অংশবিশেষও দেখা যাক:
“যে রাস্তাটা চলে গেছে রিভার ভিউয়ের দিকে, আমি তার পাশে উবু হয়ে বসি। হাওয়ায় গল্প বলে সিগারেট ধরাই। মনে হয় রাত। জানি না, আসলে কি রাত? খোশগল্প করি বেহুদা কুকুরের সাথে৷”
(হালকা রোদের দুপুর–পঁয়ত্রিশ)

কবির যাপিত জীবন অবশেষে ভাগফলে নিয়ে আসে সংখ্যাঘন বিষাদ, ‘হালকা রোদের দুপুর’ যেন কবির অতীত জীবনস্মৃতির ত্রিমাত্রিক ল্যান্ডস্কেপ। এবং ক্রমশ তা ধূসর হতে থাকা চলচ্চিত্রের রিলে ফিল্ম। কবি মনে আসে মহাকালের মরচে ঘষে তুলতে না পারার ব্যর্থতা, ভয় আর হতাশা; যা পাঠক মনে সহজেই সঞ্চারিত হয়। আমাদের মনে পড়তে পারে বার্গম্যানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘সেভেনথ সিল’ এর কথা। যেখানে নায়ক জীবনের অর্থ খুঁজে চলে অবিরাম, এই এক ঘেয়ে জীবনের অর্থ কী?ঈশ্বরের নীরব থাকার প্রতি রুষ্ট হয় সে। সে চায় ঈশ্বর থাকুন, একটা আশ্রয় চায়,কিন্তু ঈশ্বর কেন এসে দেখা দেয় না, এর জন্য সন্দেহও হয় তার, জীবনের প্রতি সে হতাশ হয়ে পড়ে, তবুও বাঁচতে চায় ঈশ্বরকে কাছে পেতে চায়, জীবন নামক প্রশ্নের উত্তর চায় শেষ অবধি, সে মৃত্যুকে বিলম্বিত করবার জন্য মৃত্যুর সাথে দাবা খেলে তাকে হারিয়ে দেয়।এবার সেরকম একটা কবিতাই আমরা পড়বো পাঠক যাতে আছে জীবনঘনিষ্ট প্রশ্ন, ভয়, হতাশা— এই কবির অন্তর্গত জগতের:
“ব্যর্থ কামানদাগানোর মতো তুমিও চলে যাচ্ছো ক্রুর হাসির ভেতর। কখনো আহত শব্দ, এই ফিরে আসা কেবল নিজস্ব কল্পনা। লেপ্টে থাকা বিকেলে কেউ বুঝি গেয়ে ওঠে গান। দ্রিম দ্রিম ডাকে দূরের ড্রামার। তবুও কীভাবে ঘুম বিষাদবিকেলে? চলচ্চিত্র দ্যাখো নাগালের জানালায়, অনেক সবুজ আর নিশ্চুপ আকাশ। আনমনা দিগন্তে শুধু উজ্জল তোমার পত্রালি, চিরহরিৎ চোখের পালক। আগের দিনের মতোই, বিকেলকে গড়িয়ে যেতে দাও আরো কিছুদূর।”
(হালকা রোদের দুপুর–চল্লিশ)

বইটিতে সাম্প্রতিকতম ভাষা কবিতা বিষয়ে সাম্যকে পুরোপুরি সচেতন দেখা যায়। বিষ্ময়কর শব্দখেলা খেলেছেন। এবং যুক্ত শব্দের প্রয়োগ, সম্পূর্ণ দুটি আলাদা শব্দের মধ্যে সংযত সমন্বয় এনেছেন।যদিও ষাটের দশকের বাংলা কবিতায় এরকম প্রচুর যুক্তশব্দের ব্যবহার আমরা দেখতে পাই। সবচেয়ে ভালো দিকটি হলো সেসব যুক্ত শব্দ সাম্যের মৌলিক সৃষ্টি। সেসব শব্দের সাথে কেবল তাঁরই প্রথম হয়ে উঠেছে বোঝাপড়া এমনকি নিশ্চিতভাবেই সেসব শব্দের জন্ম দিয়েছেন সাম্য তাঁর রহস্যময় ‘কল্পনা প্রতিভা’র দ্বারা। যেমন: ‘প্রকৃতিপুরুষ’, ‘চিত্ররথ’ যেভাবে ব্যবহার করেছেন উদ্ধৃত কবিতায়, পাঠক মোহিত হবেন পাঠ করুন অংশবিশেষ:
“উড়ছে শ্যামশোভা। সূর্য তাকে খুঁড়ে খুঁড়ে জাগিয়ে তুলেছে। ভ্রমনবিলাসীর সাথে, তুমি নাও স্নেহের পোশাক। অধিক আনন্দে প্রকৃতিপুরুষ— ফুটে আছে বাগানের গাছে গাছে। সকল সঙ্গে, ব্যক্তিগত দিনে দেখেছি চিত্ররথ।”
(হালকা রোদের দুপুর–ষোল)

কখনো এরকম মনে হতে পারে যে সাম্যের কবিতা পাঠে—তাঁর অবচেতনের অবিরাম সংযত ও বুদ্ধিস্নাত প্রবাহে আমরা ভেসে যাচ্ছি কিংবা আমাদের রক্তের গভীর উত্তাপে আরও বুদবুদ উঠে যেতে থাকে, নিরুপায় হয়েই কি বলবো সেসব তাঁর spontaneous overflow of powerful feelings বা আরও একটু এগিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেন “ভেতর দিকের মননজাত অভিজ্ঞতা”, যা দ্বারা আমরা অবিরত তাড়িত হই! অথবা কবিতা পাঠে “কখনো কখনো মোমের মতন যেন জ্বলে ওঠে হৃদয়” পংক্তিতে পংক্তিতে কবির সেই হৃদয়ের স্পর্শ আমরা পাই। আদতে কবিতার তো কোনো ব্যাখ্যা হয় না। কবিতা সয়ে যায় হৃদয়ে, মনে। এবং এ-ও তো সত্য যে কবিতা হয়েও ওঠে, কবিতার আছে শরীর আছে রক্ত, আত্মা। কবিতার আছে শ্বাস ও প্রশ্বাস; জন্ম আছে, আছে মৃত্যু, আবার মৃত্যুহীনতাও আছে, কবিতার নিজস্ব এক অনুভব আছে। প্রকৃত কবিমাত্রই বুঝতে পারেন কবিতার জন্মকালীন ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া— “কোনো একটা মুহূর্ত—তাঁর সমস্ত শরীর যেন দ্রব হয়ে আসছে, শরীরের মধ্য থেকে জেগে উঠছে ঊর্মিমালার মতো একটা ছন্দস্পন্দ—অদৃশ্য, অলক্ষ্য ছন্দবিদ্যুৎ—অথচ কোনো ভাবনা বা শব্দ দেহ নিয়ে আসেনি তখনও তাঁর চেতনায়” যেমন যথার্থই বলেছেন রবার্ট ফ্রস্ট। আমরা লক্ষ্য করে উঠবো সাম্যের কবিতা হয়ে ওঠার পেছনে সেরকমই এক অলক্ষ্য অবচেতনের অবভাস, সংগোপন নড়াচড়া শব্দভ্রুণশিশুর:
“নিরালা দাঁড়াবার অপার সম্ভাবনা— ক্রমশ সুদূর! বিশুষ্ক ঘাসের প্রান্তরে চৈত্রের শিশুটির সাথে সুগোপন আয়োজন...। আরো বেলা হবে— সঘন নিবিড়। তবে কি শুধুই শব্দরাগ, সবুজ ঘনঘোরে তুলে নাও কিছু আলোফুলের ঘ্রাণ। স্নানের জল
তোলা হলে, এই মহাভারত, চিত্রশোভাময়, হাওয়ার ঢেউয়ে কেঁপে ওঠে চাঁদ, কিছুটা মেঘের আড়াল। প্রেমের সকল গান মোহ-আরক্তিম, অগ্নিগামী! পরম অগ্নি তফাতে একক পুরুষ রঙ হয়ে মিশে যায়। নিশুতিতে, বৈষ্ণবীর গানে আশব্দ ফিরে
এসো, বাইনোকুলারে চন্দনা নদীর মতো, ঘনঘোর রসকলি, প্রমুখ উদাস। চকিতে উন্মোচিত রাত বৃষ্টির অবসরে সহসা নিরুদ্দেশ৷”
(হালকা রোদের দুপুর–পনের)

নদীঘেরা এক মফস্বল শহরে বেড়ে ওঠা এই কবি নদ-নদীকে যে অস্তিত্ত্বে ধারণ করবেন সেটাই স্বাভাবিক। তিস্তা, ধরলা বা ব্রহ্মপুত্র নদের দু'পাড়ের দৃশ্য আর উত্তাল নদী-জীবন দেখে দেখে তিলে তিলে যার জীবনকে বুঝে ওঠা তিনি তো নদীকেই নিজের প্রতিরূপ ভেবে নিবেন। একজন কবি যখন কবিতা লেখেন তাঁর সমস্ত পারিপার্শ্বিকতা, পৃথিবীতে তাঁর কৌণিক অবস্থান এমনকি সমস্ত জগতকেই নিজের শরীর বা কল্পিত আত্মার বিন্দুবিসর্গের সাথে ওতোপ্রোতোভাবে গুলিয়ে নিয়ে এক এক করে শব্দ তুলে নিয়ে আসেন ধূলিধূসর অতল অচেনা গহবর থেকে, তারপর অবিরাম লিখে যান— যেরকম সাম্য লিখছেন:
“নাবিকের নিজস্ব বাগান। সমদ্বিবাহু গাছের আকারে- জলের একান্ত সাইরেন। অতলে নেমেছো তুমি- কামিনী ফুলের সন্তান, তাকাও তাকাও চোখ বড় করে ফুলবতী মায়ের দিকে। পরিচিতি নদের কিনারে, প্রতিচ্ছবি আলো হয়ে আছে৷”
(হালকা রোদের দুপুর–ছয়/ অংশবিশেষ)

নদীই কি নাবিকের “নিজস্ব বাগান”? যেখানে নাবিক নিঃসঙ্গতা ঝরিয়ে অজস্র ঢেউয়ের পরিচর্যা করেন। ঢেউগুলো ক্রমান্বয়ে বেড়ে ওঠে, দৈর্ঘ্যে, প্রস্থে, পরিধিতে বৃক্ষের মতো আকাশে নয়, তীরে— মাটির সাথে ঢেউয়ের-জীবন-স্পন্দন বিলীন হয়ে যায়, এ বিলীনতা যেন কবির—কবিতার ঐ নাবিকের। নদীর ঢেউয়ের ভেতরেই কবি খুঁজে চলেন নিজের হারানো প্রতিচ্ছবি আর “সব ভালো কবিতাই তাই নিঃসঙ্গ একক” হয়ে ওঠে আমাদের কাছে।

‘দুপুর’, ‘নদী’, ‘রোদ’, ‘বর্ষা’, ‘গান’, ‘সুর’, ‘নাবিক’, ‘বাড়ি’, ‘গ্রাম’, ‘শরীর’, ‘গাছ’, ‘তীর’, ‘সঙ্গম’, ‘যৌনতা’, ‘জীবন’, ‘জল’, ‘শস্য’, ‘সিগারেট’, ‘ফুল’, ‘ঘুম’, ‘আহার’, ‘বাগান’, ‘পাতা’, ‘পাহাড়’, ‘ঘোড়া’, ‘জন্ম’, ‘ক্ষত’, ‘উল্লাস’, ‘প্রেম’, ‘হাঁস’, ‘কৃষক’, ‘ফসল’, ‘মদ’, ‘পোস্টকার্ড’, ‘প্রজাপতি’, ‘পঙ্গপাল’ ইত্যাদি প্রচুর
ক্লূ-শব্দ কবিতার জট খুলে নিতে কিছুটা গাণিতিক সূত্রের মতোই সহায়তা করেছে। আমরা এসব পরিচিত শব্দের ভিতর দিয়েই আমাদের দৈনন্দিন জীবনচিত্রগুলো অতিক্রম করে যাই—সকাল থেকে দুপুর, বিকেল থেকে রাত,আবার একঘেয়ে আবর্তন—এই তো জীবন, এই তো নিরবিচ্ছিন্ন সময়। ‘হালকা রোদের দুপুর’ সামগ্রিকভাবে এভাবেই আমাদের নিজস্ব জীবনের খতিয়ান মেলে ধরে আমাদেরই সামনে, সমস্ত জগতের সাথে জীবনের এক অবিভাজ্য অমোঘ সংযোজনকে দেখে নিতে দূরবীনে যখন চোখ রাখি আমরা তখন প্রত্যেকেই এক নিঃসঙ্গ দর্শক, “যৌথভাবে একা”—দেখে উঠি আল্টিমেটলি আমাদেরই একলা জীবন, জীবনের দূরতম এক আবছা ভূগোল:

“আপেল স্বাধীন নয়, যৌথভাবে একা। নিহত দুপুরের পরে নদী থেকে উঠে আসে বালু, অবৈধ উপায়ে। গান ছেড়ে নেমে আসে ফুল নয়নতারাবনে। ফুটে উঠেছিলো তারা ভুতুড়ে পাঁচিল  ঘেষে, আগামী আশায়। আমার থেকে কিছু আলোবাতাশ হাতে তুলে নাও। হালকা রোদের কাছে বসো। এই পাতাঝরাশব্দ— সেও তো নিখুঁত জ্যামিতি। আমার রঙজ্বলা চুলের মতো ছন্দহীন নয়। সে অন্যরকম ভালো, আকর্ষণীয় ঘুমের ভেতর।”
(হালকা রোদের দুপুর–আটত্রিশ)


যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *