সাম্য রাইয়ানের কবিতায় মৃত্যুচেতনা

❑ ড. অনিন্দ্য রায় 

“মৃত্যুকে নেমন্তন্ন করে
দরজা আটকে বসে আছি৷

চারিদিকে শুধু মানুষ৷
বাড়ির মোড়ে মানুষ
বাজার ভর্তি মানুষ৷
গোরস্থানে মানুষ আর
হাসপাতালগুলো ফাঁকা৷”
(ফুলকুমার/ সাম্য রাইয়ান)

মৃত্যুকে নিমন্ত্রণ করে আবার তারই পথ রুদ্ধ করে তার সাথে মশকরা করতে পারে তাকে ঠেকাতে পারে সাধ্যি কার? আমাদের সবল অগ্রাহ্যের পরেও তো দুয়ারে দাঁড়িয়ে থাকে চিরায়ত নাছোড়বান্দা মৃত্যু। যিনি মৃত্যুকে অনায়াসে আত্মস্থ করতে চান স্বাভাবিক ভঙ্গিমায়, কবিতার বুকে বসত গড়ে তুলে আনতে পারেন সময়ের নানান অসঙ্গতি, তিনি কবি সাম্য রাইয়ান। শব্দের কারিগর মানেই তো সৃজনের স্রষ্টা, স্বপ্নের স্রষ্টা। সেই কারিগর সর্বদা সহজ পথের পথিক, সুন্দরের সহোদর। সাম্য রাইয়ানের কবিতা বারবার বাঁক বদল করে। বারবার রূপান্তর ঘটায়। একটা কবিতা থেকে আরেকটা কবিতায় যেতে যেতে বারবার নতুন সাম্যকে পেয়ে যাই। কবির ক্ষমতা হয়তো এখানেই।

“পূর্বরাতের ভয়াবহ মৃত্যুভাবনা পকেটে নিয়ে ঘুরছিলাম রাতে৷ দেখি, মানুষের কতো বিচিত্র জীবন; সানাই বাজাচ্ছে বিয়ের ৷ বলুন তো, জীবনের ফলাফল কী?”
(মহাকোলাহল)

জীবন-মৃত্যু ও মৃত্যুচেতনা সম্পর্কিত প্রশ্ন অনাদি কাল থেকে মানুষ করে এসেছে। কখনও অপরকে আবার কখনও নিজেকে। এটি দার্শনিক প্রশ্ন হলেও, কেবল তত্ত্বচর্চায় মশগুল দার্শনিকদের মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ থাকেনি। মগজ পুড়িয়েছেন সাধারণ মানুষ, কবি-লেখক-শিল্পী সকলেই। ‘মৃত্যুকে যেভাবে পড়লেন হাইডেগার’ প্রবন্ধে সুকল্প চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, “মৃত্যু ভাবনা বা মৃত্যু চেতনা মানুষের কোনও দুর্বলতা নয়। হাইডেগারের মতে, ‘একদিন যেতে হবে চলে’ এই ভাবনা হল অস্তিত্বের শক্তি ও ক্ষমতা। কেননা জীবন সম্পূর্ণভাবেই জীবন। কিন্তু তা মৃত্যু অভিমুখী। এই ভাবনাকে দূরে ঠেলে কেউ যদি মৃত্যুকে নৈর্ব্যক্তিক ও গুরুত্বহীন ভাবে এবং আরাম ও বিলাসে জীবন কাটায় তাহলে মানবসত্তা একটি মিথ্যাকে আশ্রয় দেবে। মিথ্যাকে সুরক্ষা দেবে। মৃত্যু যে তাঁর অস্তিত্বের অনন্য সম্ভাবনা এই সত্যটুকু যত সে লুকিয়ে রাখবে ততই সে নিজেকে জানার পথ থেকে দূরে সরে যাবে। সার্থক মানবসত্তা তাঁর সমগ্র জীবন দিয়ে মৃত্যুকে সাক্ষাৎ করে। এইভাবেই সে অন্যদের থেকে আলাদা হয়, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র রচিত হয়। তাই সার্থক আত্মত্ব (অথেনটিক সেলফহুড) অর্জনের জন্য মানুষকে উপলব্ধি করতে হবে মৃত্যু হল তার চূড়ান্ত যথার্থ, চূড়ান্ত স্পষ্ট, চূড়ান্ত অনবদমনীয় এবং চূড়ান্ত অনতিক্রমনীয় সম্ভাবনা।”

“অনন্ত ঘুমের ভেতরে আমি ঢুকে গেলাম, অসামান্য প্রেমের চোরাস্রোতে; বিলুপ্ত জীবাশ্মের বুকের উপরে বসে, ধূসর অন্ধকারে দেখা হলো তোমার সাথে। বলি, কেমন আলোর ধারা তুমি, ছায়া মাড়িয়ে চলে যাও!”
(মৃত্যুপূর্ব গান)

সাম্য রাইয়ানের কবিতায় বারংবার মৃত্যুচেতনা ফুটে উঠেছে নানাভাবে। মৃত্যুকে তিনি কখনো রঙিন কখনো ধূসর অন্ধকার রঙে এঁকেছেন৷ মৃত্যুর বিভীষিকা থেকে পালিয়ে আমরা জীবিতের ছদ্মবেশে আনন্দযজ্ঞে মেতে থাকি৷ কিন্তু মৃত্যু কবির কাছে যেন খুবই স্বাভাবিক-স্বস্তিদায়ক৷ তাই তিনি লিখতে পারেন, “আমি বোধয় হাসতে হাসতে মরে যাবো!” কী স্বাভাবিক, সাধারণ কথা; অথচ একেই তিনি যখন কবিতার ক্ষেতে বপন করেন, তা হয়ে ওঠে উজ্জ্বল; গভীর দার্শনিক প্রত্যয় নিয়ে সে পংক্তি পাঠককে ভাসিয়ে নেয় অন্যজগতে৷ পাঠের পরেও তার জের রয়ে যায় পাঠকের মগজে-মননে। তিনি মৃত্যুকে হাজির করতে ত্রিকালকে একই সুতোয় গেথে কলমের জবানে ফুটিয়ে তোলেন। আঙ্গুলের ডগায় জীবনকে নাচিয়ে, লৌকিক মোহকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতে পারেন অনায়াসে। তাই কবি লিখেন, “জীবন, তুমি তার আঙুলের সমানও নও৷” এভাবেই ছদ্মবেশী জীবনকথার আড়ালে চিরন্তন মৃত্যুকেই যেন স্বীকার করে নিয়েছেন কবি৷

পৃথিবীতে চলছে ক্রান্তিকাল। এক বিরাট বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত হচ্ছে। করোনার ভয়াল আক্রমণে সারা পৃথিবী বিপর্যস্ত— মুখ থুবড়ে পড়েছে। অগনন মানুষের মৃত্যু আমাদের শোকস্তব্ধ করেছে। ওদিকে ভূমধ্যসাগর, চীন সাগর বা ভারতের লাদাখকে কেন্দ্র করে, যুদ্ধের দামামা বেজে উঠছে। প্রবল শক্তিশালী সাম্রাজ্যবাদী রাশিয়া, চীনের সামরিক শক্তির হুঙ্কারে, যেকোনো সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে যেতে পারে! এমন পরিস্থিতিতে সাম্য রাইয়ানের কবিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে৷ কবি লিখেন,
“করতলে তাক করা মৃত্যু এখানে রৌদ্রজ্জল প্রতীক্ষায়
জীবনের নিবিড় ঘনবসতিতে জীবন নিয়তই জীবন হারায়।”
(ল্যাম্পপোস্ট বন)

কবি সাম্য রাইয়ান শব্দের সমুদ্রে ডুবে সেঁচে আনে অমূল্য রতন। সমকালের চেতনার পরিচয় কবির কবিতার ছত্রে ছত্রে পাই। জীবনের প্রতি পরতে অগণন মানুষের মৃত্যু দেখেছেন কবি। তারই প্রতিফল যেন উঠে আসে তার কবিতায়; আরো নতুন রূপে মৃত্যুচেতনার পরিচয় পাই আমরা। কবি লিখেন,
“শুকনো পাতারা ঝরে পড়ার কালে মাঝপথে হাওয়া লেগে আবারো উড়ে গ্যাছে অন্য পথে, ভিন্ন গতিতে; মৃত্যুর মতো বদলে গ্যাছে তারা প্রভিন্ন আঙ্গিকে। রঙের স্রোত থেকে একটা দৃশ্য উঁকি দিচ্ছিলো; প্রতিছায়া ছিলো সেটা মানুষের—”
(বিশ্বরূপ)

কবির প্রজ্ঞায় ধরা পড়ে মৃত্যুই বিলুপ্তি নয়! নয় মহাশূন্য! কবি অনুভব করেছিলেন, মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জীবনের পরিপূর্ণ মুক্তি! সম্পূর্ণ প্রকাশ! মৃত্যুর যেন জীবনেরই মহাযজ্ঞ! আর মৃত্যুর মধ্যে দিয়েই পরিণতির মাত্রায় প্রকাশিত হয় জীবন, তার পূর্ণতায়! সেই পরিপূর্ণতারই কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে সাম্য রাইয়ানের কবিতায়৷

মৃত্যু যখন অনিবার্য তখন তাকে শান্ত চিত্তে বরণ করে নিতে হয়! মৃত্যু সাধারণত মানুষের অসহায়ত্বের নাম৷ কিন্তু সাম্য রাইয়ানের কবিতায় তা মোটেই অসহায়ত্ব হিসেবে ধরা দেয় না৷ প্রকৃত মানবিকবোধসম্পন্ন জীবন যাপনের মধ্যেই সত্যিকার অমরত্ব বলে তিনি বিশ্বার করেন৷ তাই তিনি লিখেন,
“নিবিড় যাপনে আমিও তোমার হাতে তুলে দিতে পারি প্রকৃত মৃত্যুহীনতা।”
(অন্ধকুমারী)

তার কবিতা পড়ে আমার মনে হয়েছে, তিনি মৃত্যুকে পাঠ করেছেন, উপলব্ধি করেছেন৷ সাম্যকে সম্যক উপলব্ধি করতে হলে তাঁর এই সত্যমূল্যেই করতে হবে তাঁকে অনুভব! আর জীবনকে তার সত্যমূল্যে অনুভব করতে হলে মৃত্যুর প্রেক্ষিতে তাকে অনুধাবন করা প্রয়োজন৷ সাম্যের কবিতাপাঠে সহজে অনুমান করা যায় তাঁর মৃত্যুচিন্তায় এক ধরনের অভিজ্ঞতালব্ধ বোধ ছিলো। চিন্তার নানা স্তরে এর কিছু স্ফূরণের দেখা পাই এভাবে,
“একদা হাতের ’পরে হাত রেখে আমি একের অধিক শব্দে নিজেকে হত্যাচেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছিলাম।”
(ব্যর্থ হত্যাচেষ্টার পর)

“মৃত্যু প্রতিমুহূর্তে আমাদের ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেলছে” –বলেছিলেন রেনেসাঁ যুগের দার্শনিক মন্টাইগেন। জীবনের পরিণতি মৃত্যু। আর সেই মৃত্যু কখন ঘটবে সেটাও পুরোপুরি অনিশ্চিত। কিন্তু মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়ে মানুষের পক্ষে কি কখনো চিরকাল বেঁচে থাকা সম্ভব হবে? এমন কোনো সঞ্জীবনী কি আদৌ আছে যা মানুষকে অমর করতে পারবে? মানবসভ্যতার প্রাচীনতম গল্পগাঁথা 'গিলগামেশের মহাকাব্য'-ও রচিত হয়েছে এই অমরত্ব ঘিরে। চার হাজার বছর আগে মেসোপটেমিয়ায় রাজা গিলগামেশকে নিয়ে লেখা এই মহাকাব্যে উঠে এসেছে মৃত্যু-দর্শন। সবচেয়ে কাছের বন্ধুর মৃত্যুর পর নিজের অমরত্ব নিয়ে প্রশ্ন করে গিলগামেশ, ‘আমাকেও মরতে হবে?’

দুঃখ-যন্ত্রণায় মেসোপটেমিয়ার পিটার থিয়েল হয়ে উঠেন গিলগামেশ! মৃত্যুকে জয় করার সন্ধানে নামেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে খুঁজে পেয়েছিলেন জীবনের অর্থ।

কবি সাম্য রাইয়ানের দৃষ্টিতে মৃত্যুই স্বাভাবিক, অনিবার্য নিয়তি৷ অপরদিকে জন্ম যেন আধিপত্য বিস্তারেরই এক প্রয়াস৷ এ নিয়ে অনেক দার্শনিক ব্যাখ্যা রয়েছে সাম্যর সপক্ষে৷ বিস্তর দার্শনিক প্রত্যয় তিনি কত সাবলীলভাবে প্রকাশ করেছেন কবিতায়, তিনি লিখেছেন,
“মৃত্যুই একমাত্র প্রাকৃতিক
জন্ম মানেই কৃত্তিমতা, আধিপত্যের জয়গান”
(পুনরায় মৃত্যু বিষয়ক)

কবি-লেখকগণ বহু অভিধায় জীবনকে ফুটিয়ে তোলেন সাহিত্যে। জীবনকে কর্মমুখর করে তুলেও মৃত্যুকে অস্বীকার করতে না পেরে, নৈঃশব্দ্যে শীতল হাওয়া-বাতাসের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকেন কবি সাম্য রাইয়ান। মূলত সকল প্রস্থানই বেদনার চোরা বিষ ঢেলে দেয় জীবন্ত মানুষের মর্মে,
“পবিত্র পাখিদের অলঙ্কার নিয়ে, আমাকে মর্তে
রেখে কেউ কেউ উড়ে যায়; আমি তার ফেলে
যাওয়া ধুলো জমিয়ে রাখি ৷ এতো যে দক্ষ হলাম
কাজে, মৃত্যুকে বাঁচিয়ে রাখি জীবনের মাঝে!”
(শোকাবহ)

কবিতায় নিজস্বতা সৃষ্টিতে মগ্ন কবি শব্দের উপমার, মিথের নিরীক্ষা করেন প্রতিনিয়ত। তার কবিতায় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে জীবন ও প্রকৃতির রসালাপের আধুনিকতার ছোয়া। কাব্যিকতার দেয়ালে আঁকেন পবিত্র পাখিদের অলঙ্কার, রৌদ্রজ্জল মৃত্যু, স্বপ্ন দেখতে দেখতে অন্ধ হয়ে যাওয়া মানবজাতির প্রতি তিনি ছুঁড়ে দেন অলঙ্ঘ্য বাস্তবতার মহাকোলাহল।
“যানজট তৈরি হয়েছে
মগজময়; মৃত্যুমুখী— 
পৃথিবীর স্বপ্নান্ধ মানবদল৷”
(যাপনকাল)

সাম্য রাইয়ানের কবিতা পাঠে পেয়েছি মাটির কথা, মায়ের কথা, বাবার কান থেকে মুছে যাওয়া গ্রামোফোনের সুর, আমবাগান, ধানক্ষেত, হৃদয়পুর, অনেক নদ-নদীর কথা; এরকম আরো অনেক অনেক উপমা৷ তাঁর কবিতায় প্রাণের প্রফুল্লতা জগতের আনন্দ ধামে একাকার হয়ে যাপনকে উদযাপনের ঈঙ্গিত করে। কিন্তু কী ক্লান্তি আয়ুকে অবসাদে টেনে নেয় মহাকালিন কালো গহ্বরে আর সব স্মৃতি চিহ্ন মুছে দেয় নির্ণয় অবাস্তবতার ভেতর। মানুষের দুঃখবোধ তখন উথলে ওঠে। ভুলতে চাইলেও মৃত্যু নিজ যোগ্যতায় তার স্মরণে থাকে। এমন অনিবার্য পরিণতির তরজমা করেছেন কবি। অনিশ্চিত যাত্রাপথের এই নাক্ষত্রিক বিচ্যুতিতেও প্রকৃতি ও জীবনকে একাত্ম করে জীবন ভেবেছেন। তাই কবি লিখেছেন,
“এই যে জীবনহীনতা, যা আমি
যাপন করি হৃদয়ে মননে
তা আমাকে চপেটাঘাত করে
কী উঞ্চ অপরাধে! ঘোরগ্রস্ত
ব্যাকুল চোখ তুলে তাকালে
শুধু সেই মাদকতা আমাকে গ্রাস করে।
তবে বৃক্ষ তোমার পায়ের কাছে
মৃত্যুও হয় কুন্ঠিত।

অতএব মৃত্যুভাবনা ছাড়ো।
তোমার হৃদয় থেকে
এই আমবাগান, ধানক্ষেত, হৃদয়পুর…
বর্ণনা করো ধীরে ধীরে”

জীবনের ব্যর্থতা, অসহায়তা, হতাশা, অবসাদ মানুষকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে৷ আমাদের মস্তিষ্কে সেরোটোনিন নামক হরমোনের নিঃসরণের হার কমে গেলে ধীরে ধীরে আমরা হতাশ হয়ে পরি। সামান্য হতাশা ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে চরম হতাশার দিকে এবং এক সময় আমরা এগিয়ে যাই আত্মহত্যার দিকে। মানুষ অত্যন্ত সেন্সেটিভ প্রাণী হওয়ার কারণে অহরহই আত্মহত্যার খবর আমরা পেয়ে থাকি। আবার বর্তমানে বিজ্ঞানীদের গবেষণায় আমরা জানতে পারি, প্রাণীজগতেও আত্মহত্যার প্রবণতা বিদ্যমান৷ আত্মহত্যার এমন উদাহরণ তিমি, লেমিং (ইঁদুর প্রজাতির এক ধরনের প্রাণী) বিড়াল, ঘোড়া সহ আরও বিভিন্ন প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়। বিড়াল তার বাচ্চা মারা গেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আবার ঘোড়া দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভুগলে আত্মহত্যা করে থাকে। আবার পোষা কুকুর অনেকসময় তার মালিকের মৃত্যুর পর দিনের পর দিন সমাধিস্থলে বসে থাকা এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার মত ঘটনাও আমরা অনেকে হয়তো শুনে থাকব। একজন প্রকৃত কবির জীবন তো আরো কণ্টকাকীর্ণ, এর প্রধান কারন কবির সংবেদনশীলতা৷ অতি মাত্রায় সংবেদনশীল মানুষের জন্য এ পৃথিবী অনেক বেশি রূঢ়৷ সাম্য রাইয়ান নিজেই লিখেছেন, “প্রকৃত কবি ছাড়া পৃথিবীতে কোন সংখ্যালঘু নেই৷” গভীর বেদনা থেকেই এমন উপলব্ধি তৈরি হতে পারে৷ তাই হয়তো কখনো মৃত্যুর প্রতি মোহগ্রস্তের মতো আকর্ষিত হতে থাকেন কবি৷ স্বাদ নিতে চান মৃত্যুর৷ তারই সাক্ষর মেলে ‘মৃত্যু বিষয়ক’ কবিতাটিতে,
“মৃত্যুর নিজস্ব রঙ আছে—
রঙেতে উল্লাস আছে
ইউটোপীয় বিষন্নতা আছে।

অনন্ত স্বাদের, পৃথিবীতে
সে তো একমাত্র মৃত্যুই”

মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করাকে কবি অযৌক্তিক মনে করে বলেছেন, “হাজার বছর ধরে নিজেকে ‘শ্রেষ্ঠ’ দাবি করেও ‘শ্রেষ্ঠ’ হতে না পারাটা মানবজাতির শ্রেষ্ঠ ব্যর্থতা৷” অর্থাৎ কবি মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বে বিশ্বাস করেন না৷ তার মতে ফুল, পাখি, প্রাণী সকলই সমান গুরুত্ববহ৷ তাদের সকলকে আপন করে নিলেই জীবন সার্থক হয়ে উঠতে পারে৷ প্রাণীরা মানুষের শত্রু নয়, বরং মানুষই মানুষের শত্রু; মানুষের সবথেকে বড় ক্ষতি মানুষই করতে পারে৷ তাই ‘জীবনপুরাণ’ কবিতায় কবি লিখেন, “মানুষই হরণ করেছে মানুষের সুখ! / আহা জীবন / কী বিচ্ছিন্নতাপরায়ণ / তীব্র স্বরে ডেকে যায় / নিঃসঙ্গ শালিক৷” এর মাধ্যমে মানুষের বিভৎস্য রূপ ফুটে উঠে, মানুষের নেগেটিভ মাইন্ডকে কবি সজোরে চপেটাঘাত করেছেন৷ মানুষই তো মানুষকে হত্যা করতে চায়, আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলতে চায়৷ কবির জীবনেও এরকম ঘটনা ঘটেছে৷ কবি তা অবলীলায় প্রকাশ করেছেন ‘লিখিত রাত্রি’ কবিতায়৷ এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায়ও তিনি নিজেই বিবৃত করেছেন এভাবে,
“ওরা চায় আমি পাগল হয়ে যাই, একা হয়ে যাই
শহরে ঘুরিফিরি নিঃসঙ্গ মানুষ; আমার মৃত্যু হোক
জলের অভাবে নির্মম: বর্ণনাতীত। অথচ কতো
পাখি ফুল নদী বন্ধু হচ্ছে অকপটে; কী তুমুল
আড্ডা দিচ্ছি আমরা। সুযোগ নেই, হবো: একলা-পাগল।”
(কুড়ি/ লিখিত রাত্রি)

কবিতায় পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সাহিত্যিক জীবনে সাম্য রাইয়ান অনেক ঘাত-প্রতিঘাত যাপন করছেন। তবুও তিনি মানুষের সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে বেঁচে থেকে নিজেকে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয় নিয়ে জীবনেরই জয়গান গেয়েছেন৷ কারন আত্মহত্যা যতোই সুস্বাদু ফলবিশেষ হোক, তা কখনো ‘সমাধান’ নয়৷

আত্মহনন ইচ্ছার বৈপরীত্যে কবি এঁকেছেন জীবনের প্রতি গভীর অনুরাগ ও ভালোবাসার চিত্র। ব্যতিক্রম চিত্র বাদ দিলে মশা, মাছি, ব্যাঙ, পেঁচা, ফড়িং জীবনকে ভালোবেসেছে বলেই তারা, বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। রক্ত, ক্লেদ ও আবর্জনার মধ্যে যে মাছির বাস সেও রৌদ্রে,আলোতে উড়ে আসার চেষ্টা করে। ফড়িং মৃত্যুর শিহরণ উপলব্ধি করেও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। তাই কবি এদের সাথেই বন্ধুত্ব গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে, এদের কাছেই জীবনের শিক্ষা গ্রহণ করতে চেয়েছেন আসলে৷ যা আমাদের দাঁড় করায় জীবনের নতুন অর্থবোধকতার সামনে৷ কবি সাম্য রাইয়ানের মৃত্যুদর্শনও চিন্তার এক বিস্তৃত ক্যানভাস। এই ক্যানভাসে পাঠকের ভাবনার খোরাক আছে, আছে কবির ভাবনাকে ছাড়িয়ে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের অপার সম্ভাবনা৷ তেমনই এক কবিতা ‘মৃত্যুপূর্ব গান’৷ ডায়ালগের ভঙ্গিতে লেখা আপাত বিচ্ছিন্ন পংক্তিমালা আসলে আলাদা নয়৷ অন্তর্গত যে মিলনসুতোটি কবি এঁকে রেখেছেন পাঠকের জন্য, তা অবলম্বন করে এগিয়ে গেলে নতুন কাব্যভূবনের অসামান্য কারিগরের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়৷ একটি পংক্তি শুধু উদ্ধৃত করছি,
“—অনির্দিষ্ট জন্মের দিকে কিছু মৃত্যু ছুঁড়ে দিও সত্যিকারের ফুল।”

সাম্য রাইয়ান একই সাথে কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। তিনি দীর্ঘকাল ধরে ‘বিন্দু' নামক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে আসছেন। বহুমাত্রিক এই লেখকের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য আমাদের জানা হয়ে ওঠে না, কারন এ সম্পর্কে তাঁর বইগুলোর ফ্ল্যাপে কিংবা অনলাইনে তথ্য অপ্রতুল৷

সম্ভবত তিনি প্রত্যাশা করেন, তার কাব্যিক সংসারই পাঠকের আরাধ্য হয়ে থাকুক। সাহিত্যই তাকে বিচারের একমাত্র মাপকাঠি হোক৷ এই নির্মোহ বাসনা হয়তো তিনি মননে ধারণ করেন৷ তাঁর এই বাসনাকে সম্মান জানাই৷ প্রকৃত পাঠক তাকে খুঁজে নিবে অবশ্যই৷ সে গুণ কবি সাম্য রাইয়ানের কবিতায় বিদ্যমান— একথা জোর দিয়ে বলতে পারি৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *