সুবীর সরকারের সাম্যপুরাণ: নৈর্ব্যক্তিক চলনে আত্মার অভিঘাত

❑ রক্তিম ভট্টাচার্য 

সুবীর সরকারের সাম্যপুরাণ এক আশ্চর্য বই। “আশ্চর্য” হবার কয়েকটি কারণ আছে, আছে কয়েকটি ধাপও। প্রথমত, বইটি, শিরোনামসমেত , সামগ্রিকভাবেই আরেক কবির প্রতি উৎসর্গীকৃত, এবং উক্ত কবিও সমসাময়িক, একইসঙ্গে প্রবলভাবে সক্রিয়। কবির নাম, সাম্য রাইয়ান। জনপ্রিয় কবি, সম্পাদক। সুবীর সরকার, সাম্য রাইয়ানের প্রতি, তাঁর কবিতার প্রতি মুগ্ধতা জানিয়েছেন গোটা একটি বইয়ে। এক সমসাময়িক কবির প্রতি আরেক কবির এইভাবে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনের ভাবনা, অন্তত বর্তমান বাংলা বাজারের, বিশেষত সাহিত্যের ক্ষেত্রে, বেশ বিরল বলা চলে। দ্বিতীয়ত, এই বই শুধুমাত্র এক কবির সাহিত্যকীর্তির প্রতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ নয়, শুধুমাত্র তাঁকে নিয়ে উদ্ভাসিত হবার লৌকিকতা নয়, বরং তাঁর সাহিত্যকে যাপন করা, চেতনে-মননে একাঙ্গীভূত করা। আত্মীকরণ করা। যুগের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে, এক নৈর্ব্যক্তিক চলনে, কবিতাকে সময় দিয়ে এবং তাঁর আত্মাকে সাত্ত্বিক দৃষ্টিতে পুনর্বাসিত করার ভাবনাটি অভিনব। এবং, আবারও, তা যদি হয় অন্য কোনও কবির!

এবার আসি বইটির শিরোনামে। “সাম্যপুরাণ”। একটু আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে শব্দটি কাটা-ছেঁড়া করা যাক। ‘পুরাণ’ শব্দটির তিনটি অর্থ পাচ্ছি আমরা সংসদ বাংলা অভিধানে। এক, ভারতে বৈদিক যুগের পরবর্তী কালের ইতিহাস বা জনশ্রুতি অবলম্বনে সংকলিত গ্রন্থাদি। দুই, প্রাচীন কাহিনি। বিশেষণার্থে, প্রাচীন বা পুরাতন। খুব স্বাভাবিকভাবেই, তৃতীয় অর্থটি এখানে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রথম বা দ্বিতীয় অর্থ অনেকটা কাছাকাছি হলেও, এখানে তাৎপর্যটি একটু বিশ্লেষণের দরকার।

বইয়ের কয়েকটি লাইনের দিকে একবার তাকিয়ে নেওয়া যাক।

“সাম্য রাইয়ান তার দুই চোখ দিয়ে কেমন দূরাগত এক বিভ্রম কিংবা ভ্রম নিয়ে এই উত্তরদেশের উত্তর শিথানে প্রবাহিত নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। সে কি নদীজলপ্রবাহ দেখে আদতে কিঞ্চিৎ আনমনা হয়ে পড়ছিল!”

“দূরের কোন বনভূমির খুব গহীন থেকে সেই কবে শুনে ফেলা জখম বাঘের কান্না আরো আরো স্মৃতিময় করে তোলে সাম্য রাইয়ানকে”।

 “ধরলা নদীর পারে পারে বেজে ওঠে সাম্য রাইয়ানের ব্যাকুল বাঁশি”।

 যদিও বইটির সজ্জায় প্রতিটি কবিতাই একটি ক’রে ক্রমিক সংখ্যা দিয়ে নামাঙ্কিত, কিন্তু সচেতনভাবেই সে-সংখ্যার ধ্রুবক আলোচনার নিরীখে প্রত্যাহার করলাম। তার একটা বড় কারণ, আপাতদৃষ্টিতে হলেও প্রতিটি কবিতার গভীর মর্মভেদী অন্তর্ঘাতটি চিহ্নিত করা যায় সহজেই। পাঠক বুঝতেই পারবেন, আসলে সবকটি লেখাই এক সূত্রে গ্রন্থিত, এক নির্দিষ্ট অভিমুখে তার যাত্রা।

কবিতার আশ্রয়ে আসলে কবি সুবীর সরকার অন্বেষণ করেন সাম্য রাইয়ানের আত্মাকে, শরীরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মানবজীবনের এক অন্তহীন সত্যকে। জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার তাঁর “Being and Times” গ্রন্থে এক মৌলিক সত্যের (fundamental truth) ধারণা দিয়েছিলেন। স্পর্শের অতীত, বোধগম্যতার অতীত সে এক আশ্চর্য সত্য। যা মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকে অবচেতনের পরশপাথরে। অন্তর্লীন অবসাদের বা নির্মোহ স্মৃতির পালকের সমান্তরালে ভেসে থাকা এক জীবনকে সাম্য রাইয়ানের রূপ দেন কবি। সুবীর সরকারের ভাষার দ্যোতকে সে নিজেই এক কবিতা হয়ে ওঠে তখন।

কবি লেখেন, “সাম্য রাইয়ান হাঁটতে থাকে। তাকে তো এভাবেই হেঁটে যেতে হয়“। এই হেঁটে যাওয়া অনির্দিষ্টের লক্ষ্যে। সত্যিই কি সাম্য রাইয়ানের জীবনে এই গন্তব্যহীনতাই সত্য? ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু জানি, তিনি সম্পাদক। “বিন্দু” নামে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। ঘটনাচক্রে, সামান্য আলাপের সূত্রে অনলাইনে ও মুদ্রিত (হার্ডকপি) সংখ্যায় একবার ক’রে লেখারও সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু সুবীর সরকারের সাম্য রাইয়ান এক আত্মার দ্যোতক। আসলে কবিদের জীবনে এই হারিয়ে যাওয়ার মুহূর্তরাই হয়ত নির্মম সত্যের ফাঁসে অবিচল হয়ে থাকে।

আর একটি কবিতায় দেখি, “…প্রাচীন প্রবাদের মতো ক্রমে জায়মান হয়ে উঠতে থাকেন কবি সাম্য রাইয়ান – তার সব আর সমস্তটুকু নিয়েই”। কীভাবে? এক দূরাগত অভিপ্রায় কি কাঙ্ক্ষিত, নাকি সার্বিক গ্রহণযোগ্যতার নিরীখে সে-এক সত্ত্বামাত্র? আসলে, সুবীর সরকার তাঁর সাম্য রাইয়ানকে তৈরি করেন প্রতিমার মতো। সরলরৈখিক একক মাত্রায় সে বস্তুজীবনের কেউ নয়, বরং অপ্রাপ্ত উদাসীনতার নিশ্চল নিঃস্পৃহতায় সে এক মহাকবিতা। হ্যাঁ, কবিতাই। কবি নয়। ব্যক্তি সাম্য আর অব্যক্ত সাম্যের মাঝে সুবীর সরকার নিজেও এক সাঁকো হয়ে ওঠেন, হয়ত, প্রাচীন প্রবাদের মতোই।

বইটিতে এক লুকোচুরি খেলা আছে। সুবীর সরকার এখানে উপস্থিত শরীরীভাবেই। আর আছে, সাম্য। তার অন্তঃস্থিত অস্তিত্ব নিয়ে। কবি তাঁর চাহিদার সুরে লেখেন, “এই দেশে বারবার তুমি ফিরে এসো কবি সাম্য রাইয়ান, বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা জানানোর জন্য অন্তত”। এই কবিতারই প্রথম দিকে কবি লেখেন, “এই জোড়া মহিষের দেশে, ভোরের মোরগের দেশে শূন্য সিঁথির গল্প নিয়ে চলে এসো তুমি প্লিজ সাম্য রাইয়ান”। এই ‘প্লিজ’ শব্দে কবির আকুতি, আর্তনাদ তীব্র স্বরে আহ্বান করে তাঁর নিজের সত্তাকেই, নিজেকেই তিনি প্রত্যর্পিত করতে চান সময়ের বুকে, ইতিহাসের পাঁজরে। কিন্তু, বস্তুজগতের রুক্ষ ভূমি তাঁকে টেনে নেয় পরাধীনতার শৃঙ্খলে। অতএব, কবির প্রয়োজন এক “deus ex machine” হয়ে, এক ঐশ্বরিক আশ্বাসের মতো। সাম্য রাইয়ানই হয়ত সেই মহাজাগতিক প্রতিভূ, নীৎশে’র “ubermensch” – যে সমস্ত বাস্তবতার বিপ্রতীপে ‘ভ্রম’ বা ‘বিভ্রম’-এর চোরাগোপ্তা সন্তাপকে সযত্নে লালন ক’রে লিখে রাখবে গ্রাম-নদী-উদ্ভিদের একান্ত কথামালার এপিটাফ। সাম্য রাইয়ানের হাত ধরেই কবি সুবীর সরকার নৈসর্গিক গমনে পেরিয়ে যাবেন গ্লানিবোধ এবং বিবেক-দংশনের যাবতীয় আত্মগরিমা।

তাই শেষবেলায়, একটি লাইনের সামনে নতজানু হয়েই ছোটবেলার মতো বলতে হয়, নামকরণের সার্থকতার কথা। আভিধানিক অভিঘাতকে স্মর্তব্য করেই হয়ত সামগ্রিকভাবে আমরা কোনও উপাদান সেভাবে পাইনি, কিন্তু বইটি পড়া শেষ করার পর, একটিই সুর বড় কানে বাজে।

পৃথিবীর যে-কোনও প্রাচীন সভ্যতা যেমন গড়ে ওঠে নদীর পাড়ে, যে কোনও প্রাচীন কথনে যেমন অবধারিতভাবেই জড়িয়ে যায় এক শূন্য দৃষ্টির মহানুভব রূপকথা – মহানগর থেকে সুদূর কোনও এক মানচিত্র-বিবর্জিত অসীমে “চাপ দাড়ি নিয়ে সাম্য আস্ত এক পুরাণ হয়ে দাড়িয়ে থাকে ধরলা নদীর শিয়রে”।

গ্রন্থ: সাম্যপুরাণ/ লেখক: সুবীর সরকার/ প্রকাশনা: এবং অধ্যায়/ মূল প্রচ্ছদ: সাম্য রাইয়ান/ প্রচ্ছদ রূপায়ণ: সুপ্রসন্ন কুণ্ডু/ মূল্য: ১৫০ টাকা 

[রিভিউটি কোলফিল্ড টাইমস পত্রিকা থেকে সংগৃহীত৷]

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *