কবি সাম্য রাইয়ান-এর কবিতার স্বরূপ সন্ধানে

❑ শামীম সৈকত

যে হৃদয়াবেগের সাথে শানিত বুদ্ধির সমন্বয়ে অসামান্য সুখপাঠ্য গদ্য ও সমকালীন বাংলা কবিতায় বিচরণ করে, যে সর্বদা নিজের সৃষ্টির বিষয়ে ভীষণরকম নির্মোহ থেকে সমকালের স্পন্দন আর অন্তরটাই শোনাতে চায়, যে ‘বিন্দু’ ছোটকাগজের মধ্য দিয়ে নতুন এক পথের গল্প শোনায়; সে কবি সাম্য রাইয়ান। যার কবিতার ঝরঝরে আনুষঙ্গিক শব্দের ধূপকাঠি প্রোজ্জ্বল হয় পাঠকের মনে। পাঠক ঘোরের ভেতর খোঁজে অন্য স্বরের অন্যরকম ঘোর। খুঁজে পায় ধরলার শীতল জলে জেগে ওঠার তীব্র অনুভব। এই রাষ্ট্র, এই সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাসের আনাচেকানাচে ঘোরে তার শব্দতীর; খুঁজতে থাকে আলোর মশাল। যা আমাদের মগজে গেঁথে দেয় অস্থির বাস্তবতার প্রশ্ন।
“আদিম শ্রমিক আমি মেশিন চালাই 
মেশিনে লুকানো আছে পুঁজির জিন 
চালাতে চালাতে দেখি আমিই মেশিন৷”
(মেশিন/সাম্য রাইয়ান)

সাম্য রাইয়ানের সমগ্র কাব্যগ্রন্থগুলো পাঠ করলে মনে হয়, যাপিত জীবনের আধখোলা চোখ নিয়ে অপরূপ বর্ণনায় সে তুলে আনে শীতল দ্রোহ। প্রস্ফুটিত হয় সাদামাটা চিরচেনা প্রেক্ষাপট। অথচ বুননে কী গোপন প্রেমের ধোঁয়াশার জাল! যদিও ভাবের উপমা, অলংকরণ, চিত্রকল্পে নেই কোনো জটিলতা। জন্মস্থান কুড়িগ্রাম নিয়ে লেখা ‘তীব্র কুড়িগ্রাম’ কবিতার দুটো পঙ্ক্তি যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
“অগণন সম্পদশালী—আরো উচ্চ দাম
বেহিসেবী ঘুমন্ত মেয়ে—তীব্র কুড়িগ্রাম।”
(তীব্র কুড়িগ্রাম/ সাম্য রাইয়ান)

কবি সাম্য রাইয়ানের কিছু কবিতায় হাইকু-র ঢঙও মিশে আছে। ‘হামিংবার্ড’ কবিতায় “চমকে দিও না তাথৈ, উড়ে যাবে”, এ কার অবয়ব? তাথৈ; মানব কিংবা মানবীর মতো দেখতে লুকিয়ে থাকা এ কোন মানব/মানবী? পরিচয় তুলে রেখে পা বাড়াই আরো গহিন বনে। যেখানে উড়ে হামিংবার্ড।

কবি তার কবিতা কিংবা গদ্যের প্রতি দায় রাখতে গিয়ে বলে তার সময়ের কথা। এরই দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রতিটি অক্ষর জড়ো হয়ে ছুঁড়ে দেয় শব্দবুলেট। আমি মনে করি, জোরালো ও দৃঢ় বক্তব্যের মাধ্যমে কবিত্বের নিজস্ব সত্তা ঘোষণায় সাম্য রাইয়ান সফল। তাঁর এই সফলতার ধারাবাহিকতার স্বরূপ ঘোষণা হয়—
“যদি অব্যাহত বেঁচে থাকি
শ্বাস নিই গ্যালন গ্যালন;
প্রতিটি রক্তফোঁটা থেকে শব্দ জন্মাবে আর
গহীন থেকে বেরুবে নির্ভীক সিরাজ সিকদার।”
(প্রভিন্ন পৌনঃপুনিক/ সাম্য রাইয়ান

এই ছোট গ্রাম থেকে বৈশ্বিক সত্য ও ন্যায়ের মলিন প্রচ্ছদে ঢাকা আলো ও অন্ধকারের পার্থক্যকে বুঝে জীবন দর্শনে বেছে নিয়েছে বাস্তবতার হেমলক। তার এই লোকাল টেনের বাংলাদেশের একটা ছোট্ট গ্রাম, কুড়িগ্রাম। এখানেই বেড়ে ওঠা তার। সাম্য রাইয়ান জার্নি আমাকে বিস্ময়াভিভূত করে। কবি, তোমার পৃথিবীর গাড়িটি থামাও: আমি নেমে যাই।

তারারা পত্রিকার সাম্য রাইয়ান সংখ্যায় প্রকাশিত৷

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *