❑ মাহ্দী আনাম
আদিবা আমাকে মাঝে মাঝেই প্রশ্ন করে, ‘ভালো মানুষ মরে গেলে বৃষ্টি হয় কেনো?’
ওকে বলি, ‘মানুষ প্রকৃতির সেরা সন্তান- সেরা কিছু হারালে তাই প্রকৃতি কাঁদে, এপিটাফে রঙধনু এঁকে দেয়।’
কাঠেরপুল মোড়ে দাঁড়িয়ে মাগরিবের আজান শুনছি- গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এই শহর থেকে নিয়ন বাতিগুলো মুছে যাচ্ছে- আমার কষ্ট হয়।
– মাফ করবেন, আমি কি একটু সাহায্য পেতে পারি?
ভাঙা ভাঙা ঘরঘরে গলায় ভীষণ দ্বিধা নিয়ে যিনি প্রশ্নকর্তা- তাঁর তামাকের পাইপটা নিভে গেছে। এবং আমার মনে হচ্ছিল, তিনি তবুও টানছেন। বেশ উস্কোখুস্কো কাঁচাপাকা দাড়ি।
— নকশালের দিন আর স্টাইল বহু আগেই চলে গেছে— তবুও আপনি এভাবে কম্বল টাইপ চাদর মুড়ি দিয়ে আছেন কেন? ওটা থেকে বোঁটকা গন্ধ আসছে।
– মাফ করবেন, আমি কি একটু সাহায্য পেতে পারি?
লোকটা ত্যাঁদড় আছে! তাঁর বিদিক চাদরের নীচের দিকে ওভারকোটের অংশ দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশে সাধারণত কেউ ওভারকোট পরে না।
দু’কাঁধ কিছুটা ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘বই প্রকাশ করবেন? পাণ্ডুলিপি রেডি? গল্প, উপন্যাস না কবিতা? কত ফর্মা করতে চাচ্ছেন? শুনুন, প্রচ্ছদে কিন্তু আমি ছাড় দেবো না।’
এবার ভদ্রলোকের দাড়ির ফাঁকে স্মিত হাসি দেখা গেলো, ‘আপনার কাছে সবাই কি বই করতেই আসে? আমার কিছু ভাঙতি দরকার— কোথাও পাচ্ছি না।’
– হ্যালো কার্ল, আপনি জানেন জারের আমল চলে গেছে— এমনকি লেনিন, স্ট্যালিনও। আপনার মুদ্রা বিনিময়যোগ্য নহে।
উনি চোখ দুটো প্রায় দু’হাতে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। আদি-অন্ত ভাবমার্কা লুক নিয়ে বললাম, ‘সমস্যা নেই, আর কেউ জানে না।’
– তু...তু...তুমি... আপনি...
– গ্যাব্রিয়েল, এসেছিল। বলল কিছুক্ষণ পর আপনি এই কিম্ভুত প্যাটার্ন নিয়ে আসবেন। এজন্যই দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইউ নো বস, আমি জানতাম! আমাকে তুমি করেই বলুন।
– গ্যাব্রিয়েলের সাথে তোমার ভালো সম্পর্ক?
– তাঁকে আমি ভালোবাসি, সে'ও।
আমরা পরস্পর তখন সহজে হাসছি। বিন্দু বিন্দু করে জমে জল– আমরা আলাপ বাড়াই। কে কেমন আছেন- আইনস্টাইন অথবা রবীন্দ্রনাথ। “রাত বাড়ছে, হাজার বছরের পুরনো সেই রাত।” মন্তু আর টুনির জন্য আমার কষ্ট হয়।
– তোমাকে বিব্রত করার জন্য দুঃখিত। আদতে আমার ভাঙতির প্রয়োজন নেই। বিষণ্ণ ‘লোকাল ট্রেনের জার্নাল’ ধরে হেঁটে যেতে পারব আমি। জানো তো, মৃতদের ক্ষুধা, অবসন্নতা থাকে না! তোমাকে দেখতে চেয়েছিলাম, নন্দিত অথবা নিন্দিত মাহাদী আনাম।
– কার্ল, আপনি মৃত?
– তা নাহলে ‘বিগত রাইফেলের প্রতি সমবেদনা’ কেন লেখা হলো?
– আমার রাইফেল দারুণ লাগে, উইনচেস্টার রাইফেল। দেখুন, কেউ আপনাকে না বুঝলেও আপনি সত্য। সত্যের কোনো সঙ্গী কিংবা প্রমাণ দরকার হয় না।
তিনি বাচ্চাদের মতো মাথা দোলান— আমি আনন্দ পাই।
– আমি কি আপনাকে কিছুটা এগিয়ে দেবো?
– নাহ, আচ্ছা শেষ প্রশ্ন, তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছ কী করে? তোমার সানগ্লাস?
হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘কিছুতেই মাথায় আসছিল না– রাতে, বৃষ্টিতে কেনো এটা পরে আছ তুমি! কই পেলে এ বস্তু? গ্যাব্রিয়েল?’
আমার ছাতা নেই। ভিজতে ভিজতে বাসায় ফিরি। আমি একবারও পিছনে তাকাই না। কানে হুইসেল তোলে “কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস”। আমি জানি, সাম্য রাইয়ান কখনও মাথা নীচু করে হাঁটে না।
তারারা পত্রিকার সাম্য রাইয়ান বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত৷