❑ সাম্য রাইয়ান
ভগবানের গুপ্তচর মৃত্যু এসে বাঁধুক ঘরছন্দে, আমি কবিতা ছাড়ব না!
রবীন্দ্র অনুসারী কাব্যরুচি থেকে বাঙলা কবিতা যখন পৃথক ধারায় গতিশীল হয়ে আরেক বাঁকবদলের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে, ঠিক সে সময়ে, ১৯৫০-এর দশকে নিজস্ব ভাষাভঙ্গি সমেত আবির্ভাব ঘটে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের৷ তাঁর কবিতায় যে বোধের জগত উন্মোচিত হয় তা প্রধানত ঈশ্বর এবং মানবচেতনা অভিমুখী। তাঁর কবিতায় অভিনবত্ব ও কাব্যধর্মিতা স্বতন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত। আর এই স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে পৌঁছে দিয়েছে অন্যমাত্রায়। কবিতায় চিন্তার যে-ডাইভারসিটি, তা তাঁর কবিতাকে অনন্য করে তুলেছে। কবিতার রসত্ববোধ এবং সৌন্দর্যের কোনো রকম ব্যত্যয় না ঘটিয়েই তিনি জীবনের অভিজ্ঞতাকে কবিতার শব্দে রূপায়িত করেছেন তিনি। এছাড়াও গদ্যরচনার বিশেষ ভঙ্গি, ভাবুকতার মৌলিক দীপ্তি ও বিষয়ের বিস্তারে বাঙলা সাহিত্যে তিনি অনন্য স্থান করে নিয়েছে।
অলোকরঞ্জনের জন্ম ১৯৩৩ সালের ৬ অক্টোবর; বর্তমান বাঙলাদেশের দিনাজপুর শহরের গণেশতলায়। অল্প বয়সেই তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। শান্তিনিকেতনে প্রথম পাঠ সেরে উচ্চশিক্ষার জন্য পা রাখেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। এরপর প্রেসিডেন্সি কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে ১৯৫৭ সাল থেকেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন। পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা সাহিত্য বিভাগে অধ্যাপনার সময় ফেলোশিপ নিয়ে গ্যেটে-শিলারের দেশ জার্মানি চলে যান। গ্যেটের সাহিত্যকর্মের মূল রস অস্বাদন করতে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন জার্মান ভাষা শিখেছিলেন, অলোকরঞ্জনও তেমনি জার্মান ভাষা রপ্ত করেছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্মানি পর্যন্ত তার অধ্যাপনার জগৎ বিস্তৃত থেকেছে। বাঙালি ও জার্মান সংস্কৃতিকে কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন তিনি। এটি একটি বিরল ঘটনা। তাঁর এ সফল প্রয়াসের জন্য জার্মান সরকার তাকে গ্যেটে পুরস্কারে সম্মানীত করে।
কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত কবিতার পরতে পরতে এঁকেছেন দার্শনিক মতবাদ। কিন্তু দর্শন-তত্ত্বের ভারে কবিতাকে আক্রান্ত করেননি মোটেও৷ এ প্রসঙ্গে নয়ের দশকে ‘সৃজনী সংরাগে’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলছেন, “যেমন কবিতা শুধুমাত্র তত্ত্বভিত্তিক হয় না, ডাইড্যাকটিক হয় না, তেমনই অনেক সময় খুব ভালো রাজনৈতিক কবিতাও অ্যাপলিটিকাল, অরাজনৈতিক হয়ে যায়, তাকে হতে হয়, এটা আমরা লক্ষ করেছি। এখন তো এরিশ ফ্রিড, যিনি বিশ্বের সবথেকে বড় রাজনৈতিক কবি হিসেবে নন্দিত, তিনি বলেন, ‘একটি প্রেমের কবিতার ভিতরেও রাজনীতির ব্যাপারটা আশ্চর্যভাবে লুকিয়ে থাকতে পারে।’”
একজন সুপাঠককে কবিতার ভেতর থেকে অন্তর্নিহিত অর্থ খুঁজে নিতে হয়। অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের অসংখ্য কবিতায় অমোঘ মুদ্রাগুণ, নির্মিত শব্দ ঝলকের পাশাপাশি প্রতীকের মনোহর কারুকাজ লুকিয়ে আছে। যার অন্তর্জগতে প্রবেশ করে রসাস্বাদন মনযোগী পাঠকের জন্য অসামান্য অভিজ্ঞতা৷ কবিতায় যখন অপার্থিব জগতের মেলবন্ধন থাকে তখন পাঠক সীমাহীন ভাবনার শাখা-প্রশাখায় দোল খান। তাই তাঁর কবিতার দ্যোতনা, অলঙ্কার, অনুষঙ্গ, চিত্রকল্প হৃদয়ঙ্গম করতে পাঠকের অসুবিধে হয় না। অলোকরঞ্জনের একান্ত নিজস্ব বাচনভঙ্গি, নিত্য-নতুন শব্দ সন্ধান ও অপূর্ব শব্দ বিন্যাসের তারিফ করে কবি শামসুর রাহমান তাকে বলেছিলেন ‘কবিদের কবি’।
কাঁটাতারবিহীন পৃথিবীর কথা চিন্তা করে ব্রিটিশ ক্যারিবিয়ান কবি বেঞ্জামিন জেফানাইয়া, ব্রিটিশদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘এই ভূখণ্ড একদিন কারোর অধিকারে ছিল না, একদিন সব শূন্য ছিল, তাহলে আজ কেন এখানে বসবাস করতে এত বাধা?’ কবি অলোকরঞ্জনও এইসব কাঁটাতার, বিভেদের বেড়াজাল মুক্তি চেয়ে লিখেছেন, “চূর্ণ করে দাও যত অলীক সীমান্ত।”
রবীন্দ্র কাব্যাদর্শ থেকে বহুদূরে, আবার পাশ্চাত্য কাব্যরীতি কিংবা শ্লোগানমুখর কাব্যপ্রবণতা সুচারুভাবে এড়িয়ে তিনি নির্মাণ করেছেন (না কি আবিস্কার) মানুষ ও প্রকৃতিকে আবজে থাকা সম্পূর্ণ এক নতুন সুর৷
অরণ্যমধু ভরে নিতে মৌচাকেশহুরিয়া যতো গ্রামে কেন বাঁধেডেরা৷(অরণ্যমধু)
পটভূমিকা অন্ধকার আপন স্বত্ব অধিকাররাখুক আমি শরীর নোয়াবো না।(বিভাব)
“শব্দকে তিনি সাঙ্গীতিক স্বাচ্ছন্দ্যে গাহন করাতে গিয়ে এমন ছন্দস্পন্দন সৃষ্টি করেন, যার অনুরণন পাঠকের শ্রুতিকে তৃপ্ত করে শব্দাতিরিক্ত ব্যঞ্জনায়।” ছন্দ প্রসঙ্গে তাঁর বোঝাপড়া ছিলো অত্যন্ত প্রাণবন্ত৷ কেননা প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ থেকে তিনি তুলে এনেছেন ছন্দের কারিকুলাম৷ এবং কবিতায় এর সফল প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমাদের চারপাশের লোকেরা ছন্দেই কথা বলে, সেটাকে স্টাইলাইজ করেই ছন্দ। ছন্দ কথাটার একটা মানে হচ্ছে ছাদ। সেটা অনেকটা মুদ্রার মতো, কিছুটা গোপন রাখে, কিছুটা প্রকাশ করে। তিনি এও বলেছেন, প্রথাগত ছন্দ নিয়ে আমার মনে হয় একটু স্বাধীনতা নেওয়ার সময় হয়েছে। কবিতার মধ্যে ভাবযতি এবং পর্বযতি কখনো-কখনো এক হয়ে যায়।
এক সূর্যমুখী নারীআকাশ থেকে আনল টেনেআলোর তরবারিআকাশ ভরে উঠল গানে গানে।
সত্তর বছর-প্রায় কবিজীবনে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বহু বার দিকবদল করেছেন তাঁর কবিতাযাত্রায়। শেষ দিকবদল ঘটেছে দুই শতাব্দীর সন্ধিক্ষণে! বোধ করি তিনিই একমাত্র বাঙালি কবি, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন পরবর্তীকালে, গাল্ফযুদ্ধে মানবতার অপমৃত্যু যার জীবন ও কাব্যদর্শনই বদলে দিয়েছিলো। চিন্ময় গুহের সঙ্গে এক আলাপে এই বদলের দিকটি উঠে এসেছে এভাবে: ‘এইখানে আমি বলব, বার্লিনের দেয়াল থেকে শুরু করে গাল্ফ যুদ্ধ পর্যন্ত ঘটনার আবর্ত আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। তার কারণ আমি তাদের প্রত্যক্ষ সাক্ষী থেকেছি। … মিলেনিয়াম শেষ হওয়ার সময় আমার মনে হলো এইসব কথা আমি যদি এখন না ভাবি, যা ভাবছি তা যদি না বলি, তাহলে আমার অসততা করা হবে কবিতার কাছে।’ এ প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তাঁর কবিতাসংগ্রহ-র তৃতীয় খণ্ডের সূচনাতেও; ‘মিতভাষ’-এ— “মার্কিন আগ্রাসনের দাপটে ঘনিয়ে এল গাল্ফ যুদ্ধ, আমার জন্য রেখে গেল পূর্বধার্য কাব্যমীমাংসার বদলে চ্যালেঞ্জসঞ্চারী কাব্যজিজ্ঞাসা। বিশেষত এই সংগ্রহের শেষ দুটি বইতে আমার প্রতীতি ও অনাস্থার সেই দোলাচল লুকিয়ে থাকেনি, আমার ঘনিষ্ঠ পাঠকদের কাছে এই তথ্যও গোপন থাকেনি যে জগৎজোড়া শরণার্থীদের সঙ্গেই আমি তখন থেকে অষ্টপ্রহর সম্পৃক্ত হয়ে আছি।” এই দায়বদ্ধ মানসিকতা থেকেই বোধ করি তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে উদ্বাস্তু সমস্যা, শরণার্থীদের কথা, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন পতনের পরবর্তী সময়ে তৃতীয় বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য সম্পর্কে কবির আন্তরিক উদ্বেগ ইত্যকার বিষয়াবলী৷ রাজনৈতিক বিষয়াবলীকে আশ্চর্য সংবেদী চিত্রকল্পে উৎকীর্ণ করেছেন তিনি৷ তাই লিখেছেন,
মাকে বললাম তুমি রাতারাতি সমস্ত অভ্যেসবদলিয়ে ফেলো, চশমাটা কেন যেখানে-সেখানে রাখোঅত অর্চনা করতে যেয়ো না কাক ডাকবারও আগেগেলে অন্তত মোজা পরে যেয়ো, হাতে রেখো দস্তানাশেফালির মুখে বারুদ এখন, মৃত্যু দূর্বাঘাসে।
আকাশবাণী মৈত্রীকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে (২০১৯) তিনি বলেছিলেন,
আমার ধারণা, যে, কবি যখন কবিতাটা লেখেন, তিনি অর্ধেক লেখেন, বাকিটা লেখে নিয়তি। বাকিটা লেখে হয়তো, যখন তিনি লিখছেন, সেই ভোর বা গোধূলি। …একটি কবিতা একটা অমানুষিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসে। এবং, আমি যখন সেই কবিতাটাকে আবার লিখতে যাই, তখন সেটা হয় না। সেই যে একটি দৈবী মুহূর্ত, সেই দৈবী মুহূর্তের হাতে আমার দ্বারা রচিত কবিতার ভার আমি দিয়ে, এগিয়ে যাই নতুন কোনও বেলাভূমির দিকে।
এ অংশটি উদ্ধৃত করে ক্ষান্ত দিলে পাঠকের বিভ্রান্তির সুযোগ থাকে৷ মনে হতে পারে অলোকরঞ্জন বোধ করি একরকম করেই চিন্তাচর্চা করেছিলেন৷ কিন্তু বাস্তবতা তেমনটা নয়৷ কবিতা নিয়ে ছিলো তাঁর ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা৷ নানামাত্রিক আঙ্গিকে তিনি কবিতাকে উল্টেপাল্টে দেখে নিয়ে চেয়েছেন৷ স্বগত কবিতা থেকে সংলাপিকা, কবিতার সীমা ক্রমাগতই প্রসারিত করে চলেছিলেন নিরীক্ষাপ্রবণ কবি অলোকরঞ্জন। এ প্রসঙ্গে ‘সমবায়ী শিল্পের গরজে’ প্রবন্ধগ্রন্থের ভূমিকায় তিনি লিখেছেন,
কবিতাকে আজ আর একচোরা হয়ে ভাবের ঘরে চুরি করা মানায় না। তাকে থেকে থেকেই চিত্রকলা, সংগীত বা ফিল্মের কাছ থেকে আঁজলা ভরে রসদ নিতে হয়। অন্যদিকে মিশ্রশিল্পের গূঢ় মন্ত্রণায়, সৃষ্টির নানামুখী প্রকাশচর্যারও কি এখন কবিতার কাছে শরণার্থী হওয়ার কথা নয়?
১৯৫৯ সনে তাঁর প্রথম কবিতাবই ‘যৌবন বাউল’ প্রকাশিত হয়৷ এ বইয়েই কবিপ্রতিভার মৌলিক প্রবণতাগুলির কোরক প্রথম উন্মোচিত হয়। এরপর জীবদ্দশায় প্রায় ২০টি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের। এর মধ্যে ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’, ‘মরমি করাত’, ‘জ্বরের ঘোরে তরাজু কেঁপে যায়’, ‘এক-একটি উপভাষায় বৃষ্টি পড়ে’, ‘নদী ও রাত্রি বণ্টন হয়ে গেলে’, ‘এখনও নামেনি, বন্ধু, নিউক্লিয়ার শীতের গোধূলি’, ‘ধুলোমাখা ইথারের জামা’, ‘নওল কিশোর এসেছে বুকের তলে’ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ‘জীবনানন্দ’ নামে অভিনব একটি প্রবন্ধের গ্রন্থসহ বেশকিছু প্রবন্ধ বইও রয়েছে। বাঙলা, ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় বহুবিধ প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রণয়ন ছাড়াও বাঙলা সাহিত্য থেকে জার্মান ভাষায় ও ইউরোপীয় সাহিত্য থেকে বাঙলা ভাষায় অসংখ্য কবিতা, নাটক, কথাসাহিত্য তিনি অনুবাদ ও সংকলন করেন।
সমকাল, সমাজ-বাস্তবতাকে কবি অনুভব করেছেন তীক্ষ্ণ হৃদয় দিয়ে, তাই কাব্যস্পন্দন হয়ে উঠেছে রক্তাক্ত ঝরোখা। তাঁর কবিতায় লুকানো থাকে সুর, আর শরীরের ভাঁজে ভাঁজে সূক্ষ্ম কারুকার্য। জীবনদৃষ্টি এবং কাব্যশৈলীতে যে-নান্দনিকতা তিনি দেখিয়েছেন তার জন্য তিনি বাঙলা কবিতার জগতে চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন। নিজেকে ভাঙচুর করে লেখা এক কবিতা দিয়ে শেষ করি—
একটু একটু অনীশ্বর হয়েছিপ্রেতপিশাচের দল ডম্বরু বাজায় শর্বরীতেতথাপি যেহেতু কবে যৌবন বাউল লিখেছিলামঈশ্বরের কথা বলি, ভাবমূর্তিটুকু রেখে দিতে।(ভাবমূর্তি)