❏ সাম্য রাইয়ান
আজকাল কেউ কেউ আমার লেখা পড়েন; বেশ বুঝতে পারি৷ কেউ যদি আমার লেখা না পড়তো তবুও আমি লিখতাম৷ অতএব আমার লেখা, পাঠকের পড়া না পড়ার উপর নির্ভর করে না! আমার কথা, আমার বক্তব্য, যে কোনো বিষয় নিয়ে আমার যা চিন্তা তা আমি লিখি; লিখে বলি; এছাড়া আমার আর কোনো মাধ্যম নেই, বিকল্প নেই৷ অতএব আমাকে লিখতে হবে; কথা বলতে হবে; যে কথা আমার, যা কেউ বলছে না৷
আর যেহেতু আমি সেলিব্রেটি না, সেকারনে আমার ফ্যান-ফলোয়ার নাই৷ যার ফ্যান-ফলোয়ার নাই, তার ঐসব হারানোরও ভয় নাই৷ মব-এর তোয়াজ করার আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডের দিকে আমি নাই৷ আমাকে সেলিব্রেটিদের মতো মব-এর রুচির তোয়াজ করার দরকার পড়ে না৷ যা মনে হয়, সেই মনে হওয়ার প্রতি সৎ থেকেই কথা বলতে-লিখতে পারি৷ আমার কথা, সে আপনার কাছে মিঠে লাগুক, কিংবা সুঁইয়ের মতো বিঁধুক, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না; আমার এই পথ চলাতেই আনন্দ…
কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল মিশ্র, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহির কিংবা এরকম আরো বাঙলা ভাষার অগ্রগণ্য যত সাহিত্যিকের নাম বলি না কেন, ওঁরা নিজের মতো করে নিজের লেখাটিই লিখেছেন। দেবেশ রায় শেষ অব্দি এত ইনোভেটিভ গদ্য লিখতে পেরেছেন কেননা এঁরা কেউই মব-এর রুচির তোয়াক্কা করেননি, খ্যাতির কাঙালিপনা করেননি। জনরুচি অনুযায়ী খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব ওঁরা পালন করেননি৷ প্রকৃত লেখকের কাজই করেছেন। ফলে প্রতিষ্ঠানকেই নিজের দরজা প্রশস্ত করে ওঁদের গ্রহণ করতে হয়েছে। কেননা, ও সাহিত্য ছাপতে চাইলে হুবহু ওভাবেই ছাপতে হবে। জনরুচির সাথে বিন্দু পরিমাণ আপোষ নয়৷ মায়াকোভস্কি তো তাঁর কবিতাবইয়ের নামই দিয়েছিলেন— ‘জনগণের রুচির মুখে থাপ্পড়’।
কিন্তু এদেশের অধিকাংশ সাহিত্যিকই পাঠককে চিনি বাড়িয়ে দুধ চা কিংবা মচমচে তেলে ভাজা খাইয়ে মনোরঞ্জন করতে পছন্দ করে৷ মব যেদিকে যায়, এরাও সেদিকে যায়; মব যেখানে থামে, এরাও সেখানে থামে; মব যা শুনতে চায়, এরা তা-ই বলে; মব যা দেখতে চায়, এরা তা-ই দেখায়! কেননা এতেই পকেট ভারী হয়, বেশ খ্যাতি ও খাতির মেলে৷ যত বিকৃত— তত বিক্রিত! অথচ লেখক-বুদ্ধিজীবী সমাজের সেই প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন— যা শরীরে প্রবেশের মুহূর্তে সামান্য ব্যথা অনুভূত হলেও দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখে৷ এতে মবপিষ্ট হবার সম্ভাবনা থাকলেও সত্যিকার লেখক তো তিনিই— যিনি মব-এর রুচির গালে থাপ্পড় মেরে চলে যেতে পারেন স্ববৈকুণ্ঠের দিকে!
কমলকুমার রসিকতা করে বলতেন, তাঁর প্রথম গল্পের বই ‘নিম অন্নপূর্ণা’ বিক্রি হয়েছিল ১৭ কপি, তারপর ১৮ জন এসে ফেরত দিয়ে গেছে!