❏ সাম্য রাইয়ান
বাঙলাদেশের মতো ‘দালাল বুর্জোয়া শাসিত’ অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতিসহ অপরাপর সন্ত্রাসবাদী ও নানাবিধ অপকর্ম ব্যাতিরেকে সৎভাবে অর্থোপার্জন করে সম্মানজনক জীবনযাপন করাই যেখানে দুঃসাধ্য হয়ে উঠেছে, সেখানে— সেই দেশে কিছু লোক এখনও এতোসব অপকর্মকে পাশ কাটিয়ে সাহিত্য নিয়ে চিন্তা করছে, মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে এ-ই তো বিরাট ঘটনা! প্রায়ই একথা ভাবি, ভাবলে অবাক লাগে, কী আশ্চর্য এ দেশ! অপরাধীর শাস্তি অপেক্ষা অপরাধ প্রকাশকারীর শাস্তিই অধিক পরিমাণে দৃশ্যমান! কোন কাজটা এই দেশে সম্মানের বলুন তো? যে কৃষক খাদ্যের যোগান দেয়, সেই কৃষককে নিয়ে যতোই গালভরা বুলি বইয়ের পাতায়, মঞ্চে-বক্তৃতায় উল্লেখ থাকুক না কেন, প্রকৃতপ্রস্তাবে কৃষক এই দেশে সম্মানীত ব্যক্তি না। কৃষিকাজকে সম্মানজনক পেশা মনে করা হয় না। যে শিক্ষকসমাজকে বাদ দিয়ে জাতি গঠনের কথা চিন্তাই করা যায় না তাদের সম্মানও তথৈবচ। তাহলে এদেশে সম্মানীয় ব্যক্তি কারা? শুধুই মন্ত্রী-এমপি আর আমলারা! তাই এখানে টিকে থাকার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে কৌশলী হতে হয়; চাটুকার হতে হয়, দালাল-তেলবাজ হতে হয়। মানুষ হচ্ছেও তা-ই। দলে দলে মানুষ এখন ওই পথে এগুচ্ছে। সেই মানুষের দলকে পথ দেখানোর কথা যে বুদ্ধিজীবীর, তারাও হুক্কাহুয়া ডাক তুলে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বিক্রি হচ্ছেন কর্পোরেটের কাছে, রাজনৈতিক দলের কাছে, পুরস্কারের কাছে। নাজিম হিকমতের কবিতা মনে পড়ে যায়, “কী দুঃখেরই না এ স্বাধীনতা!” তবু কিছু মানুষ থাকেন, লাইনে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করেন। নিজের লেখাকে, নিজের চিন্তাকে পণ্য করে তোলার বিপক্ষে। নিকষ অন্ধকারে আলোকবিন্দু হয়ে— যেন জোনাকী—৷
২.
বাঙলাদেশের লিটলম্যাগ নিয়ে কোনো আলোচনায় যে নাম অনিবার্যভাবে উঠে আসে, তা ‘প্রতিশিল্প’। নব্বই দশক থেকে এটি সম্পাদনা করছেন মারুফুল আলম। সেই সময়ই তাঁর লেখালিখির শুরু। এখন অব্দি দুইটি কবিতার ও একটি প্রবন্ধের বই প্রকাশিত।
মাধ্যমিকে পড়বার সময় থেকে এই লিটলম্যাগটির পাঠক আমি। এবং পরবর্তীতে আমার কবিতাও এতে প্রকাশিত হয়। সম্পাদকের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলেও লিটলম্যাগ সূত্রে কোথায় যেন আত্মীয় আমরা। ‘প্রতিশিল্প’ প্রকাশের আগে মারুফ ভাই মেসেঞ্জারে নক্ করে লেখা চাইবেন এবং শুধু তা-ই নয়, শেষ অব্দি তা আদায় এবং প্রকাশ করে তবে ক্ষান্ত হবেন। এমনটাই ঘটে তাঁর সাথে আমার। প্রথমবার আমার লেখা প্রকাশের পর দ্বিতীয়বারের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁর সাথে একটিভিজমের দুই-একটি দিক নিয়ে মতবিরোধ হলো। এদেশে সাধারণত যা হয়, মতবিরোধ হবার পর সকল সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, যাকে বলে ‘মুখ দেখাদেখি বন্ধ!’ কিন্তু এক্ষেত্রে তা হলো না দেখে আমি যারপরনাই বিষ্মিত হলাম। তিনি দ্বিতীয়বার যথারীতি আমার কাছে লেখা নিলেন এবং তা প্রকাশ করলেন! এদেশে সম্পাদকের এহেন কর্ম তো বিরল! লিটলম্যাগের ক্ষেত্রে তো মহাবিরল! শুধু তা-ই নয়, সম্পাদনার আরো কিছু দিক আছে তাঁর, যা তাঁর দশকের অন্যান্য লিটলম্যাগের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। ‘প্রতিশিল্প’ এতো বছরে তার চরিত্র পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করতে এবং তা অটুট রাখতে পেরেছে। ‘অটুট’ রাখতে পারাটাও নিশ্চয়ই এদশে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সাধারণত অপরাপর সকলে ‘অটুট’ রাখার সুবিধার্থে নিজেদের ছোট্ট গোষ্ঠীর মধ্যেই আবদ্ধ থাকেন। ছোট্ট গোষ্ঠীর বাইরের কারও লেখা প্রকাশের ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন না। কিন্তু মারুফুল আলম সেই ঝুঁকি নিয়েছেন। তিনি সামগ্রিক অর্থে ‘লিটলম্যাগকর্মী’ কী না, এই বিবেচনা করেছেন, লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে। ‘সম্পাদকের আজ্ঞাবহ দাসের’ লেখা প্রকাশ করে অতিক্ষুদ্র মৌলবাদী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেননি প্রতিশিল্পকে। যদিও এদেশে এমন ঘটনা বিরল নয়।
তবে একটিভিজমের প্রতি ‘অটুট’ থাকতে গিয়েই হয়তো তিনি প্রতিশিল্পে প্রকাশিত লেখার মানের প্রশ্নে খানিকটা ‘আপোষ’ করেছেন। যদিও লিটলম্যাগের বিশেষত্ব আমি মনে করি এখানেই যে, তার লেখক এবং লেখা উভয়ই আপোষহীন—প্যারালাল। লিটলম্যাগের লেখক শুধু বিপ্লবী আওয়াজ দেবেন, প্রচল ভাঙার কথা বলবেন, কিন্তু লেখায় তা প্রতীয়মান হবে না, লেখায় তিনি প্রাচীনপন্থী চিন্তারধারার ঘানি টানবেন কিংবা বাজার-চাহিদার দাস ও প্রতিষ্ঠামনষ্ক লেখকের মতোই লিখবেন, এ হতে পারে না। আর তেমন হলে সেই লেখা লিটলম্যাগে প্রকাশিত হবার কথা নয়। কিন্তু এমন ঘটনা প্রতিশিল্পে কিছু পরিমাণে দৃশ্যমান।
এমন লেখক-কবি বিরল নয়, যাদের প্রথম লেখা প্রতিশিল্পে প্রকাশিত। যারা নিয়মিত প্রতিশিল্পে লিখতেন, লেখেন। এক্ষেত্রে মারুফুল আলম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দায়িত্বই বোধ করি তাকে যতোটা ‘সম্পাদক’ করে তুলেছে, ততোটা ‘কবি/প্রাবন্ধিক’ হয়ে উঠতে দেয়নি। এমনটাই এদেশে বাস্তবতা। বুদ্ধদেব বসু ডজন ডজন জন্মায় না। লিটলম্যাগ নিয়মিত সম্পাদনা করে নিজের লেখাটা ঠিকমতো লিখে ওঠা মুশকিলই বটে। এই দৈন্যদশার নজির পাওয়া যায় মারুফুল আলমের প্রবন্ধের দিকে তাকালে। তাঁর প্রবন্ধের বইটি আমি পড়েছি। এবং সম্প্রতি সেলিম মোরশেদকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধটিও পড়েছি। এটিকে প্রবন্ধ না বলে বর্তমান সময়ের ‘লিটলম্যাগঘেঁষা লেখকদের নামের তালিকা’ বলাই ভালো।
৩.
একটা ঘটনা বলি। ২০১৮ এ আমরা ‘বিন্দু’র পক্ষ থেকে লিটলম্যাগ চত্বরে স্টল বরাদ্দ নিই। ২৫ জানুয়ারি ডিএমপি সদর দপ্তরে বইমেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আয়োজিত এক সমন্বয় সভায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার বলেন, এবার মেলায় আসা যে কোনো নতুন বই বাংলা একাডেমী যাচাই-বাছাই করে তারপর স্টলে বিক্রির অনুমতি দেবেন। তারা চেক করবেন যে, কোনো বইতে “ধর্মীয়, সামাজিক ও জাতীয় মূল্যবোধে আঘাত” করা হয়েছে কী না। কিন্তু আমরা মনে করি, যে বই প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধে আঘাত করে না সে বইও বই, যা আঘাত করে সেটিও বই। বরং সে বইই ভালো বই, যে বই প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত চিন্তাকে আঘাত করে নতুন দিনের চিন্তার পথকে সুগম করতে পারে। দেশ-দুনিয়াকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে প্রতিনিয়ত প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধগুলো একে একে ভেঙে ফেলা দরকার। আর তাই ডিএমপি কমিশনারের এহেন বক্তব্যের প্রতিবাদে আমরা ‘বিন্দু’র পক্ষ থেকে ফেস্টুন লাগিয়ে পাঁচ দিন স্টল বন্ধ রেখেছিলাম। প্রতিবাদের তৃতীয় দিন বাংলা একাডেমী আমাদের স্টল ভেঙে দেয়। এই ঘটনায় দেশ-বিদেশের অগণিত লেখক-পাঠক বিন্দুর পক্ষে আওয়াজ তোলেন, বইমেলায় পুলিশী সেন্সরশীপের বিপক্ষে কথা বলেন।
সেইবার দেড় শতাধিক স্টল ছিলো লিটলম্যাগ চত্বরে। যার মধ্যে ছিলো এদেশের উল্লেখযোগ্য লিটলম্যাগ জঙশন, চালচিত্র, দ্রষ্টব্য, করাতকল, দেশলাই, লোক, খনন ইত্যাদি; মোট কথা এরকম আরো সকলেই ছিলেন মেলায়, নীরব! লিটলম্যাগ প্রকাশনা উলুখড় কিংবা শিরদাঁড়া কিংবা গাণ্ডীব কিংবা অনিন্দ্য কিংবা আর কোনো লিটলম্যাগ, কিংবা প্রতিষ্ঠানবিরোধী সাহিত্যিকগণ এই বিষয়ে কোনো স্টেটমেন্টই দিলেন না! সেবার এই সংক্রান্ত যাবতীয় ঝামেলা মেলায় ফরহাদ নাইয়া আর মেহেরাব ইফতি সামলেছিলেন। চারবাক (যৌথ) সম্পাদক আরণ্যক টিটো আমাদের পক্ষে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন। আর দিয়েছিলেন একজন মারুফুল আলম। প্রতিশিল্পের সেবার স্টল না থাকলেও ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে তিনি আমাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। বইমেলা বয়কট করেছিলেন। এতো এতো লিটলম্যাগ বিন্দুর স্টল ভাঙার ঘটনা এবং বইমেলায় পুলিশী সেন্সরশীপকে নীরব সম্মতি প্রদান করলেও মারুফুল আলম তা পারেননি। এই জায়গায় মারুফুল আলমের একটিভিজমের সততা। লিটলম্যাগ মুভমেন্টের প্রতি অনেস্টি।
৪.
লেখার, প্রতিশিল্পের অনেক সমালোচনা থাকার পরও মারুফুল আলম নব্বই দশক থেকে যেভাবে লিটলম্যাগ মুভমেন্টের সাথে যুক্ত তা আমাদেরও অনুপ্রাণিত করে। এদেশে লোকে লেখা শুরুর পরের বছরই সাহিত্য সম্পাদকদের তেলবাজি, তার পরের বছর পুরস্কারদাতাদের তেলবাজি, এইসব করে করে তো জীবনটাই কাটিয়ে দেয় তেলের খনিতে ডুবে। সেই পরিস্থিতিতে আমাদের একজন মারুফুল আলম আছেন, যিনি এইসব এড়িয়ে, নিজেকে বিক্রি না করে বছরের পর বছর প্রতিশিল্প বয়ে চলেছেন। তাকে অস্বীকার করবেন কী করে?
[আযাদ নোমান সম্পাদিত সাহিত্যপত্র ‘চর্যাপদ’-এ মারুফুল আলম বিষয়ক ক্রোড়পত্রের জন্য আমন্ত্রিত লেখা৷ ক্রোড়পত্রটি প্রকাশিত হলেও এই লেখাটি তাতে ছাপা হয়েছে কী না তা জানতে পারিনি৷]