শনিবার, ১ জুলাই, ২০১৭

Maxim by Sammo Raian


। ১ ।
`সহজ' বা `কঠিন' শব্দ বলে কিছু নাই। আছে শুধুই `পরিচিত' আর `অপরিচিত' শব্দ।

। ২ ।
আমি যখন হতাশ হই, চোখ দুটো অন্ধ হয়ে যায়!

। ৩ ।
কর্পোরেট পুরস্কার না পেলে জীবৎকালে কবিতার বই বিক্রি হয় না। ভাস্কর চক্রবর্তী এই দেশে থাকলে অন্তত প্রথমা হলেও তাকে একটা পুরস্কার পেতেই হতো।

। ৪ ।
এই দেশে কবি হতে হলে কোনও না কোনও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিজেকে সঁপে দিতেই হবে। তা সে সংবাদপত্র হোক কিংবা সাহিত্যপত্র।

। ৫ ।
ওই চতুর লোকটি যদি কাউকে কবি বানাতে পারতো, তাহলে সবার আগে সে নিজেই কবি হতো।



বৃহস্পতিবার, ১৫ জুন, ২০১৭

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ঃ যে পথ চোরাবালি

স্বপ্নের শুরু

বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা কলেজগুলো একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অধিভূক্ত ছিল। এরই এক পর্যায়ে কলেজগুলির শিক্ষার সার্বিক কার্যক্রমে নানা সংকট সৃষ্টি হয। সারাদেশের কলেজগুলো নিয়ে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের যখন গলদঘর্ম অবস্থা, তখন কলেজের শিক্ষার্থীদের সেশনজটমুক্তভাবে শিক্ষাজীবন সমাপ্তির লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে গড়ে উঠেছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। নামে ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ হলেও এটা অনেকটা শিক্ষা বোর্ডের মতো প্রতিষ্ঠান। এটি কাজ করে শিক্ষাবোর্ডেরই আদলে। জাতীয বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাজ বহুলাংশেই শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যানের মতো।


রাত যায় আসে রাত, দিন গ্যাছে হারিয়ে

উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় কলেজগুলোতে তীব্র সেশনজটের সৃষ্টি হয়। এবং ফল প্রকাশে বিলম্বসহ শিক্ষার নানাবিধ সংকট তৈরি হয়। আর এই সংকট নিরসনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তার অবস্থা এখন আরো ভয়াবহ।

সারাদেশে কলেজ পর্যায়ে অনার্স, ডিগ্রি এবং মাস্টার্স প্রোগ্রাম সুচারুরূপে পরিচালনা করা, এবং উপযুক্ত ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, সারাদেশের কলেজগুলোর শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং সার্বিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়নের লক্ষ্যে যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছিল, চরম দলীয়করণের কারণে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তা স্বেচ্ছাচারী, স্বৈরাচারী, অবৈধ, নিয়ম-নীতি লঙ্ঘনকারী একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে বিভিন্ন পদে ‘নিয়োগ’ এর বিধিমালা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে সর্বোচ্চ পদ উপাচার্য থেকে শুরু করে ঝাড়–দার পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। শর্তানুযায়ী কোন ধরনের গবেষণা ও প্রকাশনা ছাড়াই পদোন্নতির মাধ্যমে অনেকে অধ্যাপকও হয়েছেন। শুধু তাই নয়, কর্মরত অনেক শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার যোগ্যতাই নেই। কেবল ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যই তাদের ‘অধ্যাপক’ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। আর এর ফল হয়েছে ভয়াবহ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছে অনিয়ম ও দুর্নীতির খপ্পরে। বছরে একবার পরিদর্শন, সার্বক্ষণিক মনিটরিং, কলেজের বার্ষিক রিপোর্ট গ্রহণ ও প্রকাশ এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার বিধান আইনে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর কোন প্রয়োগ নেই। দলীয় ব্যক্তিরা উপাচার্য হওয়ার ফল হিসেবে আমরা দেখি, দু-একজন ছাড়া সকল উপাচার্যকেই বিদায় নিতে হয়েছে দুর্নীতির অপবাদ মাথায় নিয়ে। আর এর কোনটিরই সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হয়নি। কেবল বিগত জোট সরকারের আমলে নিয়ম বহির্ভূতভাবে, দুর্নীতির মাধ্যমে পাওয়া প্রায় এক হাজার নিয়োগ বাতিল হয়েছে উচ্চ আদালতের নির্দেশে। তবে সত্য হল এই, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে উপাচার্য-কর্মকর্তা বদল হলেও ১৮ শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভিভাবক এই প্রতিষ্ঠানটির চরিত্র বদল হয় না। সময় গড়িয়ে যায়, কেবলি চেয়ে থাকা...

রবিবার, ২১ মে, ২০১৭

চিত্রনাট্যঃ শব্দ

চরিত্রগণঃ
একটি কাঠঠোকরা পাখি
মা (পয়ত্রিশ)
বাবা (চল্লিশোর্ধ)
একটি ছেলে ও একটি মেয়ে (দশ-বারো)
তিনজন শ্রমিক (পূর্ণবয়স্ক)
একজন শিশু শ্রমিক (তের-চোদ্দ)

:: দৃশ্য এক ::
[ ছেলেটা স্যান্ডোগেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট, মেয়েটি ফ্রক পড়া।
আর পুরো শর্টফিল্ম জুড়ে মা সাধারণ শাড়ি পড়া থাকবে ]

সন্ধ্যা ছয়টা। একটি গ্রামের বাড়ি; বাঁশ ও টিনের মিশেলে তৈরি। দুটো দশ-বারো বছর বয়েসী ছেলেমেয়ে ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছিয়ে পড়তে বসেছে। মা রান্নাঘরে কাজ করছেন। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। মেয়েটা কী যেন লিখছে খাতায়। ছেলেটা জোড়ে জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরাটাও জোড়ে জোড়ে শব্দ করছে। ছেলেটা আরো জোড়ে পড়ছে। কাঠঠোকরা আগের মতো জোড়ে শব্দ করেই চলেছে। যেন ছেলেটা আর ঐ কাঠঠোকরার মধ্যে প্রতিযোগীতা চলছে কে জেতে এই নিয়ে! ছেলেটা বুঝে গেছে তার জেতা সম্ভব নয়। ছেলেটা হঠাৎ চিৎকার করে তার মাকে ডাকলো এবং অভিযোগ করলো; ঐ কাঠঠোকরার শব্দে তার পড়তে অসুবিধা হচ্ছে। মা তাড়িয়ে দিল পাখিটাকে। পাখিটা উড়ে চলে গেল।

:: দৃশ্য দুই ::
[ শ্রমিক দু’জন শুধু লুঙ্গি আর মহাজন (বাবা) চতুর্থ দৃশ্য পর্যন্ত লুঙ্গি ও ব্যাপারী শার্ট পড়া থাকবে ]

রাত্রি আটটা। একটা চলন্ত চাউলকল। দু’জন শ্রমিক কাজ করছে মেশিনের। দিনশেষের কাজ চলছে এখন। ঘরঘর শব্দ হচ্ছে খুব। মহাজনের আসনে বসে আছে একটা লোক। ইনি ছেলেমেয়ে দুটোর বাবা। সারাদিনের আয়-ব্যায়ের হিসেব মেলাচ্ছেন খুব মনোযোগ দিয়ে। এমন সময় মোবাইলটা বেজে উঠল তার। রিংটোনের শব্দে মনোযোগ নষ্ট হল বলে বিরক্তি প্রকাশ করলেন। ফোনটা রিসিভ করে ব্যবসা সংক্রান্ত আলোচনা করলেন। কথা শেষ করে আবারো হিসাব মেলানোতে মন দিলেন। মেশিন তখনো চলছে, ঘরঘর ঘরঘর।

:: দৃশ্য তিন ::
রাত্রি দশটা। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ঘরের বারান্দায় মাদুর বিছানোই আছে। ছেলেমেয়ে দুটো নেই। মাদুরে তাদের মা বসে কিছু একটা সেলাই করছেন। এমন সময় ছেলেমেয়ে দুটোর বাবা চলে এলেন। খুব ক্লান্ত শরীরে ঘরে ঢুকে জামাকাপড় ছাড়ছেন। মা তার কাজ গুটিয়ে স্বামীর কাছে চলে গেলেন। হঠাৎ রেগে চিৎকার করলেন বাবা, রাগটা মাকেই করলেন, কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দে তার মাথা ধরেছে। মায়ের অপরাধ, তিনি আগেই কেন তাড়িয়ে দেননি। মা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন আর কাঠঠোকরাটাকে তাড়িয়ে দিলেন।

:: দৃশ্য চার ::
[ ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুলের পোষাক পড়া থাকবে ]

সকাল সাড়ে নয়টা। মা ছোটাছুটি করে বাড়ির কাজ করছেন। ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুলের প্রস্তুতি নিয়ে বের হচ্ছে। বাবা চাউলকলে যাচ্ছে। কাঠঠোকরাটা ঠকঠক করে গর্ত করছে। সেটাকে তাড়িয়ে দিয়ে বাবা ছেলেমেয়েদের নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। ইস্কুলে রেখে তারপর চাউলকলে যাবেন।

:: দৃশ্য পাঁচ ::
দুপুর বারোটা। বাড়িতে কাজ করছেন মা। বোঝাই যায় এখন অতো তাড়া নেই। ধীরেসুস্থে কাজ করছেন তিনি। বাড়ির গাছে বসে কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপই নেই তার। নিজের মতো কাজ করেই চলেছেন তিনি। কাজের পাশাপাশি কাঠঠোকরার ঠকঠক শব্দ যেন একটা আমোদিত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কাজ করছেন, হাত নাড়ছেন, ছুটছেন; এমনভাবে, মনে হচ্ছে যেন কাঠঠোকরার শব্দের তালে তাল মেলাচ্ছেন!

:: দৃশ্য ছয় ::
[ দৃশ্য চার-এ ছেলেমেয়ে দুটোর পোষাকের পুনরাবৃত্তি। 
তবে খেলা শুরুর সময় দৃশ্য এক-এর পোষাক থাকবে ]

দুপুর দেড়টা। ছেলেমেয়ে দুটো ইস্কুল থেকে বাড়িতে ফিরলো বৃহস্পতিবার বলে। মা বাড়ির কাজ করছেন। বাবা বাসায় নেই। বাড়ির গাছে বসে একটা কাঠঠোকরা গর্ত করছে। ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। ছেলেটা এই শব্দের প্রতি তার বিরক্তি প্রকাশ করলো মেয়েটার কাছে। মেয়েটাও একই কথা বলে তার বিরক্তির প্রতি সংহতি জানালো। এরপর ছেলেটা একটা ইটের টুকরো নিয়ে ঢিল ছুড়লো পাখিটার দিকে। পাখিটা উড়ে গেল। ছেলেমেয়ে দুটো কাপড় বদলে খেলতে শুরু করল।

বৃহস্পতিবার, ১১ মে, ২০১৭

চায়ের পেয়ালা ও ঠোঁটের মধ্যে বিস্তর পিচ্ছিল পথ

দেহপুজারী স্বামির দিকে তাকিয়ে কেটে গ্যাছে কতো কান্নাক্লান্ত নিদ্রাহীন রাত

এসবই পুরনো পোশাক, সাজিয়ে রেখেছি নতুনের ছলে
আলমিরা ভরে যায় পোশাকে—পোশাকে শুধু, আবরণে
পোশাক মানে আবরণ, লুকিয়ে রাখার, লুকিয়ে থাকার
আমি পোশাক চাই না
আমার প্রকৃত শরীরে ঘৃণাস্বরে তাকিয়ে স্মৃতিচি‎হ্ন এঁকে দিও মন
তবু আমি পোশাক চাই না,        পোশাক হল মিথ্যার আবরণ

কালোবাঘ-লালকাক পাশাপাশি শুয়ে থাক

উদ্দেশ্যহীন হাঁটাহাঁটি করাকে গর্হিত মনে করেন, এরকম কিছু মানুষের সাক্ষাৎ পাবার দণ্ড আমার হয়েছিলো! আর শাস্তিস্বরূপ দেয়া হয়েছিলো অজস্র অবান্তর প্রশ্ন। তাই নিরূপায় আমি একবার শুধু বন্ধুর মুখে চেয়ে অকপট ঝেড়েছি শব্দ; ভাবের গাণ্ডীব থেকে।

এ শহর, পথ-ঘাট, এতোটা হেঁটেছি আমি। এ শহর-বন্ধুজন, কতোটা জেনেছি আমি? নিকট শহরে থেকে দূরবর্তী যারা, আসলে তাদের বিষয়ে তেমন কিছুই জানা হয় নি এখনো; রাতভর শুধু পাক পাখিদের শব্দ!

হাাঁটার অভ্যেস হওয়ার পর থেকে আমার বন্ধুরা মেতেছে পায়ের গল্পে। আমি হাঁটতে গিয়ে দেখি পায়ে কিছু ভুল আছে। আমার পা আমাকেই জড়ায় ফাঁদে। পথে শিকারীর অবিকল ওঁত পেতে থাকে নিষেধ আর নিয়মাবলী। আমিও ভুলে যাই পায়ের গ্রামার।
হাাঁটাহাঁটির দিনশেষে অবসরে একদিন মনে হলো পা এক কঠিন পাজল। হাজার বছরের পিছু পিছু হেঁটেছি মাত্র কয়েক কিলো। তারমধ্যে জাড়য়েছে কতো কালি ও ধুলো। পথিকের ছদ্মে এতাদিন রয়ে গেলাম। আমাকে ভাঙিয়ে সবাই কুড়িয়ে নিলো কড়ি ও সেলাম।
আমার দু’পা তারাও চলেছে দূরত্ব বজায় রেখে...
(আমার পা / উপল বড়ুয়া)

২.
মনে ভীষণ জ্বর আর দীর্ঘ ডানা থেকে খসে পড়া ঝড়ো মেঘ নিয়ে থার্মোমিটার খুঁজে বেড়াচ্ছে রঙিন পা-ছাপ। জ্বরের প্রকোপে চুরমার হয়েছে যন্ত্রের কাঁচ। কী দরকার এতো উত্তাপে; আমি বলি কি মেঘের নিচে আসো; বারবার আসো, আসতেই থাকো। মৃদুমন্দ ঝংকার তুলে যথার্থ ছায়াকে গুছিয়ে রেখে - মেঘের নিচে বসো; জিরিয়ে নাও। হাসি পায় না কি বোকার প্রলাপে, বোকা? চেনাজানা কোনো হাসিমুখ আছে কি না, পকেট হাতরাও; দ্যাখো পাও কি না! পাবে না; সবটা ত্যাজ্য হয়েছে পূর্ণ দূষণে আজ।

মেঘের ছায়াতো আন্তর্জাতিক
আর সবচে’ বড় কথা,
ওরা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়
স্বাদু-পানির কারখানা
লোনা তাই দুঃখ থাকে না তাতে-
আমাদের ছায়া ও বসবাসে
কতোটা লবণ আছে জানা নাই
আহা! এই সল্টি প্লানেটে যদি
স্বাদু পানি বেশি হতো?
(সল্টি প্লানেট / শামীমফারুক)

৩.
আমার একটা নাম আছে। আমার বন্ধুদেরও, প্রত্যেকের একটা করে নাম আছে। তবে আমার নামের বানানে ভুল আছে। জীবনপুরাণ বলে, বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়; উপরে তখন কোনো চন্দ্রবিন্দু থাকে না।

কাছের মানুষগুলো কি দিন দিন কাচের হয়ে যাচ্ছে! এর উপরে ভেসে ভেসে বেঁচে আছি একটা স্বতন্ত্র নাম নিয়ে জীবন ও মৃত্যুর মধ্যরেখায়। একটা রেলপথ, একটা স্টেশন; আটকে গেছি এইখানে। আছি। সকলে জানেন। আমার থাকা আর না থাকাজুড়ে একটা ভুল বানানের নাম আছে। মহামান্য বলেন, ভুল হলেও পুরোটা নামে আছে নন্দনের ঘ্রাণ, দৃশ্যত সরল সুন্দর। টিটো ভাই জানেন, মহামান্য মানে নন্দনের বালিকা; সৃজনের ফুল।

মওদুদ নামে বেঁচে আছি জীবিতদের কাছে আর মৃতদের কাছে আছি মরে। নামহীন যায় না তো বাঁচা, মৃতরাও আছে স্ব-নামে। নামফলক তারা ভালোবাসে। ভালোবাসার জন্য, বেঁচে থাকার জন্য, মরে থাকার জন্য নামটাই জরুরী। ভূমিষ্ট হওয়ার আগে, পরে, মরেছে যে শিশু, যার কোন নাম নেই সে তো মরে নেই, বেঁচেও তো নেই। তাহলে নাম মানে আছে, নামহীন মানে নেই। আমি তবে আছি মওদুদ নামে। থাকবো না জানি মওদুদ নামেই।
(দুঃস্বপ্নের চিরস্থায়ী বাগানে-৩৩ / আহমেদ মওদুদ)

প্রকৃত শরীর

মনের ভিতরে আছে প্রকৃত শরীর; উহু শরীর
খোঁজবারে কী নির্মমভাবে সে কথা ভুলে যাই, যেভাবে
ভুলে যাই গুটিকয় পাঞ্জাবীর কথা, প্রতিবার গমনের কালে
গোলাপবনের দিকে এগিয়ে যাবোনা অহেতুক।

কিচ্ছু চেনা হয় নাই গহীনের প্রাণ, শুধু ধনুকের থেকে
শিখে নিয়েছি জোড়ালো গমনসঙ্গীত। মনের
ভিতরে আছে প্রাকৃত শরীর; যাকে কখনোই জানা হয় নাই।

বিশ্বরূপ

দু’চোখ মুড়িয়েছি রঙিন কফিনে; দেখতে পাচ্ছি না কিছু, বিজ্ঞাপনে; তবু রেলগাড়ি চলে রঙিন পিঁপড়ের মতো। ঘষা কাঁচের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছি সুখানুভূতি। কী হতাশার জীবন গোঁসাই! আলোরা ডালপালা ছড়িয়েছে বন বনান্তরে। চর্বিত মগজের পাশে হাতঘড়ি ঝুলে আছে হৃদয়ের গোপন কোটরে। পাল্টে গ্যাছে ঋতুবতী শৈশবের ঘ্রাণ।

শুকনো পাতারা ঝরে পড়ার কালে মাঝপথে হাওয়া লেগে আবারো উড়ে গ্যাছে অন্য পথে, ভিন্ন গতিতে; মৃত্যুর মতো বদলে গ্যাছে তারা প্রভিন্ন আঙ্গিকে। রঙের স্রোত থেকে একটা দৃশ্য উঁকি দিচ্ছিলো; প্রতিছায়া ছিলো সেটা মানুষের — জাগরণের।

সবটা দেখতে পাই না বলে কোনো নিয়ম-কানুন নেই।

বিষাদগ্রস্ত

জ্ঞানত ছন্নছাড়া মৌমাছি হামলে পড়েছিলো, কামড়ে দিয়েছে শরীরে। সেইসব মাছিদের মাতাল কামড়ে উন্মত্ত বোকাপাখিটি সাধুর কাছে জানতে চাইলো, বিষাদগ্রস্ত মনকে আনন্দিত করার উপায় কী?

সাধু মুচকি হেসে বিষণ্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলো, আমারই ভীষণ মন খারাপ, কাকে বলি!

নির্বাসনের বনে

গাছটা অসুস্থ; ওকে ডাক্তার দেখাবো। হাতে অনেক কাজ এখন। তোমার কাছে ফিরে নদীমাতৃক হবো। সুবাসিত পাতাবাহারের কাছে কয়েকটা আকাশ জমা আছে; রাত গভীর হলে সেই গল্পটা শুনতে হবে আবার। কেন যে আসে উদগ্র শুক্রবার; সমস্ত প্ল্যান ভেস্তে যায় আমার; কোনোকিছু ঠিক থাকে না! পঠিত গানের নাম ধরে ডাকি তবু কোথা থেকে উঠে আসে সব ব্যর্থ কবিতামালা।

যে অসহ্য ওষুধবিক্রেতা জানে না মেঘেদের প্রকৃত বানান, তাকেও তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাড়ি যেতে হবে। এদিকে আমি একটা খসে পড়া নক্ষত্র পকেটে জমা রেখেছি; বৃষ্টি ভীষণ চিন্তায় ফেলে দিলো!


একে একে একা হলাম

দূর থেকে দূরে হারালো যে প্রাণময়,
আমি তাকে...  —তার সমূহ হৃদয়ে ভ্রমণ করেছি!

মুখভর্তি নীলাভ কেরোসিন নিয়ে হুইসেল বাজাচ্ছে অন্ধবালক। আমি হারাচ্ছি মেঘ থেকে মেঘে; মন থেকে মনে। উড়ে বেড়াচ্ছি একটার পর একটা মেঘের খণ্ড আড়াল করে। ভেঙে যাওয়া চাঁদটাকে জোড়া লাগাচ্ছি বারবার। কেউ বিশ্বাস করছে না!

পকেটভর্তি অবিশ্বাস নিয়ে একে একে একা হলাম দু’জনে। অনন্ত পৃষ্ঠাগুলো গভীর এবং উগ্র হলুদে ভরিয়ে ফেললাম আর জীবন একটা তুচ্ছ কবিতা হয়ে ছাপা রইলো বইয়ের পাতায়।